আনিস আলমগীর: ৪ নভেম্বর বুধবার ছিল আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মৃত্যু দিবস। চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা থানার হাইলধর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের ৩মে ১৯৪৫ সালে তার জন্ম। বাবা নুরুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন হাইলধরের জমিদার। আনোয়ারা থানা যদিওবা কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে অবস্থান ছিলো তবু আনোয়ারা ছিলো অজপাড়া গাঁ। অথচ অপর পাড়ে ছিলো চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর। মাঝি মাল্লাদের বসতি ছিলো আনোয়ারায়। তারা বহিঃনোঙ্গর অপেক্ষমান বিদেশি জাহাজে আনা মালামালের চোরা কারবার করতো।
আনোয়ারার অবস্থান ছিলো বঙ্গোপাসাগরে পাড়ে। বড় জোয়ারেও সমতল ভূমি প্লাবিত হয়ে যেত। আর ঘূর্ণিঝড়ের সময় তো অবর্ণনীয় দুঃদর্শার সৃষ্টি হত। গত শতাব্দীর পাঁচ দশক পর্যন্ত ভাল কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছিলো না। শুনেছি আনোয়ারার শিক্ষার্থীরা পটিয়ার রাহাত আলী হাই স্কুলে এসে লেখাপাড়া করতো। আনোয়ারা থানা সদর থেকে পটিয়া থানা সদরের রাহাত আলী হাই স্কুল ছিলো ৭/৮ মাইলের ব্যবধান। পায়ে হেঁটে ছাত্ররা স্কুলে আশা যাওয়া করত।
গত শতাব্দীর চার দশকে আখতারুজ্জামান চৌধুরীর বড় ভাই বশিরুজ্জামান চৌধুরীর উদ্যোগে বশিরুজ্জামান চৌধুরী হাই স্কুল নামে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। বশিরুজ্জামান চৌধুরীও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনিও আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আনোয়ারা থানায় বড় দুই পরিবার, বড় উঠানের ফেছু মিয়ারা আর হাইলধরের নুরুজ্জামান চৌধুরীরা। দুই পরিবারের মাঝে ফেছু মিয়ারা মুসলিম লীগ ঘরাণার আর নুরুজ্জামান চৌধুরীরা আওয়ামী লীগ ঘরাণার ছিলেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহাম্মদ চৌধুরী ও এমএ আজিজ নতুন এক মেরুকরণের মধ্যদিয়ে চট্টগ্রামের মুসলিম লীগের দূর্গে বিরাট এক আঘাত হানেন। তারা সুকৌশলে সাতকানিয়ার আহাম্মদ চৌধুরী এমপির ছেলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে, ফটিকছড়ির মীর্জা আবু এমপির ছেলে মীর্জা মহসীনকে আর মীর সরাইয়ের এমপি সৈয়দুর রহমানের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে, আনোয়ারার ফেছু মিঞা এমপির ছেলে আতাউর রহমান খান কায়সারকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিয়ে মুসলিম লীগের কেল্লায় সফল আঘাত হানেন। সে সময় বশিরুজ্জামানের অকাল মৃত্যুতে তার ভাই আখতারুজ্জামান চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়- আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া অংশ থেকে। সবাই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু খুব অল্প বয়সে প্রাদেশিক পরিষদের এমপি নির্বাচিত হন। তিনি পটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ওই বছর ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনার সময়ে শিক্ষা বৃত্তি নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়ন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে যান। পরে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আসেন। এরপর ১৯৬৫ সালে বড় ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করেন। বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে তিনি ব্যবসারও হাল ধরেন। ভাগ্যের ভরপুত্র আখতারুজ্জামানের হাতে ব্যবসারও প্রচুর উন্নতি হয়।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি ১৯৬৭ সালে। ১৯৬৮ সালে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন। তার ধারাবাহিকতায় তিনি সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলে তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দল পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখায় কারাভোগসহ নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তিনি হয়ে উঠেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত শীর্ষ নেতা। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ১৯৭০, ১৯৮৬, ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছিলেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। চার বারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য বাবু আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য ছিলেন এবং নবম জাতীয় সংসদে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন।
আখতারুজ্জামান চৌধুরী ছিলেন হাত খোলা স্বভাবের লোক। অকাতরে মানুষের সুখে দুঃখে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। গরীব কোনও লোক তার কাছে এসে খালি হাতে ফিরে যেতেন না। ১৯৭৫ সালের পরে আওয়ামী লীগের যখন দুর্দিন তখন তিনি অকাতরে আর্থিক সাহায্য প্রদান করেছিলেন। বর্তমান ভূমি মন্ত্রী আখতারুজ্জামান চৌধুরীর বড় ছেলে। তিনিও তার মরহুম পিতার স্বভাবের লোক, মানুষের সেবায় রাজনীতি করেন।
আখতারুজ্জামান চৌধুরী জীবন যাপনে স্টাইলিস্ট ছিলেন। নবাবিয়ানা হালে চলতেন। কিন্তু তার সেই নবাবিয়ানা তাকে কখনও গরীব মানুষ থেকে পৃথক করেনি। ২০১২ সালের ৪ঠা নভেম্বর তিনি অকাল মৃত্যবরণ করেন। তার মৃত্যু শুধু চট্টগ্রামের মানুষের নয়, আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য ছিল অপূরণীয় ক্ষতির।
anisalamgir@gmail.com

