এশিয়ার বৃহত্তম কাপ্তাই লেকে ২০০৩ সালে রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছের উৎপাদন ছিল ১১৯ মেট্রিক টন। কিন্তু প্রকৃতি ও মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে দূষণের কবলে তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্যতা হারানোয় ১৩’বছরের ব্যবধানে ২০১৬ সালে এসে এই উৎপাদন পরিমাণ দাড়ায় মাত্র ৫ মেট্রিক টনে। পাশাপাশি কমেছে অন্যান্য মাছের পরিমাণও। কাপ্তাই লেক উদ্ধারে প্রথমবারের মত ‘গবেষণা তরী’ ভাসানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু)।
সংশ্লিষ্ঠরা জানায়,বৃহস্পতিবার (২৮নভেম্বর) সকাল ১০টায় গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কাপ্তাই লেকে নির্মিত বিশেষায়িত গবেষণাতরী ‘সিভাসু রিসার্চ ভেসেল’ এর উদ্বোধন করবেন।
লেক ব্যবস্থাপনা, লেকের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন, কোন উদ্যোগ নিলে লেকের মাছ বৃদ্ধি পাবে, লেক নিয়ে জরিপ পরিচালনা, মাছ কমে যাওয়ার কারণ ও প্রতিকারসহ নানা বিষয় নিয়ে কাজ করবে গবেষণা তরীটি। ৬৮’হাজার হেক্টর আয়তনের কাপ্তাই লেকে পূর্ণ জোয়ারেও চলাচল করার ক্ষমতা-সম্পন্ন ভ্রাম্যমান এই জাহাজ নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে কাপ্তাই লেক ও তার জীবনচিত্রকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে স্থানীয়রা বলছেন, গবেষণার পর কাগজে কলমে আটকে না থেকে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতায় এশিয়ার ঐতিহ্যের স্বারক খ্যাত এই লেকের নাব্যতা বাড়নো হলে আবারও প্রাণ ফিরবে পাহাড়ে।
রাঙামাটির পুরাতন হেলিপ্যাড এলাকায় নারায়নগঞ্জের একটি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়’ (সিভাসু) এর মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ৩’কোটি ৮৬’লাখ টাকা ব্যয়ে শুরু করে তরীর নির্মাণ কাজ। নির্মাণের পর চলতি বছরের জানুয়ারীতেই কাপ্তাই লেকে পরীক্ষামূলকভাবে ভাসানো হয় জাহাজটি। এদিকে নির্মিত জাহাজের অভ্যান্তরে রয়েছে ল্যাব। জাহাজটির মাধ্যমে কাপ্তাই লেকের মাছ কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান ও সংরক্ষণে নানা পরিকল্পনা-উদ্যোগ এবং সিভানুর এমএস ও পিএইচডি লেভেলের শিক্ষার্থীরা সারা বছর গবেষণা চালাতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন, সিভাসুর মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এম নুরুল আবছার খান।
লেকের বিভিন্ন প্রজাতির মাছের হার বের করা, মাছের অভয়াশ্রম সৃষ্টির জন্য স্থান নির্বাচন করা, সময়ের সঙ্গে লেকের বিভিন্ন ভৌত রাসায়নিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা, বিলুপ্তপ্রায় মৎস্য প্রজাতি বের করা, বিভিন্ন মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের বাস্তব অবস্থা নিরুপন, প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা, স্থানীয় জনশক্তিকে খাঁচায় ও পেন কালচারের মাথ্যমে মাছ চাষে উদ্যোগী করা, ঘোনায় মাছ চাষের সুবিধা-অসুবিধা যাচাই করা, লেকের মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যের বিস্তৃতির বর্তমান অবস্থা নিরুপন, প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে করণীয় নির্ধারণ, লেক ভরাট হওয়ার কারণ উৎঘাটন-বিশ্লেষণ ও নিরুপণে উদ্যোগ এবং লেকের দূষণ দূরকরণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা বিষয়ে গবেষণার কাজ করবে জাহাজটি।
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ পরিচালক (জনসংযোগ) খলিলুর রহমান বলেন, মালয়েশিয়া তাদের কৃত্তিম হ্রদ ‘লেক কেনিয়র’ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা পরিচালনা করে। পরবর্তীতে তারা এই লেকে বিপন্ন প্রজাতির মাছের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেন। সেই হ্রদের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে কাপ্তাই লেকে নামানো হচ্ছে সিভাসু গবেষণা তরী। এই তরী ১৫’ধরণের কাজ করতে পারবে। বর্তমানে তরীটি ব্যবস্থাপনায় সাতজন কর্মরত আছেন। জাহাজটির তত্ত্বাবধান রয়েছেন সিভাসুর উপচার্য প্রফেসর ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, তৎকালীন ইংরেজ সরকার ১৯০৬ সালে সর্বপ্রথম কর্ণফুলী নদীর পানি দিয়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সম্ভাব্যতা যাচাই করে। পরবর্তীতে আমেরিকার অর্থায়নে ১৯৫৬ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করে পাকিস্তান সরকার। ১৯৬২ সালে ৬’শ ৭০’দশমিক ৬’মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫৪’দশমিক ৭’মিটার উচ্চতায় নির্মিত হয় বাঁধটি। কাপ্তাই লেক কেবল বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় হ্রদ। এই জলধারা রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই, রাঙামাটি সদর, বরকল, নানিয়ারচর, লংগদু, জুড়াইছড়ি, বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় বিস্তৃত।

