নিউজটি শেয়ার করুন

আজ পবিত্র ঈদুল আজহা

স্বরূপ ভট্টাচার্য: আজ শনিবার পবিত্র ঈদুল আজহা। কোরবানির ঈদ। মুসলমানদের অন্যতম এই প্রধান ধর্মীয় উৎসবে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঈদের নামাজ শেষে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায়ে পশু কোরবানি দেবেন।

বিশ্বের মুসলমান ১০ জিলহজ পশু কোরবানি করে থাকেন। তবে ১১ ও ১২ জিলহজও পশু কোরবানি করার বিধান রয়েছে।

কিন্তু করোনা মহামারী আর বন্যায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশের জনজীবনে ঈদুল ফিতরের মতোই পালিত হবে ঈদুল আজহা। তবে চট্টগ্রামে বন্যা না হওয়ায় অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে কিছুটা স্বস্তিতে কোরবানী দেবেন লাখো মুসলমান।

এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ঈদুল ফিতরের মতো এবারও ঈদগাহ মাঠ বা উন্মুক্ত স্থানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। ফলে চট্টগ্রামসহ  সারা দেশের মসজিদগুলোতেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সবাইকে ঈদের নামাজ পড়তে হবে। নামাজ শেষে কারও সঙ্গে কোলাকুলি বা হাত মেলানো যাবে না।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে।

মহামারীর কারণে আনন্দ কিছুটা কম হলেও সারা দেশে বিরাজ করছে ঈদের আমেজ। কিন্তু এ আমেজ পুরোপুরি উধাও দেশের বন্যাকবলিত ৩১ জেলায়। ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লক্ষাধিক মানুষ। এক মাসেরও অধিক সময় এসব জেলার মানুষ বানের পানিতে ভাসছে। এর ওপর শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। এতে চোখের পলকে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে নদীতীরের মানুষ। ইতোমধ্যে রাজধানীর আশপাশের এলাকাতেও প্রবেশ করেছে বন্যার পানি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলেই থাকতে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তারপরও চট্টগ্রাম শহর বা দেশের অন্য এলাকায় যারা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে থাকেন, তারা অনেকেই কষ্ট ভোগ করে বরাবরের মতো গ্রামের বাড়ি গেছেন। কিন্তু এই ঈদযাত্রায় অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। মাস্ক পরছেন না, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন না। ফলে করোনা সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, দেশে  শুক্রবার পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হিসাবে শনাক্ত হয়েছে দুই লাখ ৩৭ হাজার ৬৬১ জনে। এর মধ্যে মারা গেছে তিন হাজার ১১১ জন এবং সুস্থ হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৯৬০ জন। বাকিরা এখনো করোনা আক্রান্ত হিসেবেই আছে, যাদের মধ্যে হাসপাতালে আছে চার হাজারের বেশি মানুষ। অন্য আক্রান্তরা বাসায় অবস্থান করছে। আগের মতো আতঙ্ক না থাকলেও তাদের ঘরে ঈদ উদযাপনের আয়োজন না থাকাই স্বাভাবিক।

অন্যদিকে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের কাছে এবারের ঈদ আনন্দ আরো ফিকে হয়ে গেছে। নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে, কেউ বা আশ্রয় নিয়েছে বেড়িবাঁধের কাদাপানিতে। সেখানে তারা ঝুপড়ি বানিয়ে পার করছে দুর্যোগের সময়। আবার অনেকে বানের পানিতে হাবুডুবু খেয়েও নিজ নিজ ঘরে আটকে আছে। এসব মানুষের কাছে ঈদের আনন্দ বলতে কিছুই নেই। তারা এখন ত্রাণের অপেক্ষায় থাকে সব সময়।

আজ সকালে মুসল্লিরা নিকটস্থ মসজিদে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করবেন। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এবার ঈদগাহের পরিবর্তে শারীরিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে ঈদের জামাত। ফলে রাজধানীর হাইকোর্ট প্রাঙ্গণের জাতীয় ঈদগাহেও ঈদের প্রধান জামাত হবে না। কেন্দ্রীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হবে ঈদের ৬টি জামাত। কেবল জাতীয় ঈদগাহ নয়, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের যে কোনো ঈদগাহ কিংবা খোলা ময়দানে ঈদের জামাতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পরিবর্তে মসজিদে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করতে বলেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রেও ১৩ দফা শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

জানা যায়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ময়দানেও ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে একই কারণে এই ময়দানে গত ঈদুল ফিতরের জামাতও অনুষ্ঠিত হয়নি।

এছাড়া দেশের সাত বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলা ও গ্রামেও এবার সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ঈদগাহের পরিবর্তে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে। দ্বিতীয় জামাত হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। এছাড়া নগরীর আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে সকাল ৮টায় প্রথম এবং পৌনে ৯টায় দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এসব মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করবেন বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ সরকারের উধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

আজ থেকে চার হাজার বছর আগে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হজরত ইবরাহিম (আ.) তার ছেলে হজরত ইসমাইল (আ.)কে কোরবানি করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু আল্লাহর কৃপায় ও অপার কুদরতে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে যায়। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগের মহিমার কথা স্মরণ করে মুসলিম সম্প্রদায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখে পশু কোরবানি করে থাকে। উদ্দেশ্য আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করা। এই ঈদের পর দুই দিন পর্যন্ত (১১ ও ১২ জিলহজ) পশু কোরবানি করার ধর্মীয় বিধান রয়েছে।

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, সব ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীসহ বিশ্বের মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “এ বছর এমন একটা সময়ে ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মহামারী করোনার ছোবলে বিশ্ববাসী বিপর্য‌স্ত। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনেক মানুষই মানবেতর জীবনযাপন করছে। এসব মানুষের কল্যাণে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সকলকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

“করোনা মোকাবেলায় সকলকে সচেতন হতে হবে এবং জীবনযাপনে ও চলাফেরায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। নিজে সুস্থ থাকি, অন্যকেও সুস্থ রাখি- এটাই হোক এবারের ঈদুল আজহায় সকলের অঙ্গীকার।”

সবাইকে সরকার নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি দিতে এবং কোরবানির বর্জ্য অপসারণসহ সব কাজে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুক্রবার বিকালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভিডিওবার্তায় দেশবাসীকে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। বছর ঘুরে আমাদের মাঝে আবার এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। করোনাভাইরাস মহামারীর এই দুঃসময়ে সকল আঁধার কাটিয়ে ঈদুল আজহা আমাদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ।

“আসুন কোরবানির ত্যাগের মহীমায় উজ্জীবিত হয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করি। দেশ ও দেশের বাইরে অবস্থানরত সকল বাংলাদেশি ভাইবোনকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।”

করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন, ঈদ মোবারক।”

পৃথক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এবার আমরা এক সঙ্কটময় সময়ে ঈদুল আজহা উদ্যাপন করছি। করোনাভাইরাস সমগ্র বিশ্বকে স্থবির করে দিয়েছে। আমাদের সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা জনগণেকে সকল সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি।

“আল্লাহ বিপদে মানুষের ধৈর্য্য পরীক্ষা করেন। এসময় সকলকে অসীম ধৈর্য্য নিয়ে সহনশীল ও সহানুভূতিশীল মনে একে অপরকে সাহায্য করে যেতে হবে।”

এই বিপদের সময় স্বাস্থ্যকর্মী, ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, ব্যাংকার ও পরিচ্ছন্নতাকামীসহ যারা জীবন বাজি রেখে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন, তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান সরকারপ্রধান।

এদিকে ভাইরাসের বিস্তার রোধে টানা দুই মাসের লকডাউনে আয়-উপার্জনে টান পড়ে বেকায়দায় আছে বহু মানুষ। ঈদে গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সাধ্যে কুলায়নি তাদের।

দুঃসময়ের এই ঈদ পৃথিবীর সকল মানুষের দুর্যোগ মুক্ত হওয়ার বার্তা নিয়ে আসুক এটাই প্রত্যাশা।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে সিপ্লাসের সকল পাঠক, দর্শক, বিজ্ঞাপনদাতাসহ শুভাকাঙ্খীদের ’ ঈদ মোবারক”।