নিউজটি শেয়ার করুন

আতাউল হাকিম’র মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণ: `চট্টগ্রামের অগ্রসরমান সাংবাদিকতার প্রজ্জ্বল পুরুষ’

মঈনুদ্দীন কাদের লাভলু

চট্টগ্রামে  অগ্রসরমান  সাংবাদিকতা  পেশায় নেতৃস্থানীয় মূর্ত প্রতীকের নাম আতাউল  হাকিম।শিষ্টাচারী,নম্র,ভদ্র ও সুদর্শন একজন মানুষ। সাংবাদিক,সমাজ সংস্কারক,লেখক এবং সুবক্তা ছিলেন। জীবনের পরতে পরতে ,মানুষ,মানবিকতা ও সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডের সাথেই থাকতেন। চট্টগ্রামের সুশীল সমাজের একজন হিসেবে দীর্ঘসময় মুখর ছিলেন। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছাড়াও সাংবাদিক নেতা হিসেবে দায়িত্বশীল  ভূমিকা পালন করেন।

৩০ জুলাই ২০১৯ সালে বরেণ্য এ সাংবাদিক নেতার জীবনাবসান হয়। মৃত্যুর পূর্বে বেশ কয়েকবৎসর ধরে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। আতাউল হাকিম ছিলেন উনিশ শতকের চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী আব্দুল হাকিম চৌধুরীর নাতি। খাতুনগঞ্জের শীর্ষ ব্যবসায়ী দাদা আতাউল হাকিমের বাবাকে পড়ানোর জন্য খ্যাতনামা সুফি তত্ত্ববিদ সৈয়দ আহমদুল হককে লজিং মাষ্টার হিসেবে রেখেছিলেন। পিতার আমলে ব্যবসার অবস্থা খারাপ হয়ে যায় এবং সাংবাদিকতা পেশায়ই আতাউল হাকিমকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। আত্মীয় পরিমণ্ডলে ডাক নাম ‘রাজু’ হলেও আতাউল হাকিম জনপ্রিয় সাংবাদিক হিসেবে অতি পরিচিত একটি নাম। আতাউল হাকিম জীবদ্দশায় অত্যন্ত সজ্জন, সৎ ও মিষ্টভাষী মানুষ হিসেবে সমাদৃত ছিলেন।  তার লেখালেখিতে সমসাময়িকতা ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা প্ৰধান্যতা পেতো বেশি। তাছাড়া লেখা ও বক্তৃতায় রসবোধ থাকতো।  নিজে সুদর্শন ছিলেন ও চলাফেরায় ও পরিপাটি ছিলেন।

রাউজান উপজেলার সুলতানপুর ছিটিয়াপাড়ায় ১৯৫০ সালের ৭মার্চ এ গুণী সাংবাদিক জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল নুরুল ইসলাম। আতাউল হাকিম চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে সম্মান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৭৩ সালের ১০জানুয়ারী দৈনিক আজাদীতে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ঢাকা থেকে প্রকাশিত ডেইলি নিউজে চাকুরী নেন। পরবর্তীতে দৈনিক পূর্বকোনে যোগদান করে যুগ্ম বার্তা সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন এবং ৩২ বছরের চাকুরী জীবন দৈনিক পূর্বকোণের মাধ্যমেই অবসান ঘটে। অবশ্য মধ্যবর্তী সময়ে নিজ উদ্যোগে সাপ্তাহিক ‘বন্দরনগরী’ ও মাসিক ‘ক্রীড়া সন্দেশ’ বের করলেও নিয়মিত করা যায়নি। প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা ও ভাবধারার মানুষ যেমন ছিলেন তেমনি আত্মমর্যাদা গুন্ ও অগাধ দেশাত্মবোধ ছিলো আতাউল হাকিমের। সততা তাকে মহৎ করেছে। একরাতে অক্সিজেন থেকে এক যুবক মৃত্যু সংবাদ নিয়ে পূর্বকোণে এলো। যুবক হাকিম ভাইকে চিনেনা, কেউ তাকে পাঠিয়েছে ;৯৬ বছর বয়স্ক সাবেক কমিশনারের মৃত্যু সংবাদটি তিনি নিজে লিখে নিয়ে ছাপানোর নিশ্চয়তা দিলেন। এরপর ও যুবকটি গভীর রাত যেহেতু আশ্বস্ত হতে না পেরে হাকিম ভাইকে কয়েকটি পাঁচশত টাকার নোট দিতে গেলে, তিনি প্রচন্ড রেগে গিয়ে নিউজটি ছিঁড়ে যুবকটির মুখে ছুঁড়ে মারেন এবং দারোয়ান, পিয়ন ওনার চিৎকারে জড়ো হয়ে যুবকটিকে উনার পরিচয় দিয়ে বের করে দেন।

আতাউল হাকিম বলতেন, সাংবাদিক শুধু নয়; আইন শিক্ষা, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং সব পেশাই মহৎ। পেশায় জীবিকার সাথে সেবাও করা যায়। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ পেশাকে  কলুষিত করেছে।  তিনি বলেন সাংবাদিক টাকা খায়, শিক্ষক ব্যবসা করে, চিকিৎসকেরা কসাই, আইনজীবীরা নিরীহকে মামলায় জড়ায়।  কিন্তু এদের সংখ্যা নগন্য। নগন্যদের নিয়ে মাতামাতি না করে ভালো লোকদের প্রশংসা করলে, নগন্যরা বিলীন হয়ে পেশাজীবীর সম্মান বাড়বে। তিনি সম্মানের জন্য সাংবাদিকতা পেশায় এসেছিলেন। প্রাচীন অভিজাত পরিবারের উত্তরপুরুষ হিসেবে শিরদাঁড়া খাড়া করে সম্মানের সাথে এ পেশায় পুরো জীবন নিয়োজিত করেছেন। পেশাগত সংগঠন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের দুইবার সভাপতি এবং একবার সিইউজের সভাপতি ছিলেন। তিনি সাংবাদিকের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি সিটি কর্পোরেশন এর সহযোগিতায় জামালখান প্রেসক্লাবের পুরোনো ভবন ভেঙে বর্তমান বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন।

আতাউল হাকিম ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মিলেনিয়াম সামিটে এবং ৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে উত্তর কোরিয়া সফর করেন। জীবনের শুরুর  দিকে  তিনি পীরে কামেল হযরতুলহাজ্ব সৈয়দ আহমদ ছিরিকোটি (র:) এর সান্নিধ্য পেয়েছিলেন।

সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি প্রবন্ধ, ছড়া, উপন্যাস, রম্য রচনার মাধ্যমে তিনি সাহিত্য চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। ‘নিজগুনে ক্ষমা করবেন’ শিরোনামে পূর্বকোনে নিয়মিত লিখতেন। তাঁর অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ , নিবন্ধ, থাকলেও প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে ‘বিশ্বপুরুষ সম্মেলন’, ‘অমবস্যা চতুর্দিক’, ‘একান্ত ব্যক্তিগত’,’নিজগুনে ক্ষমা করবেন’। তাছাড়া শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’র মতো স্বাধীনতার আগে পরের বাস্তব ঘটনা তুলে ধরে বিস্তৃত কলেবরে গ্রন্থ প্রকাশের ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে  গেলো। তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যা  সন্তান রেখে যান। তার একমাত্র ছেলে রায়হান ইসলাম সোশ্যাল  ইসলামি ব্যাংকে কর্মরত আছেন।

সাংবাদিক আতাউল হাকিমকে চেনেননা চট্টগ্রামে এমন মানুষ বিরল। সভা – সেমিনারে, অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা ও মধ্যমনি থাকতেন তিনি। সৌখিন চলাফেরা এবং সমাজপতিদের দৃষ্টিআকর্ষনী বক্তৃতা তাঁর বড়ো গুন্ ছিলো। নীতি নৈতিকতার কঠিন মানুষটির কথার রসবোধ মোহনীয় ছিলো। জন্মভূমির প্রতি অগাধ ভালোবাসার কারণে রাউজানের অনুষ্ঠান, সংবাদ ও মানুষের কল্যাণের চিন্তা তাকে বিশেষভাবে নাড়া দিতো। সে হিসেবে সংগঠন ও লেখালেখির সুবাদে সমাজের অগ্রদূত হিসেবে আমি তাকে সবসময় কাছে পেয়েছি। যখন যেখানে অনুরোধ করেছি কখনো না করেননি।

অজপাড়াগাঁয়ের অনুষ্ঠানেও যাওয়ার অনীহা ছিলোনা। তাছাড়া রাউজান নিয়ে অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন  তম্মধ্যে ‘কাকের শহর চট্টগ্রাম রক্তে ভেজা রাউজান’, ‘রাউজানে রক্ত ঝরেনা ফুল ও ফোটে’ উল্লেখযোগ্য।

১৯৯৭ সালে রাউজান বিজয়মেলা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন এবং সফলভাবে মেলা সম্পন্ন করে সর্বমহলে প্রশংসিত হন।  এসময় আমি তাঁর সাথে প্রচার কমিটিতে থেকে শহর থেকে একসাথে নিয়মিত যাওয়া আসা করেছি। নেতৃত্ব , নির্দেশনা, পরামর্শ  ও আলোচনায় প্রানান্ত ভূমিকা ছিলো মেলার প্রতিটি দিন  কিভাবে নিখুঁত করা যায়। প্রেসরিলিজের দায়িত্ব ছিলো আমার উপর ;প্রতিদিন অনুষ্ঠান শেষে কি তাগাদা কখন কি নিউজ পাঠাচ্ছি! এরকম অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে এই প্রিয় মানুষটির সাথে।

জীবদ্দশায় অগুনতি সম্মাননা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। বিনয় ও মানব প্রেম তাঁর পরিচিতিকে অধিকতর সমৃদ্ধ করেছে।  তিনি চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা কমিটির একজন;জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নুরুল ইসলামের সাথে ধূমপানবিরোধী আন্দোলন এবং চট্টগ্রামের মূক বধিরদের জন্য সংগঠন ও স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িত ছিলেন।

আমাদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণার উৎস আতাউল হাকিম’র শূণ্যতা যেন পূরণ

হবার নয়। সৃষ্টিশীল কাজেও এখন প্রেরণাদাতার বড় সংকট বর্তমান

সমাজে। অনন্তকালের পরপারে ভালো থাকুন চট্টগ্রামের অগ্রসরমান সাংবাদিকতার প্রোজ্জ্বল পুরুষ।

 

লেখক:কলামিস্ট শিক্ষাবিদ