নিজস্ব প্রতিবেদক: এখন কোপা আমেরিকার(কোপা ২০২০) খেলা চলছে।স্যাটেলাইট আর ইন্টারনেটের বদৌলতে প্রায় সবাই নিজ নিজ প্রিয় দলের খেলা দেখছেন। স্বভাবতই বাংলাদেশেও খেলার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। চায়ের দোকান থেকে ফেসবুক,টুইটার হয়ে টিকটক ,লাইকিতেও কোপার উত্তেজনা টের পাওয়া যাচ্ছে। কারন বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই ফুটবল প্রেমী। আর এখানকার মানুষের কাছে ফুটবল মানেই আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল!
কোপা আমেরিকা কাপ সাধারণত দক্ষিণ আমেরিকা বা লাতিন আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলো নিয়ে আয়োজিত হয়ে থাকে। দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের সব দেশেই প্রচুর কালোদের অংশগ্রহন দেখা যায়।ব্রাজিলে প্রচুর কালো খেলোয়াড় দেখা গেলেও আর্জেন্টিনায় কোন কালো খেলোয়াড় দেখা যায় না। একারণে অনেকেই আর্জেন্টিনাকে ইউরোপের সাদা মানুষের দেশ হিসেবে ভুল করে বসে। ইদানীংকালে এরকম একটি ভিডিও ফেসবুক ও টিকটকে ভাইরাল হয়েছে যেখানে আর্জেন্টিনা ভক্তদের বলতে দেখা গেছে আর্জেন্টিনা ইউরোপের দেশ! যেহেতু এ দলের সব খেলোয়াড়দের গায়ের রঙই সাদা!
তাহলে,আর্জেন্টিনায় কি কালো মানুষের বসবাস ছিল না?আর যদি থেকেই থাকে তাহলে তারা গেল কোথায়? কিভাবে তারা ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল?
এসবের উত্তরে আছে এক বিষাদময় ইতিহাস। যেখানে রয়েছে ‘সাদা’ আর্জেন্টিনার বর্ণবাদের “কালো” ইতিহাস।
ইউরোপীয়দের দাস ব্যবসার সূত্র ধরে আর্জেন্টিনায় আফ্রিকার কালো দাসদের প্রথম চালান আসে ১৫৮৭ সালে, রিও দ্য লা প্লাতা দ্বীপে। এরপর নিয়মিত দাসরা আসতে থাকে।শুধু তাই নয় আর্জেন্টিনার কর্দোবা পরিণত হয় দাসবাণিজ্যের ‘ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার’-এ। মূলত এখান থেকেই দাসেরা পরবর্তীতে ১৮ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে সান্তিয়াগো দেল এস্তেরো, কাতামার্সা, সালতাসহ আর্জেন্টিনার নানা প্রদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
১৬০১ থেকে ১৮৬৬ পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় এসেছিল প্রায় ৬৪,০০০ আফ্রিকান দাস। এরা মূলত কৃষিকাজ করত। এদের বসবাস ছিল সাধারণত জঙ্গলাকীর্ন এলাকায়।
১৭০০ সালের দিকে আর্জেন্টিনার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং রাজধানীর ৪০-৪২ ভাগই ছিলো কৃষ্ণাঙ্গ অথবা মুলাট্টো (সংকর)। এমনকি ১৮ শতকের শেষ দশকের দিকেও বুয়েন্স এইরেসের তিন ভাগের একভাগ জনসংখ্যাই ছিলো আফ্রো-আর্জেন্টাইন। ১৮০০ সালে আর্জেন্টিনার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ ছিল কালোরা। ১৮ শতকের শেষ দশকেও আর্জেন্টিনার ১৮৭০০০ মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৬৯০০০ ছিল কালোরা।
কিন্তু ২০১০ সালের আদমশুমারি অনুসারে কালোদের সংখ্যা ছিল শুধুমাত্র ১৫০,০০০ যখন মোট জনসংখ্যা চার কোটি দশ লাখ! আনুপাতিক হারে ধরলে ০.৩৬৫ ভাগ শুধুমাত্র!
তাহলে তারা কিভাবে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল?
তাদের আসলে ইচ্ছে করেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। ১৮১৩ সালে আর্জেন্টিনায় দাসপ্রথা কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তবু ব্রিটেন ১৮৪০ অবধি দাসবাণিজ্য করে গেছে আর্জেন্টিনায় এবং ১৮৫৩ পর্যন্ত দাসব্যবসা অব্যাহত ছিলো সেখানে। এরপরেই মূলত কালো আর্জেন্টাইরা হারিয়ে যেতে থাকে!
১৮৬৫-৭০ এ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মিত্রশক্তির বিপরীতে প্যারাগুয়ের তুমুল লড়াই হয়। আর্জেন্টিনার সেসময়কার রাষ্ট্রপতি ডমিঙ্গো ফস্তিনো সারমিয়েন্তো কৃষ্ণাঙ্গদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন। চুক্তিভূক্ত এসব আফ্রো-আর্জেন্টাইন সেনারাই পরে যুদ্ধে মারা পড়েছে হাজারে হাজারে।যুদ্ধে এদেরকে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে ব্যবহার করা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে। ফল স্বরূপ কালোরা যুদ্ধে প্রচুর পরিমানে মারা পরে।
আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি ডমিঙ্গো ফস্তিনো সারমিয়েন্তো কৃষ্ণাঙ্গদের কেবল যুদ্ধের অগ্নিমুখে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি। বরং সজ্ঞানে আফ্রো-আর্জেন্টাইনদের বসতি গড়তে বাধ্য করেছিলেন গহীন-প্রত্যন্ত অঞ্চলে।যেখানে নাগরিক সুযোগ সুবিধা নেই বললেই চলে। চিকিৎসা ব্যবস্থা নামক কিছুই ছিলনা সেখানে। সেসব রোগপ্রবণ অঞ্চলে ছিলো না জীবনধারণের ন্যুনতম সুবিধা। ফলাফলস্বরূপ, ষাটের দশকে পীতজ্বর ও সত্তরের দশকে কলেরার মহামারীতে প্রাণ যায় অসংখ্য কৃষ্ণাঙ্গের।
শুধু পরোক্ষভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যুই নিশ্চিত করেননি সারমিয়েন্তো, অনেককে নানান উসিলায় গণহারে মৃত্যুদণ্ডও দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার “সাদাকরন” এর এটিই সবচেয়ে নৃশংস অধ্যায়।
এসবের পর আর্জেন্টিনার কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে দেখা দেয় মারাত্মক লৈঙ্গিক ভারসাম্যহীনতা। নারীদের অনুপাতে পুরুষ কমে গেলো। কিছু নারী সাদাদের সাথে ঘর বাঁধলেন বটে,কিন্তু তার দরুণ জন্ম নিলো মুলাট্টোদের(মিশ্র) একটি প্রজন্ম। তবে অধিকাংশ চলে যেতে লাগলেন ব্রাজিল ও উরুগুয়েতে, লাতিন আমেরিকায় এরা সবসময়ই কালোদের ব্যাপারে তুলনামূলক ভাবে উদার ছিলো। ১৮৫৩ সালে সংবিধান রচনা করে আর্জেন্টিনায় ইউরোপ থেকে শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর নীতি গৃহীত হয় ।
এর ফলে ১৮৬১ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত শুধু ইতালি থেকে ২৭ লাখ সাদা অভিবাসী আর্জেন্টিনায় আসে।একদিকে ইউরোপ থেকে সাদাদের গণহারে আগমণ আরেকদিকে আর্জেন্টিনার অবশিষ্ট কালোরা রাষ্ট্রীয় ও জাতিগত রোষের শিকার হয়ে গণহারে দেশত্যাগ। এই দুয়ের ফলাফলে কালো আর্জেন্টাইনরা এক প্রকার নাইই হয়ে যায়। তাই তো ১৮ শতকের শেষ দিকেও যারা মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ ছিল তারা এই শতকের শুরুতে হয়ে গেল ০.৩৬৫ ভাগ!
১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯ অবধি ক্ষমতায় থাকা আর্জেন্টাইন রাষ্ট্রপতি কার্লোস মেনেম একবার বলেছিলেন,
“আর্জেন্টিনায় কোনো কালোমানুষ নেই। ওটা কেবল ব্রাজিলেরই সমস্যা!”
২০১০ সালের আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে কালোদের কোন আদমশুমারিই করা হয়নি। George Reid Andrews’s 2004 book “Afro-Latin America.” বইতে আর্জেন্টিনার কালোদের ইতিহাসের অনেকটাই খুঁজে পাওয়া যায়।
মূলত আর্জেন্টিনায় এখন কালো হিসেবে যাদের ধরা হয়, এদের বেশিরভাগই সংকর। ককেশীয় ও আদিবাসীদের সাথে আফ্রিকানদের সংকর তারা। বর্তমানে গায়ের রঙ কিছুটা কালো হলেই তাকে এমনকি মধ্য-এশীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসী হলেও আর্জেন্টিনায় তাদের ‘নিগ্রো’ বলা হয়! বুয়েন্স এইরেসের কাতোলিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতাত্ত্বিক আলেহান্দ্রো ফ্রিহেরিওর ভাষ্য এমনটাই।
আর্জেন্টাইন সাবেক রাষ্ট্রপতি কার্লোস মেনেমের মত হয়তো অধিকাংশ আর্জেন্টাইনও নিজেদের ” সাদা দেশ” হওয়া নিয়ে মনে মনে গর্ব করে । কিন্তু যখন তাদের এই কলংকিত ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন উঠে তখন তারা নিজেদের কি জবাব দেয়?

