ড. মাসুম চৌধুরী
মানুষের উপর ফরজ সমূহ প্রযোজ্য হয় প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর। আর সব ফরজ মৃত্যুর পূর্বেই শেষ হয়ে যায়। সুন্নাতের যাত্রা জন্ম হতে শুরু কিন্তু মৃত্যুর পরও সঙ্গ ত্যাগ করে না। নবজাতকের আজান, ইকামাত, মিষ্টিমুখ, নাম রাখা, মাথামুণ্ডিয়ে চুলের ওজন পরিমাণ স্বর্ণ বা রূপা সদকা, খৎনা করা সবই সুন্নাত। জীবন শেষে মৃত্যুবরণ করা, ইছালে সওয়াব, কবরে সালাম ও জিয়ারত করা সুন্নাত। জীবনজুড়ে রয়েছে সুন্নাত, ফরজ নয়। সকল ফরজই নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত কিন্তু সকল সুন্নাত ফরজ নয়।তাই আমাদের জামায়াতের নাম ‘আহলে সুন্নাত’ আহলে ফরজ নয়। কিন্তু জ্ঞান সাধনা এক ব্যতিক্রম ফরজ যা জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত সাধনা করা বাধ্যতামূলক। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘উতলুবুল ইলমা মিনাল মাহদি ইলাল লাহাদ’ দোলনা হতে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন ফরজ।
বর্তমান কালে আধুনিক রাষ্ট্রগুলো জীবনভর শিক্ষার কথা উচ্চারণ করলেও এটি কোনো নতুন কথা নয়, এটি ইসলামের চৌদ্দশত বছর পূর্বের উচ্চারিত কথা। এখন ছাত্র ছাত্রীর পরিবর্তে লেখা হয় ‘শিক্ষার্থী’। ছাত্রত্বের সময় সীমিত কিন্তু শিক্ষার সময় অসীম। জীবনভর। সে-ই ভালো শিক্ষক যে জীবনভর শিক্ষার্থী। দেশে দেশে সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে করেছে বাধ্যতামূলক। আর ইসলাম চৌদ্দ শত বছর পূর্বেই করেছে ফরজ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘তলবুল ইলমা ফরিদাতুন আলা কুল্লে মুসলেমুন ওয়া মুসলেমাত’ জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিম নর নারীর জন্য ফরজ।
দুনিয়ার সেরা সাময়িকী ‘টাইম’ কয়েক বছর পূর্বে প্রচ্ছদ করেছে,’একুশ শতকের সম্পদ কী’? স্বর্ণ তেল গ্যাসের খনি নয়, ডায়মন্ডের খনি নয়, বিমান রকেটের ফ্যাক্টরিও নয়, একুশ শতকের সেরা সম্পদ ‘জ্ঞান’। এটি আধুনিক কালের সেরা সাময়িকীর গবেষণা হলেও এটিও চৌদ্দ শত বছর পূর্বে অন্ধকার যুগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোকিত কথা। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘জ্ঞানের চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই, মুর্খতার চেয়ে বড় কোনো দারিদ্র্যতা নেই’।
এই সম্পদ অর্জন সহজ নয়, অর্জনে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘উতলুবুল ইলমা ওয়ালাউ কানা বিসচীন’ জ্ঞান অর্জন করো যদি সেই জ্ঞান চীনের হয়।
বহু অমুসলিম দূর দেশের নাম প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জানা থাকা সত্বেও চীন নামটি উচ্চারণের রহস্য কী? যে স্থানে দাঁড়িয়ে তিনি হাদিসটি বর্ণনা করেছিলেন, সেই আরব মরুভূমি সাথে চীনের আকাশ পথ, নৌপথ, গিরিপথ, স্থলপথ কিছুই ছিলো না। মাঝপথে দাঁড়িয়ে অাছে হিমালয়ের মত শত শত বরফের পাহাড়। জ্ঞান এমন অমূল্য সম্পদ যদি তা হিমালয় পর্বত পেরিয়ে আত্মস্থ করতে হয় তা করাই ছিলো হাদিসের নির্দেশ।
হাদিস শাস্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র ঈমাম বোখারী (রহ.) একটি হাদিস সংগ্রহ করতে তিন শত মাইল পায়ে হেটেছেন। কঠোর পরিশ্রম করে হাদিসের পর হাদিস সংগ্রহ করতে করতে তিনি একদিন হয়ে যান হাদিস শাস্ত্রের সেরা গ্রন্থের প্রণেতা।
হাদিস শাস্ত্র বিশারদগণ হাজার হাজার মাইল ঘোড়ায় করে, গাধায় করে, পায়ে হেঁটে হাদিস সংগ্রহ করেন, আর সে কোরআন হাদিসের বাণী আউলিয়া কেরামগণ হাজার হাজার মাইল কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে দুনিয়া ব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন। তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। এখন সে কোরআন হাদিস সবই আমাদের নিকট রয়েছে, ইচ্ছে করলে যে কেউ তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সেকেন্ডেই দুনিয়া ব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পরে। কিন্তু তা পড়ে কেউ কী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে? কেন গ্রহণ করবে না আমাদের ভাবতে হবে।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ইসলাম আছে কেতাবে, মুসলিম আছে গোরস্থানে’।
কিতাব এবং জান্নাতুল বাকীতে যে সাহাবায়ে কেরাম শুয়ে আছে তাঁদের আদর্শ আমরা অন্তরে ধারণ করতে পারিনি। তাই ইসলামের আদর্শ এখন মানুষকে আকর্ষণ করে না।
মানুষ সাধনার কারণে অসাধারণ হতে পারে। তার প্রমাণ পৃথিবী নামক গ্রহটির মধ্যে হাজার হাজার রয়েছে। দুনিয়ার ৬০% মুসলমান ঈমাম আজম আবু হানিফা (রহ.)’র মাজহাবের অনুসারী। ইমামের দাদা ছিলেন একজন ইরাণী কৃতদাস। তাঁর পিতা সাধনা করে বড় ব্যবসায়ী হন। ঈমাম ব্যবসায়ীর সন্তান হিসেবে নিজকে ব্যবসায় সীমাবদ্ধ না রেখে নিজের সাধনায় হয়ে যান মহান ইসলামী আইন শাস্ত্রের বিদগ্ধ পণ্ডিত। তিনি চল্লিশ জন ইসলামি স্কলার নিয়ে গঠন করেন আইন শাস্ত্রের এক অসাধারণ পর্ষদ। তাঁদের ত্রিশ বছরের সাধনায় জগতের মুসলমানদের জন্য রচনা করেন মুসলিম আইন শাস্ত্রের মহাকোষ। দুনিয়ার মধ্যে তার সমকক্ষ কোন ইসলামি আইনকোষ নেই।
মহা তাপস হাসান বসরি (রহ.) ছিলেন, হাদিস ফিকাহ এবং তাসাউফ শাস্ত্রের একজন বড় ঈমাম। অথচ তাঁর বাবা মা দু’জনই ছিলেন ক্রীতদাস। বড় হওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছেই ক্রীতদাসের সন্তানকেও জগৎ বিখ্যাত করে তুলে।
ঈমাম শাফেয়ী (রহ.) নিয়মিত রোগাক্রান্ত থাকতেন। জীবনে এক সাথে ত্রিশটি রোগেও ভুগেছেন। যতটুকু তিনি হায়াতে জিন্দেগী পেয়েছেন, এ সময়ে স্বাভাবিক ভাবে যতটুকু লেখার কথা কঠোর সাধনায় তিনি দশগুণ বেশি লেখেন।প্রতিদিন এক খতম কোরআন পড়তেন। কঠোর সাধনায় তিনি দুনিয়ার মুসলমানদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন।
ঈমাম নববী (রহ.) জীবনে কঠোর সাধনায় যতগুলো গ্রন্থ রচনা করেন, কোনো মানুষের পক্ষে একজীবনে এতগুলো গ্রন্থ পাঠ করাই কঠিন।
মধ্যযুগে জন্মগ্রহণ করে বিজ্ঞানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যান, ‘আল রাযী’। তিনি কঠোর পরিশ্রম করে পড়তে পড়তে এক সময় দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু মনের দৃষ্টি বিকশিত হওয়ায় অন্যদের দ্বারা বইয়ের পাঠ শুনতেন এবং লেখাতেন। লেখতে লেখতে তিনি একদিন হয়ে যান ১৮৪ গ্রন্থের রচয়িতা।
কঠোর পরিশ্রমী দক্ষ প্রশাসক বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাকতুম (রাঃ) ছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। কপালের চক্ষু দিয়ে নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে না পেলেও রুহানি শক্তি দ্বারা চিনতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনের আয়াত নাজিল করেন। এই সাহাবীকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতবেশী ভালবাসতেন তিনি মদীনার বাইরে সফরে গেলে তাঁকে মদিনার অস্থায়ী শাসক নিয়োগ করতেন।
রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান কঠোর পরিশ্রম করে রচনা করেন হাজারের অধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এ সবের মধ্যে চিকিৎসা শাস্ত্রের পাঁচ শত গ্রন্থসহ রয়েছে প্রচুর বিজ্ঞানের বই। হয়তো ভাবতে পারেন আকারে এ সব পুস্তিকা। তা সঠিক নয়। তাঁর একটি গ্রন্থ দুই হাজার পৃষ্ঠারও অধিক ছিলো। সাধনায় জীবন উৎসর্গের কারণেই জ্ঞানের স্বর্ণ শিখরে তাঁর আরোহন। সাধনা তিক্ত কিন্তু তার ফল সুমিষ্ট। (চলমান)

