আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানকে ‘শেখ হাসিনার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জুয়া, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে এই অভিযান সারা দেশে চালানো হবে।
‘গুটিকয়েক’ অপরাধীর কারণে পুরো দলের বদনাম মেনে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আলোচনা সভায় চলমান অভিযানে অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্তি করেন দলটির নেতাকর্মীরা।
শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যাতে কেউ ‘কালিমা লেপন’ করতে না পারে সেজন্য অবৈধ ক্যাসিনোর অর্থের সন্ধানসহ দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের বলেন, “অপকর্মকারীদের প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। তাদের জন্য এত উন্নয়ন, অর্জন ম্লান হতে পারে না। আমাদের নেত্রী কষ্ট করে, পরিশ্রম করে যে অর্জন করেছেন তা আমাদের গুটিকয়েকের জন্য ম্লান হতে দিতে পারি না।”
চলতি মাসের মাঝামাঝিতে এক দলীয় সভায় চাঁদাবাজির অভিযোগের মুখে থাকা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এরপর ঢাকার মতিঝিলের ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রে অভিযান চালায় র্যাব। এসব ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো মেলার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনায় যুবলীগ নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়।
ওই দিনই গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে, পরদিন কলাবাগান ক্লাব থেকে গ্রেপ্তার করা হয় কৃষক লীগের নেতা শফিকুল আলম ফিরোজকে। দুদিন পর গ্রেপ্তার করা হয় ঠিকাদার জি এম শামীমকে, যিনিও যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন।
এরপর গেণ্ডারিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা দুই ভাইয়ের বাড়ি এবং তাদের এক বন্ধু ও এক কর্মচারীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সিন্দুকে ভরা চার কোটি টাকা এবং বিপুল পরিমাণ সোনার গহনা উদ্ধার করে র্যাব।
এই অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, “শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্রুসেড শুরু করেছেন। দিস ইজ আ ক্রুসেড এগেনস্ট করাপশন।
“অপকর্মের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে, টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে। এই অ্যাকশন শুধু ঢাকা শহরে নয়, সারা বাংলায় হবে। আজকে গুটিকয়েক অপকর্মকারী, দুর্নামকারী, দুর্নীতিবাজের জন্য গোটা পার্টির বদনাম হতে পারে না।”
উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে প্রশ্ন রেখে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, “আমরা কি গুটিকয়েকের জন্য গোটা পার্টি এই বদনামের ভাগিদার হব? আমাদের ইমেজকে যারা ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার এ লড়াই, অ্যাকশন আপনারা সমর্থন করেন? সবাই ঐক্যবদ্ধ আছেন?”
তখন উপস্থিত নেতাকর্মীরা হাত তুলে অভিযানের পক্ষে সমর্থন জানান।
সভাপতির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমুও চলমান অভিযানের পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য শেখ হাসিনা মদ ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
বাংলাদেশে মদ-জুয়া চালুর জন্য বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে দায়ী করেন বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা আমু।
তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর সময় রেসকোর্স থেকে জুয়া খেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই আমলে একমাত্র হোটেল ইন্টারকন্টিনালে বিদেশিদের জন্য মদ পাওয়া যেত। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর পানের দোকানদারও মদ বিক্রি করত।
“জিয়া মদের লাইন্সেস জাতীয়করণ করেছিল, সেই সময়ে হাউজি থেকে শুরু করে জুয়া খেলার সূত্রপাত্র হয়। আজকে বিএনপির বক্তৃতা শুনলে বোঝা যায়, তারা শেখ হাসিনার কাজকে সমালোচনা করছে, তারা সমর্থন করতে পারছেন না। কারণ তাদের আতে ঘাঁ লাগছে তাই।
“তারা বলছে, কেঁচো খুড়তে সাপ বের হবে। কারণ এই জুয়ার উৎপত্তি জিয়ার আমল থেকে। তাই তারা আগে থেকেই ‘ডিফেনসিভে’ গিয়ে এটার সমালোচনা শুরু করেছে।”
সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, “আজকে কিছু অনুপ্রবেশকারী দলে প্রবেশ করে আমাদের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ বিশাল রাজনৈতিক দল, কত দল এদেশে এসছিল কিন্তু আজকে খুঁজে পাওয়া যায় না।”
আওয়ামী লীগ সরকার জঙ্গি দমনে যেভাবে সফল হয়েছে, সেই একইভাবে ক্যাসিনো, জুয়া ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, “প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন, এবার দুর্নীতি, ক্যাসিনো, জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন।
“ইনশাল্লাহ এটাও নির্মূল হবে। দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে নির্মূল করা হবে।”
আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ ও উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিনের সঞ্চালনায় সভায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামও বক্তব্য দেন।
অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, সাহারা খাতুন, আব্দুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, আহমদ হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শামসুন্নাহার চাঁপা, দেলোয়ার হোসেন, আফজাল হোসেন, বিপ্লব বড়ুয়া, এস এম কামাল হোসেন, রিয়াজুল কবীর কাওসার, আজমত উল্লাহ খান, গোলাম রব্বানী চিনু প্রমুখ বক্তব্য দেন।








