সিপ্লাস প্রতিবেদক : দেশের করোনা মহামারির বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অগ্রভাগে থাকা চিকিৎসক ও চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত নার্স সহ সকলের নিরাপত্তার জন্যে পিপিই সহ নানান সামগ্রীর পর্যাপ্ত মজুদ আছে বলা হলেও এসব পণ্যের মান নিয়ে খোদ চিকিৎসকরাই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷ এছাড়া এখন অব্দি চট্টগ্রামসহ দেশের কোথাও সরকারের পক্ষ থেকে করোনার ঝুঁকি মোকাবেলায় অধিক কার্যকর এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করা না হলেও আগামী ৪-৫ দিনের মধ্যে বিদেশ থেকে এই এন-৯৫ মাস্ক এসে পৌছাবে বলে আশা প্রকাশ করছে দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এক নিয়ে চিকিৎসক নেতার আহাজারি ‘গলা ফাটাইয়া বলতে চাই চট্টগ্রামের কোথাও এন-৯৫ মাস্ক নাই’।
ইতিমধ্যে এক চিকিৎসকের করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের মাঝে আতংকের পাশাপাশি ক্ষোভ দেখা দিচ্ছে৷ গত বুধবার ভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে এন-৯৫ মাস্ক না পেয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বরগুনার এক চিকিৎসক। তিনি করোনাভাইরাস সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবার ওপরে প্রশিক্ষণ পাওয়া জেলার চার চিকিৎসকদের একজন। কামরুল আজাদ নামের ওই চিকিৎসক বুধবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুকে একটি লেখা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আমাকে এন-৯৫ মাস্ক দিন অথবা মৃত্যুর মাধ্যমে পালাতে দিন। লোকদেখানো বাজারের ব্যাগের কাপড় দিয়ে তৈরি গাউন দেওয়া বন্ধ করুন।’
জানা গেছে কামরুল আজাদ বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত।
এদিকে গতকাল (১৬ এপ্রিল বৃহস্পতিবার) বিকেলে বিএমএ চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক ডাঃ ফায়সাল ইকবাল চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লিখেছেন,”মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গলা ফাটাইয়া বলতে চাই চট্টগ্রামের কোথাও একটা N95 মাস্ক সরবরাহ করা হয় নাই৷ গ্লাবস ও সংকট। পিপিই মান সম্মত নয়”৷
এই বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ডাঃ হাসান শাহরিয়ার কবীরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিপ্লাসকে বলেন,”এন ৯৫ মাস্কটি সরকারের পক্ষ থেকে দেশের কোথাও সরবরাহ করা হয়নি৷ এটা বাংলাদেশে প্রস্তুত নয় না এবং সারাবিশ্ব জুড়ে এই মাস্ককের সংকট রয়েছে”৷ তবে এই এন৯৫ মাস্ক ছাড়া ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের সকল স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে পর্যাপ্ত পরিমানে পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে বলে তিনি জানান৷ এই এন৯৫ মাস্কটি যারা সরাসরি করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থাকে তাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে৷ পিপিই মানসম্মত নয় বিএমএ সাধারণ সম্পাদকের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, সারা দেশে যে মানের পিপিই সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হয়েছে চট্টগ্রামেও একই মানের পিপিই দেয়া হয়েছে। যেহেতু এটা কেন্দ্র থেকেই সরবরাহ করা হয় এর মাননিয়ে আমাদের কোন বক্তব্য নেই৷ তবে আগামী ৪-৫ দিনের মধ্যে বিদেশ থেকে এন৯৫ মাস্ক দেশে এসে পৌছাতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডাঃ হাসান শাহরিয়ার কবীর।
জানা গেছে এই এন-৯৫ মাস্কটি মূলত চিকিৎসা কর্মীদের ব্যবহার করার মাস্ক, যা বাতাসের ৯৫ শতাংশ ক্ষুদ্র কণা আটকে রাখতে সক্ষম। পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে বিশেষ যেসব মাস্ক তৈরি হয়, আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিটিউট অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ (এনআইওএসএইচ) সেগুলোকে ‘এন’, ‘আর’, ‘পি’- এই তিনটি ভাগে ভাগ করে। ‘এন’ মানে নট অয়েল রেজিস্ট্যান্ট টু অয়েল, ‘আর’ মানে রেজিস্ট্যান্ট টু অয়েল, ‘পি’ মানে অয়েল প্রুফ। সেই হিসেবে এন-৯৫, আর-৯৫ ও পি-৯৫, এন-৯৯, আর-৯৯, পি-৯৯, এন-১০০, আর-১০০ ও পি-১০০ ক্যাটেগরির মাস্ক তৈরি হয়। যেহেতু এন-৯৫ মাস্ক চিকিৎসা কর্মীদের মাঝে বেশি প্রচলিত, তাই করোনার বিস্তারে সাধারণ মানুষও এই মাস্ক কেনা শুরু করলে আমেরিকায় এই মাস্কের সংকট দেখা দেয়। এ অবস্থায় আমেরিকার সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠানটি জোর দিয়ে বলেছে, বাইরে যদি কাজের প্রয়োজনে বের হতেই হয়, তাহলে অবশ্যই কাপড়ের তৈরি মাস্ক পরে বের হলেই ভালো।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ১০৬৫৬ টি ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) বিতরণ করা হয়েছে৷ বর্তমানে জেলায় ২৩৪৪৭ টি পিপিই মজুদ আছে৷ একই সাথে জরুরী ঔষধের সন্তোষজনক মজুদ আছে বলেও জানা গেছে৷ তবে যেহেতু সরকারের কাছ থেকে এন-৯৫ মাস্কের কোন বরাদ্ধ আসেনি তাই আপাতত সার্জিক্যাল মাস্ক ও অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যেতে অনুরোধ জানানো হয়েছে৷ সেই সাথে সরকার দ্রুততম সময়ে এন-৯৫ মাস্ক সহ অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করবে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে৷
এন-৯৫ মাস্ক বনাম সার্জিক্যাল মাস্ক :
সার্জিক্যাল মাস্কগুলোর সাথে এন-৯৫ মাস্কের একটা পার্থক্য আছে। আর তা হলো এটি যারা মুখে দেন, তাদের মুখের সাথে খুব আঁটসাঁট হয়ে লেগে থাকে, যাতে বাতাসের কোনো ক্ষুদ্র কণা শরীরে প্রবেশ করতে না পারে। এছাড়া আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এর তথ্যমতে, এন-৯৫ মাস্কও রোগ জীবাণু পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। আর এই মাস্ক বা অন্য সার্জিক্যাল মাস্ক রিইউজ করা যায় না। আরেকটি জরুরি বিষয় হলো- যেসব রোগী জটিল শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা বা হৃদরোগে ভুগছেন, তাদের জন্য এন-৯৫ মাস্ক ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই মাস্ক ব্যবহার করলে উল্টো ওই রোগীর শ্বাস নিতে আরো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

