নিউজটি শেয়ার করুন

করোনাকালে তরুণদের স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে

নুর মোহাম্মদ রানা: বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে করোনাভাইরাস এক মহাতঙ্কের নাম। এ এক অদৃশ্য আততায়ী। করোনাভাইরাস মহামারিতে বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাথে বাড়ছে এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যাও। সারা বিশ্বে একদিনে আক্রান্ত হয়েছে দেড় লাখের কাছাকাছি মানুষ, এমন নজিরও আছে। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গেছে প্রায় ১ লাখের উপরে। মৃত্যুর তালিকায় এর পরই আছে যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিল।

অনেক দেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ঘাটতি থাকায় এবং কোনো কোনো দেশে হাসপাতালের বাইরে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের হিসাবের মধ্যে না আনায় করোনাভাইরাসে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। প্রতিবছর ম্যালেরিয়ায় বিশ্বে যত মানুষ মারা যায়, করোনাভাইরাসে ৫ মাসে এর সমান প্রাণহানি ঘটল। যা সত্যিই বিস্ময়কর। করোনাভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় গত ১০ জানুয়ারি চীনের উহানে, গত বছর ৩১ ডিসেম্বর উহানে প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। ইউরোপ আমেরিকার মতো দক্ষিণ এশিয়ায় আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়ছে। আর আক্রান্তের দিক দিয়ে ভারতের পরপর বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে। আমাদের দেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দিনদিন সংক্রমণের হার যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, এই রোগ থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও ঘরে অবস্থানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা যেহেতু এখনো আবিষ্কার হয়েনি, তাই এই সংক্রমণ থেকে বাঁচতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত গাইডলাইন অনুসরণ করে চলতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য অধিদফতরের বুলেটিনে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে মাস্ক পরা, কমপক্ষে তিন ফুট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ নানা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে।

দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও গণমাধ্যমে একই বিষয়ে তাগাদা দিচ্ছেন। বলছেন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে না বেরোতে। প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই মুখে মাস্ক ও হাতে গ্লাভস পরার কথা বলছেন তারা। কিন্ত নগরীর রাজপথে ও ঘোরাঘুরির স্পটগুলো দেখলে যে কারও মনে হবে, এসব পরামর্শ তোয়াক্কা করছেন না বেশিরভাগ মানুষই। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে কোনো সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। আরও একটি ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাফেরা করছে না। অনেকেই মাস্ক ব্যবহার করছে না। শরীর ঘেঁষে চলাফেরা করছে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গল্প করছে, আড্ডা দিচ্ছে। যেন দেশে কোনো মহামারিই আসেনি। এর ফলে বিপদ ডেকে আনছে তারা। সামাজিক দূরত্ব বলতে যা বোঝায় তা বেশিরভাগ মানুষই মানছে না। ফলে দেশব্যাপী সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। ইতিমধ্যে চিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে অনেকের মৃত্যুবরণের মতো ঘটনাও ঘটেছে।

এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, দেশটিতে তরুণ প্রজন্মের আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে। সেখানে ফ্লোরিডা , সাউথ ক্যারোলাইনা, জর্জিয়া ও টেক্সাসসহ আরো কিছু অঙ্গরাজ্যে তরুণদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অপেক্ষাকৃত কমবয়সীদের বেশি হারে আক্রান্ত হওয়াকে এখন বিশ্বব্যাপী বিশেষ উদ্বেগের সাথে দেখা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ অর্থাৎ সংক্রমণ কমে আসার পর আবার ঊর্ধ্বগতিতে সংক্রমণ বৃদ্ধির জন্য দায়ী হতে পারেন কিনা সেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশেও অপেক্ষাকৃত কমবয়সীরা করোনাভাইরাসে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। আইইডিসিআরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে করোনায় এ পর্যন্ত শনাক্ত ব্যক্তির ৫০ শতাংশেরই বয়স ২১ থেকে ৪০ বছর। মনে রাখতে হবে, তারুণ্য এক প্রত্যয়, চেতনার উৎস, অনুপ্রেরণার অজেয় শক্তি। যারা নিজ প্রতিভায়, উদ্যমে, কর্মযজ্ঞে বদলে দেয় পৃথিবী তারাই তো চিরনবীন। তাদের নিয়েই তো কবিরা রচনা করেছেন দ্রোহের-বিপ্লবের হাজারো গান-কবিতা, যা মর্মে মর্মে জাগায় জয়ের প্রতিধ্বনি। সেই তরুণ প্রজন্মের কাছে নীতি, নৈতিকতা, আদব, শিষ্ঠাচার ও লাজলজ্জা পরিহারের যে হিড়িক পড়েছে তা ভবিষ্যতে মহামারি আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

যে তরুণ প্রজন্ম পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য সম্পদে পরিণত হওয়ার কথা, সততার সাথে পবিত্র জীবনযাপনের মাধ্যমে নীতি নৈতিকতাকে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করার কথা, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় উন্নতিকল্পে যেখানে তরুণের মেধাকে ব্যবহারের কথা, নতুন নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে নিজকে দেশের জন্য, দেশকে বিশ্বের জন্য অপরিহার্য সম্পদে পরিণত করার কথা, সেখানে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম সম্পূর্ণ তার বিপরীত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) অনেক আগে তরুণদের সতর্ক করেছিলো। ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসাস বলেছিলেন, যদিও বয়সী মানুষদের মৃত্যু বেশি হচ্ছে, তবুও তরুণদের প্রতি আমি বলব, আপনারাও ঝুঁকিমুক্ত নন। এই ভাইরাস আপনাকেও হাসপাতালে পাঠাতে পারে, আপনাকে দুর্বল করে তুলতে পারে, এমনকি মৃত্যু ঘটাতে পারে।