করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে বিমান চলাচল বন্ধের মধ্যে বাংলাদেশে থাকা বিদেশিরা চাইলে ভিসার মেয়াদ তিন মাস বাড়াতে পারবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।
সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “যেসব বিদেশি বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে এবং তারা যদি তাদের থাকার মেয়াদ বাড়াতে চান, তাহলে প্রয়োজন বোধে তাদের ভিসার মেয়াদ তিন মাস বাড়ানো হবে।”
যুক্তরাজ্য ছাড়া ইউরোপ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত আগমন বন্ধ করার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং বিদেশি সংস্থার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। বাংলাদেশ থেকে কেউ চাইলে ইউরোপে যেতে পারবে।”
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় করোনাভাইরাস নিয়ে কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানান বিদেশি কূটনীতিকরা।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশে থাকা বিদেশিদের সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন মোমেন।
একইসঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশি কূটনীতিকদের সহায়তার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ”আমরা আপনাদের মাধ্যমে আপনাদের সরকারের কাছে সহায়তা কামনা করছি, যাতে আমাদের মিশন ও কনস্যুলেটগুলো এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে ঠিকমত তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খলিলুর রহমানও কূটনীতিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
একজন কূটনীতিক জানতে চান, “আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছি, মানুষ কোয়ারেন্টিন ক্যাম্পে থাকছে না। তাহলে আপনি কীভাবে নিশ্চিত হন, তারা সেল্ফ কোয়ারেন্টিনে থাকবে?”
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, “আমাদের জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের বলা হয়েছে, যারা বিদেশ থেকে আসবে তারা বাড়িতে কোয়ারেন্টিনে থাকবে। যদি কেউ সেটা না মানে তাহলে আমরা তাদের প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যদের বলছি, যাতে তারা আমাদের জানায়।
”গতকাল একজন কোয়ারেন্টিন থেকে বের হয়ে গিয়েছিল, সেজন্য আমাদের স্থানীয় প্রশাসন তাকে ধরে জরিমানা করেছে। ভবিষ্যতে আমরা এদেরকে বাধ্য করব। আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল।”
প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার বলেন, “সব আগত যাত্রীকে আমরা একটা ডিক্লারেশন ফর্ম পূরণ করতে দিচ্ছি, তাদের স্থানীয় ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর, বিমানের সিট নম্বর পূরণের জন্য। যাতে আমরা লোকদের খুঁজে পেতে পারি। এ কারণে কেউ যদি পালিয়ে যায়, তাহলে তাকে আমরা ফেরত আনতে পারব।”
এক কূটনীতিক বলেন, “কীভাবে আপনারা নিশ্চিত হলেন স্থানীয়ভাবে এটার সংক্রমণ ঘটেনি। যদি স্থানীয়ভাবে বেশি করে ছড়ায় তাহলে আপনাদের পদক্ষেপ কী হবে?”
এই প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এই পর্যন্ত আমরা ৮ জন পেয়েছি। প্রথম তিনজনের দুজন ইতালি থেকে এসেছে। এরপর দুইজনের একজন ইতালি থেকে এবং অন্যজন জার্মানি থেকে এসেছে। লোকাল ট্রান্সমিশন এখনও হয়নি।
”আমাদের দেশের লোকদের রক্ষা করার জন্য আমরা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করেছি। বিশেষ করে যেসব দেশ অতিমাত্রায় আক্রান্ত, সেসব থেকে আমরা আগমন বন্ধ করেছি। আক্রান্তদের সঙ্গে তারা মিশেছে তাদেরকে আমরা হোম কোয়ারেন্টিনে রাখছি।”
করোনাভাইরাসের আক্রান্ত দেশের ব্যক্তিদের সঙ্গে বিমানে অন্য দেশের লোক এলে তাদেরকেও প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে বলে জানান মোমেন।
এক কূটনীতিক বলেন, “ভিসার জন্য আপনারা কী ধরনের সার্টিফিকেট চাচ্ছেন, এটা কি পিসিআর সার্টিফিকেট নাকি করোনাভাইরাস নেগেটিভ সার্টিফিকেট? এটা সবচেয়ে কঠিন বিষয় যেটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে।”
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “৮৪ দেশের জন্য আমাদের অন অ্যারাইভাল ভিসা চালু্ আছে। আমরা সব অন অ্যারাইভাল ভিসা স্থগিত করেছি। মেডিকেল সার্টিফিকেট ছাড়া আমরা কোনো ভিসা দিচ্ছি না।”
এই প্রশ্নে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম বলেন, “মেডিকেল সার্টিফিকেট হচ্ছে, ওই ব্যক্তির করোনাভাইরাসের কোনো উপসর্গ নেই, ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী। এমন ডিক্লারেশন থাকবে, তিনি আক্রান্ত কারো সঙ্গে মেশেননি, আর মিশলেও ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে ছিলেন।
তখন ওই কূটনীতিক বলেন, “করোনাভাইরাস অনেক সময় উপসর্গ দেখায় না। সে কারণে সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করা মুশকিল। এ কারণে বিমানসংস্থাগুলোকে বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা দরকার।”
বিমানসংস্থাগুলো স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হবে বলে জানান সচিব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে পদক্ষেপ সম্পর্কে প্রশ্ন রেখে এক কূটনীতিক বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করেছে, আলাদা হাসপাতালে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। বাংলাদেশে যেহেতু এই ব্যবস্থা নেই, তাহলে আপনারা এই সুপারিশ কীভাবে বাস্তবায়ন করছেন?”
এর জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খলিল বলেন, “বিমানবন্দরে ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী যদি কাউকে সুস্থ পায়, তাহলে সে যেতে পারে ইমিগ্রেশন থেকে।
“কিন্তু তাকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে, হয় সেটা বাড়িতে কিংবা হোটেলে। যদি উপসর্গ দেখা যায়, তাহলে সে হেলপলাইনে যোগাযোগ করবে, আমরা এরপর চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করব।”
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চান এক কূটনীতিক।
জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা তাদেরকে বিষয়টি নিয়ে সচেতন করার কাজ করছি। বিদেশিরা এসে যাতে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিশে এটা ছড়াতে না পারে, আমরা সেটা চাচ্ছি। এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশেপাশে করোনাভাইরাস নেই।”
ভারতীয় হাই কমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাশ, ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট ডিকসন, চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং, জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পো, জার্মানির রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহল্টজ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনজি টিরিংক, নেপালের রাষ্ট্রদূত ড. বানশিধর মিশ্র, যুক্তরাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্রদূত জোয়ান ওয়াগনার এই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন।








