সিপ্লাস ডেস্ক: আইসিডিডিআর,বি আজ থেকে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসায় আ্যান্টি-প্যারাসাইটিক বা পরজীবীনাশক ওষুধ আইভারমেকটিন-এর সাথে অ্যান্টিবায়েটিক ডক্সিসাইক্লিন, অথবা শুধু আইভারমেকটিন ব্যবহারের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে একটি দৈবচয়ন ভিত্তিক, ডাবল-ব্লাইন্ড প্লাসিবো-নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষামূলক গবেষণা শুরু করেছে।
কোভিড-১৯ চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালে ভর্তি থাকা প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করা হবে। আইভারমেকটিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর অনুমোদনপ্রাপ্ত একটি ওষুধ যা ১৯৮০ সাল থেকে পরজীবীজনিত সংক্রমণ প্রশমনে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
অতীতে দেখা গেছে, গবেষণাগারে অনেক ধরনের ভাইরাসনাশক হিসেবেও এটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এই গবেষণায় কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় নিয়োজিত ঢাকার চারটি হাসপাতালের ৭২ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। গবেষণাটি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাথে শুরু হয়েছে এবং বাকি হাসপাতালগুলোর সাথে আলোচনা চলছে।
কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের হার, এর সাথে সম্পর্কিত অসুস্থতা এবং মৃত্যুর হার নজিরবিহীন। বিশ্বব্যাপী ৮২ লাখের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং গত পাঁচ মাসে প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ৯০,০০০-এরও বেশি মানুষ করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে এবং প্রায় ১,২৫০ জন মৃত্যুবরণ করেছে।
এ রোগে আক্রান্ত হলে সংক্রমণ সাধারণত, হালকা (কাশি, জ্বর) থেকে তীব্র (নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট) শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বয়োবৃদ্ধ এবং যাদের অন্য কোনো গুরুতর অসুস্থতা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এ রোগ মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
গবেষণার লক্ষ্য হলো আইভারমেকটিন-এর সাথে ডক্সিসাইক্লিন অথবা শুধু আইভারমেকটিন-এর সাহায্যে চিকিৎসা প্রদান করলে ভাইরাসের সংক্রমণ কমার হার এবং জ্বর ও কাশি কমতে কয়দিন লাগে সে সম্পর্কে ধারণা লাভ করা। এছাড়াও, এই গবেষণা অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তার পরিবর্তন, অক্সিজেন দেওয়া সত্ত্বেও রোগী কেন ৮৮%-এর বেশি অক্সিজেন স্যাচুরেশন (এসপিও২) ধরে রাখতে পারে না, রোগীকে অক্সিজেন সরবরাহ ও হাসপাতালে ভর্তি থাকার দিনের সংখ্যায় পরিবর্তন, এবং এ রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুর কারণ জানার চেষ্টা করা।
আইসিডিডিআরবি-র আন্ত্রিক এবং শ্বাস প্রশ্বাস রোগের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ড. ওয়াসিফ আলী খান বলেন, “এই ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের কারণে আমাদের প্রয়োজন সার্স-সিওভি-২ এর বিরুদ্ধে কার্যকর একটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ খুঁজে বের করা। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের কাছে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা করার মতো কোনো ওষুধ নেই এবং এ ধরনের ওষুধ আবিষ্কার হতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে। তাই, আমাদের এমন ওষুধ খুঁজে বের করা প্রয়োজন যা বাজারে সহজলভ্য, যার ওপর যথেষ্টভাবে গবেষণা করা হয়েছে, যার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া কম এবং যা জীবন বাঁচাতে সক্ষম।”
আইসিডিডিআরবি-র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক জন ডি ক্লেমেন্স বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লি, এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় আইভারমেকটিন কতটা নিরাপদ ও কার্যকর তা জানার লক্ষ্যে আমাদের এই প্রচেষ্টায় সহায়তা করার জন্য আমি বেক্সিমকো ফার্মাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বাংলাদেশসহ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একটি সাশ্রয়ী মূল্যের ও সহজে ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসা পদ্ধতি খুঁজে বের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান এমপি বলেন, “বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগীদের মধ্যে আইভারমেকটিন-এর প্রথম র্যান্ডমাইজড, সুপরিকল্পিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে সহায়তা করতে পেরে আমরা আনন্দিত। এই গবেষণাসহ অন্যান্য দেশে চলমান গবেষণার ফলাফল ইতিবাচক হলে কোভিড-১৯ মহামারীর জন্য আইভারমেকটিন একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যের ও সহজপ্রাপ্য সমাধান হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে।”
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেল এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সঙ্গে যুক্ত আছেন। কোভিড-১৯ পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত ৪০ থেকে ৬৫ বছর বয়সী আগ্রহী রোগীদের এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যারা মৃদু অসুস্থ এবং সাত দিনের কম সময়ব্যাপী অসুস্থতায় ভুগছেন এমন রোগীদের এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
গবেষণায় ব্যবহৃত ওষুধ দু’টির প্রতি অ্যালার্জি আছে, হৃদরোগ, কিডনি এবং লিভারের সমস্যা আছে, এবং গর্ভবতী বা বুকের দুধ খাওয়ান এমন মহিলাদের এই গবেষণার আওতায় রাখা হবে না। গবেষণার আওতাভুক্ত একটি দলের রোগীরা এক ডোজ আইভারমেকটিন-এর সাথে পাঁচ দিনব্যাপী ডক্সিসাইক্লিন পাবেন, অপর একটি দল পাঁচ দিনব্যাপী প্রতিদিন শুধু একটি করে আইভারমেকটিন পাবেন এবং তৃতীয় দল পাঁচ দিনব্যাপী প্রতিদিন একটি করে প্লাসিবো পাবেন। পরীক্ষার ওষুধ ও প্লাসিবোগুলো একইভাবে প্যাকেজ করা হবে এবং গবেষণাধীন ব্যক্তি ও চিকিৎসকরা কেউ জানবেন না কোন রোগী কোন চিকিৎসা পাচ্ছেন।
সম্প্রতি নতুন করোনাভাইরাসের সম্ভাবনাময় চিকিৎসায় আইভারমেকটিন-এর ব্যবহার মানুষের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় এটি কেমন কার্যকর তা দেখার জন্য অনেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।
আইভারমেকটিন একটি অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যের এবং বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত ওষুধ, তবে খুব অল্প-সংখ্যক মানুষের মধ্যে এটি ব্যবহারে কিছু পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যেমন ত্বকে ফুসকুড়ি উঠা, বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, মুখ বা কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফোলা, মাথা ঘোরা, খিঁচুনি, বিভ্রান্তি, রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া ইত্যাদি। এজন্য রোগীদের শারীরিক, ক্লিনিক্যাল এবং গবেষণাগারে পরীক্ষার মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।








