পাহাড়ী ভট্টাচার্য: করোনা-বহ সময়ে, ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্ব লক-ডাউন ও স্বেচ্ছা গৃহ-বন্দিত্বের এ কালে জনগনের বিপুল অংশ বিশেষত কর্মজীবি মানুষদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সহায়তা, প্রনোদনা এবং সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় কর্মসূচি ও উদ্যোগ অব্যহত রেখেছে।
স্মর্তব্য, সব সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে আগে থেকেই কল্যানকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ-তৎপরতার ধারা বজায় ছিল। গণতান্ত্রিক ও কল্যানকর রাষ্ট্রে বা সমাজ-ব্যবস্হায় জনগন দুর্যোগে প্রয়োজনীয় আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা, অর্থসহ কাঙ্খিত সেবা-সহায়তা পেয়ে থাকে। পশ্চিমা বিশ্বে জনগনের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্হাকে সমুন্নত রাখার প্রয়াস,শক্তিশালী রাজনৈতিক দল, সক্রিয় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার প্লাটফর্মসমূহ হল এর নেপথ্য কার্যকারণ, আমাদের দেশে যা কাঙ্খিত মাত্রায় অনুপস্হিত।
আশঙ্কা, দীর্ঘায়িত করোনা-কাল বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্য সংকট, চাকুরীচ্যুতি, বেকারত্ব, অর্থাভাব ও নানা নেতিবাচক বাস্তবতার মুখোমুখি এনে দাড় করাবে বিশ্ববাসীকে। বেড়ে যাবে প্রযুক্তি-নির্ভরতা বা অটোমেশন, শারিরীক দুরত্ব বজায় রেখে কাজ ও জীবনযাপন! ফলে, স্বভাবতই শ্রম-প্রক্রিয়ায় অভাবনীয় সব পরিবর্তন ঘটতে দেখব আমরা, ক্রমশ বিশ্বজুড়ে।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এখন কর্মজীবি প্রায় সাড়ে ৬ কোটি। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমজীবি মানুষ মূলত দৈনিক, সাপ্তাহিক,পাক্ষিক ও মৌখিক চুক্তি-ভিত্তিক শ্রম/সেবার বিপরীতে অর্জিত আয়-নির্ভর। এসব মানুষদের কাজের সুযোগ ও আয়ের ওপরই বেঁচে আছে তাদের পরিবার। রাষ্ট্র বিপুল সংখ্যক কর্মজীবি মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে পারেনি, অদ্যাবধি।
কৃষি-খাতের বাইরে দেশে শিল্প-কল-কারখানায় এবং অ-প্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরসমূহে কর্মরত বিপুল শ্রমজীবি মানুষ প্রতিনিয়ত নানাবিধ আশঙ্কা ও ঝুঁকিতে বসবাস করছে। অপর্যাপ্ত ও জীবন ধারনের অনুপযুক্ত মজুরি, একদিকে কর্মহীনতার ভয়, অন্যদিকে গার্মেন্টস, নির্মাণ, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, হেলথ-ডায়াগনিস্টিক, গণ-পরিবহন, নৌ-যান জাহাজ-ভাঙ্গা, ট্যানারি, রি-রোলিং, এ্যলুমিনিয়াম, মোটর ওয়ার্কশপ, মেটাল-রিসাইক্লিং, চাতাল, ক্ষুদ্র-পুঁজির পণ্য বিক্রেতা, হকার, প্রিন্টিং প্রেস, বুক-বাইন্ডিংসহ সিংহভাগ শিল্পখাতে প্রায় অতিরিক্ত কর্মঘন্টা, বাড়তি কাজের চাপ, মালিক-নিয়োগকর্তা বা মধ্যস্বত্বভোগিদের অমানবিক ও অন্যায় আচরন, বিবিধ বৈষম্য, শারিরীক এবং মানসিক নিগ্রহ, পেশাগত স্বাস্হ্য ও নিরাপত্তাহীনতা, দুর্ঘটনা ঝুঁকি-এসবই মূলত আজ অসহায় সব শ্রমজীবি মানুষের নিত্য জীবনচিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অমোঘ নিয়তি।
দেশের প্রচলিত সংবিধান, শ্রম আইন ও বিধি, জাতীয়-আন্তর্জাতিক কনভেনশন, ঘোষনা, উচ্চ আদালত প্রদত্ত বিবিধ নির্দেশনা ও বিদ্যমান নীতিমালাসমুহকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিয়োগপত্র-পরিচয়পত্র-সার্ভিস-বুক-রেকর্ডস ও তথ্য-উপাত্তহীনভাবে শ্রমিককে মৌখিকভাবে নিয়োগদান ও যে কোন সময় চাকুরীচ্যুত করছে আমাদের প্রতিষ্ঠান মালিক-কন্ট্রাকটর-নিয়োগকর্তারা। করোনা-বহ, মানবিক চরম বিপর্যয়ের এ কালেও তা অব্যহত অাছে।
বিশ্বব্যাপি করোনা-প্রাদুর্ভাবের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবে শ্রমজীবি মানুষের জীবন ক্রমশ সংকটময় হয়ে উঠছে। এক নিশ্চিতপ্রায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পদধ্বনিতে আজ কর্মহীনতা, বেকারত্ব, আর্থ-সামাজিক সংকটের মুখে দাড়িয়ে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য। বাংলাদেশের শ্রমজীবি জনগনও তার বাইরে নয়। উল্লেখিত পেশাসমূহ ছাড়াও হকার, মুচি, রিক্সাওয়ালা, ধোপা, নাপিত, পরিবহনে যুক্ত শ্রমিক, গৃহকর্মী, দিনমজুরদের এ করোনাকালের প্রভাব বইতে হচ্ছে সু-তীব্রভাবে।
গত একমাসের স্বেচ্ছা-বন্দিত্বে, সরকার-ঘোষিত সাধারণ ছুটির মেয়াদ ধাপে ধাপে বৃদ্ধিতে শ্রম-নির্ভর নিন্ম আয়ের প্রান্তিক মানুষ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি, মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। আয়হীনতায় ও কাজের অনিশ্চয়তায় সকলে দিশেহারা। দেশের ৮০ শতাংশ তৈরী পোষাক কারখানায় লে-অফ ঘোষনা, শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়ে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল শ্রমিকদের মজুরী বকেয়া বিগত ১ বছর-কাল। করোনার কারণে দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিকেরা কাজ নিতে পারছে না। হোটেল-রেষ্টুরেন্ট,দোকান-প্রতিষ্ঠান কর্মচারি বেকার। পরিবহন শ্রমিকেরাও বসে আছে অনিশ্চয়তায়। সে সাথে যুক্ত হচ্ছে অভিবাসী শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা ও দেশে ফেরার শ্রোতও। অসহায় কর্মজীবি মানুষ বিশেষত
শ্রমিকেরা বাড়ি মালিক, মুদি দোকানদার সহ স্ব স্ব কর্ম-এলাকার সামর্থ্যবান ও পরিচিতজনদের দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর এবং অনেকটা সরকারী অথবা ব্যক্তিগত ত্রাণ বা সহায়তার ওপর ভরসা করে দিনাতিপাত করছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ বেশ কিছু স্হানে গার্মেন্টস শ্রমিকেরা বকেয়া মজুরীর দাবীতে অঘোষিত লক-ডাউনকে উপেক্ষা করে মহাসড়ক অবরোধ করেছে, লুঠ হয়েছে ত্রাণবাহি ট্রাক। করোনাকালে ভয়াবহ পারিবারিক সহিংসতার নানা চিত্র উঠে আসছে গণমাধ্যমে। এসবের সিংহভাগের নেপথ্য- কার্যকারণ মূলত-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
করেনাকালে শ্রমজীবি মানুষের জীবন ও তার পেশার নিশ্চয়তা রক্ষাটি আজ এক বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতে তা যতটা সম্ভব, অ-প্রাতিষ্ঠানিক বহু খাতে তা মোটেও নয়। ভাসমান শ্রমজীবি মানুষের কোন তালিকা নেই। তাদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সহায়তা দান করা না গেলে প্রবল সামাজিক সংকট তৈরী হবার মত ঘটনা ঘটবে। দেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো শ্রম দপ্তরের সাথে এ তালিকা তৈরীতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
অবৈধ লে-অফ ও শ্রমিকের চাকুরিচ্যুতি ঠেকানো, কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দপ্তরের এসকল বিষয়ে ত্বরিৎ পদক্ষেপ, অন্যায়-সিদ্ধান্ত গ্রহনে ও আচরণে লিপ্ত প্রতিষ্ঠান মালিক-পক্ষের বিরূদ্ধে সরকারের দৃঢ়, জিরো টলারেন্স, শ্রমিক কল্যান তহবিলের অর্থ শ্রমিকের এহেন দুর্দশায় কাজে লাগানো, প্রাতিষ্ঠানিক ৫ শতাংশ লভ্যাংশ যার অংশীদার শ্রম আইন মোতাবেক ঐ প্রতিষ্ঠান শ্রমিক তার সর্বোত্তম ব্যবহারটি নিশ্চিতকরণও আজ অাবশ্যক। দেশের বড় বড় ধনী প্রতিষ্ঠান মালিকদের সিএসআর- তথা সামাজিক দায়বদ্ধতামুলক কর্মকান্ডের আওতায় কর্মজীবি মানুষের পাশে সর্বোত সহায়তার হাত বাড়াতে উদ্ধুদ্ধকরণও রাষ্ট্রের নির্দেশনা প্রদান আজ অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি, বিদেশের মাটিতে পাচারকৃত অবৈধ হাজার হাজার কৌটি টাকা দ্রূততম সময়ে স্বদেশে ফেরত এনে করোনা-মোকাবেলায় ও শ্রমজীবি মানুষকে বাঁচানোর কাজে লাগানোর বিষয়টিও সম্ভব হলে ভাবা দরকার। সরকারের আর্থিক প্রনোদনার আওতায় গণমাধ্যমকর্মী, গৃহ-শিক্ষকসহ ক্রমান্বয়ে অন্য সকলকে পর্যায়ক্রমিক অন্তর্ভুক্তিও সমভাবে জরুরী।
কর্মজীবি মানুষই একটি রাষ্ট্রব্যবস্হা, উন্নয়ন, অর্থনীতি-প্রগতির চালিকাশক্তি; তার সুরক্ষিত রাখার কাজটিও অনিবার্যভাবেই রাষ্ট্রের।








