সিপ্লাস প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানায় উম্মোচিত হয়েছে ডাকাতি মামলার রহস্য। গ্রেফতার হয়েছে ৬ ডাকাত। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ঘটনায় ব্যবহৃত ২টি মোটরসাইকেল, অস্ত্র, গুলি ও টাকা উদ্ধার।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে চক্রটির সন্ধানে বিশেষ একটি অভিযান পরিচালনা করে কর্ণফুলী ও ওয়াসা মোড় থেকে ৬ ডাকাতকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতার ৬ ডাকাত হলেন, কুমিল্লার মো. কামাল হোসেন (৩০), পাঁচলাইশের মোক্তার হোসেন (২২),চাঁন্দগাওয়ের সাদ্দাম (২৬), ফটিকছড়ির শের আলী (৩২), আনোয়ারার মাসুদুর রহমান (৪০) ও সীতাকুণ্ডের মো. এরশাদ (৩৩)।
শনিবার (২৭ জুন) নগরীর মোমিন রোডের সিএমপির দক্ষিণ জোনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ৬ ডাকাতকে গ্রেফতার ও ঘটনার বিস্তারিতজানান দক্ষিণের ডিসি মেহেদী হাসান।
সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, আসামীরা মুলত ছদ্মবেশী ডাকাত দলের সদস্য। তারা বিভিন্ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের সামনে ছদ্মবেশে ঘোরাঘুরি করে ব্যাংক থেকে আসা বিভিন্ন ব্যাক্তিকে টার্গেট করে তাদের পিছু নেয়। এই কাজে তাদের নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি বেদীর(সোর্স) ভূমিকায় থাকে।
বেদীর কাজ হলো কোন ব্যাক্তি টাকা নিয়ে ব্যাংক থেকে বের হয়ে যাচ্ছে তাকে অনুসরন করা। অন্যরা বেদীকে অনুসরন করে ঘটনাস্থলের আশেপাশে অবস্থান করে। বেদীর কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে বেদী ঘটনাস্থল থেকে সরে গিয়ে অন্যদের তথ্য সরবরাহ করে। অন্যরা তখন তাদের সাথে থাকা সিএনজি কিংবা মোটরসাইকেল যোগে ঐ সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির পিছু নেয়। পিছু নিতে নিতে টাকাওয়ালা ব্যক্তিটি যখন পায়ে হেটে কিংবা কোনো বাহন যোগে কোনো নির্জন জায়গায় চলে আসে, তখন আসামীরা সকলেই তাকে ঠেক দিয়ে তাকে অস্ত্র ছোরার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে সব কিছু লুন্ঠন করে দ্রুত গতিতে ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়ে। এই কাজে বেদীকে খুব পারদর্শি হতে হয়। মুলত বেদীই নির্ধারন করে দেয় কার কাছে টাকা আছে। তারা মুলত ব্যাংকিং সময়ে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সামনে এলোমেলোভাবে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। ঘটনাস্থলের আশেপাশে আগে থেকেই তাদের যানবাহন ঠিক করা থাকে। এই কাজে তারা কখনো কখনো নিজেদের সাথে অস্ত্র বিশেষ করে দেশীয় তৈরী এলজি কিংবা অত্যাধুনিক টিপ ছোরা বহন করে।
অপরাধী চক্র দীর্ঘদিন ধরে নগরীতে ডাকাতি ছিনতাইসহ নানা অপরাধকর্ম করে আসছে। তারা মুলত ইশারা ইঙ্গিতে এক অপরের সাথে যোগাযোগ করে। ঘটনা ঘটানোর পর অপরাধী চক্র কিছুদিনের জন্য নিরব হয়ে নিজ নিজ বাসা বাড়ী হতে দূরে অবস্থান করে। লুন্ঠিত টাকা পয়সা শেষ হয়ে গেলে তারা পুনরায় একত্রিত হয়ে নতুন করে পরিকল্পনা করে। এই প্রক্রিয়ায় আসামীরা দীর্ঘদিন ধরে নগরীতে ডাকাতি করে আসছে।
গত ১৬ জুন দুপুরে কোতোয়ালী থানাধীন জমিয়াতুল ফালাহ পশ্চিম গেইট থেকে মোঃ ফারুক আহাম্মদ নামীয় একজন ব্যক্তির নিকট থেকে উল্লেখিত আসামীগন জোর পূর্বক পাঁচ লক্ষ টাকা ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয় মর্মে বাদী অত্র কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করে। বাদীর তথ্যের বিশ্লেষনে জানা যায় আসামীরা দুইটি মোটরসাইকেল যোগে মোট ছয় জন বাদীর সিএনজিকে ঠেক দিয়া বাদীর নিকট থেকে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়।
মামলা রুজুর পর তদন্তে নেমে টিম কোতোয়ালী বাদীর অফিস, টাকা উত্তোলনের স্থান তথা এক্সিম ব্যাংক সিডিএ এভিনিউ শাখার আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায় বাদীর অফিসের আশেপাশে তিনজন অজ্ঞাতনামা ব্যাক্তি ও ব্যাংকের আশেপাশে দুইজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ১১টা হইতে বাদীর ব্যাংকের প্রস্থান সময় পর্যন্ত এলোমেলোভাবে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। পরবর্তিতে বাদী তার অফিস থেকে সিএনজি যোগে গন্তব্যস্থলে যাওয়ার পথে উপরোক্ত ব্যক্তিগন আরো এক ব্যক্তিসহ দুইটি মোটরসাইকেল সহযোগে বাদীকে অনুসরন করতে থাকে এবং সর্বশেষ উক্ত মোটরসাইকেল দুইটি ওয়াসা মোড়ে জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের গেটে বাদীর সিএনজিকে ঠেক দিয়ে বাদীর কাছ টাকা ছিনিয়ে নেয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আসামীদের সংগৃহিত ভিডিও ফুটেজ ও তথ্যের উপর ভিত্তি করে উপরোক্ত ডাকাত দলের এক সদস্য মাসুদ কে গত ২৬ জুন বিকেল সাড়ে ৩টায় কর্নফুলি থানা এলাকা থেকে আটক পরবর্তি ভিডিও ফুটেজে সে নিজেকে শনাক্ত পূর্বক জানায় যে সে গত ১৬ জুন তারিখের ডাকাতির ঘটনার সাথে জড়িত এবং উক্ত ঘটনায় ব্যবহৃত দুইটি মোটরসাইকেল তার কর্তৃক সরবরাহকৃত। উক্ত স্থান হইতে ঘটনায় ব্যবহৃত পালসার মোটরসাইকল জব্দ করা হয়।

আসামীরা জানায়, তার দলের অন্যান্য সদস্যরা ডাকাতির উদ্দেশ্যে পুনরায় নগরীর ওয়াসা মোড়ের আশেপাশে অবস্থান করছে। তার দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে ওয়াসা মোড় এলাকা থেকে ২৬ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে- কামাল, মোক্তার, সাদ্দাম, এরশাদদের একটি দেশীয় তৈরী এলজি, ০২ রাউন্ড কার্তুজ ও ০৩ টি ছোরাসহ আটক করা হলেও ঘটনাস্থল থেকে অপর দুই আসামী শের আলী ও সাহাবুদ্দিন পালিয়ে যায়। উপরোক্ত ধৃত ৪ জন আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা সকলেই পূর্বের ডাকাতির ঘটনায় জড়িত মর্মে স্বীকার করে। আসামীদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আনোয়ারা বৈরাক এলাকা হইতে ঘটনায় ব্যবহৃত অপর একটি এ্যাভেঞ্জার মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। উক্ত মোটরসাইকেল টি আসামী মাসুদ তার এক বন্ধুর নিকট থেকে ধার নেয় মর্মে স্বীকার করে। ধৃত আসামীদের তথ্যের উপর ভিত্তি করে কৌশলে ফটিকছড়ি থানা এলাকা থেকে ডাকাতি মামলার পলাতক আসামী তথা বেদী শের আলী কে গ্রেফতার করা হয়। আসামীরা যেহেতু ডাকাতি মামলার টাকা ভাগাভাগি করে পরবর্তিতে ২৭ জুন রাতে আসামী এরশাদের বাসায় অভিযান পরিচালনা করে ডাকাতির ৩৫ হাজার টাকা ও আসামী কামালের বাসায় অভিযান পরিচালনা করে ডাকাতির ১৫ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।
সকল আসামীরা ডাকাতির কথা স্বীকারসহ ঘটনার সময়ে ব্যাংকের আশেপাশে অবস্থানের কথা ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে নিশ্চিত করে। ঘটনার সময়ে আসামীরা যে পোশাকে ছিল তার কিছু অংশ অভিযানে উদ্ধার করা হয়।
অভিযান পরিচালানায় ছিলেন সহকারী পুলিশ কমিশনার নোবেল চাকমা, কোতোয়ালী থানার পুলিশ পরির্দশক কামরুজ্জামান, এসআই সজল কান্তি দাশ, এস আই সুকান্ত বিশ্বাস, এসআই এইচ এম এরশাদ উল্ল্যাহ, এসআই কে এম তারিকুজ্জামান, এএসআই অনুপ কুমার বিশ্বাস, এএসআই রুহুল আমিন, এএসআই সাইফুল আলম।
উদ্ধারকৃত আলামতের মধ্যে রয়েচে ১টি দেশীয় তৈরী এলজি, ২ রাউন্ড কার্তুজ, ৩টি টিপ ছোরা, দুটি মোটরসাইকেল, নগদ ৫০ হাজার টাকা।








