সিপ্লাস ডেস্ক: চালু হওয়ার তিনদিনের মধ্যেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে পার্সেল এক্সপ্রেস সার্ভিস।
তিনটি ট্রেনের মধ্যে একটি ঢাকা-খুলনা রুটে চালানোর সিদ্ধান্ত থাকলেও শুক্রবার (০১ মে) চালুর প্রথমদিন থেকে রোববার (৩ মে) পর্যন্ত ট্রেনটি একবারও যাত্রা করতে পারেনি।
ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার আগেই বন্ধ ঘোষণা করা হলো খুলনা রুটের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ পণ্যবাহী ট্রেন।
তিনদিন চললেও সোমবার (৪ মে ) থেকে ঢাকা চট্টগ্রাম রুটের পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেন আর চলবে না বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। মাত্র তিনদিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল সদ্য চালু হওয়া পণ্যবাহী ট্রেনের এই বিশেষ সার্ভিস।
কারোনার এই সময় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১ মে থেকে চালু করা হয় পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেন। এই ট্রেনের মাধ্যমে প্রান্তিক চাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্য কোনো মধ্যসত্ত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি ঢাকায় বিক্রি করতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন কৃষকরা নায্য দাম পাবেন অন্যদিকে খাদ্য সংকটও কাটবে এমন উদ্দেশ্য থেকে চালু হলেও তিনদিনের মাথায় বন্ধ হয়ে গেল পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেন সার্ভিস।
খুলনা থেকে একদিনও চালানো সম্ভব হয়নি কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ এই ট্রেন সার্ভিস।
খুলনা স্টেশনের ম্যানেজার বুলবুল জানান, কৃষক, খামারি কিংবা প্রান্তিক চাষিদের উৎপাদিত শাকসবজি, ফলমূল ধান চাল পরিবহনের জন্য পার্সেল এক্সপ্রেস চালু করা হলেও খুলনা স্টেশনে এক কেজি বেগুন নিয়েও কোনো কৃষক আসেনি। ফলে তিনদিন অপেক্ষা করা হয়, কিন্তু এই সময়ের মধ্যে পণ্যপরিবহনে চাষি তো দূরের কথা অন্য কোনো ব্যবসায়িক পণ্য নিয়েও স্টেশনে আসেনি ট্রেন। ফলে ৩ মে খুলনা ঢাকা রুটের বিশেষ পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেন সার্ভিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
তিনি জানান, স্থানীয় খামারি কৃষক কিংবা ব্যবসায়ীরা জানেনই না এই ট্রেন সম্পর্কে। ফলে কেউ আসেনি পণ্য নিয়ে। হুট করে এমন সিদ্ধান্ত না নিয়ে আরও স্থানীয় পণ্য উৎপাদনকারীদের সঙ্গে পূর্বেই আলোচনা করার দরকার ছিল।
তিনি বলেন, চালু হওয়ার আগে এই সার্ভিস সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা হয়নি। ছিল না কোনো প্রচার প্রচারণা। ফলে মানুষ আগ্রহী হয়নি খাদ্যপণ্য কিংবা ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহনে। তাই বাধ্য হয়েই বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এই পার্সেল ট্রেনের বিশেষ সার্ভিস।
চট্টগ্রাম স্টেশন ম্যানেজার রতন কুমার চৌধুরী জানান, প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছিল নতুন চালু হওয়া পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেনে। তাই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
করোনার এই সময় খাদ্য সংকট দূর করতে বা কৃষকের নায্য মূল্য নিশ্চিতে এই ট্রেন চালু হলেও কৃষকের সাড়া না থাকায় তিনদিনের মাথায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম ৩৪৬ কিলোমিটার রেলপথ। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পৌঁছাতে তেল খরচ হয় প্রায় ৬০০ লিটার। এভাবে আপ-ডাউনে তেল পুড়ে প্রায় ১২০০ লিটার। রেলের ইঞ্জিনে ব্যবহৃত তেল সাধারণ ডিজেল নয় ইঞ্জিন কার্যকর রাখতে এখানে ব্যবহার করা হয় হাই পারফরমেন্স (এইচপি) ডিজেল। এই ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটার ৭০/৭২ টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের তেল খরচ বাবদ গুণতে হয় ৮৪/৮৬ হাজার টাকা।
আর একটি পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে ট্রেন পরিচালক ২ জন, রানিং পার্সেল ক্লার্ক ১ জন, লোকমাস্টার ও সহ-লোকমাস্টার ২ জন ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ৭/৮ জন সদস্য থাকে। এতে মোট স্টাফ থাকে অন্তত ১৩/১৪ জন। রেলের নিয়িম অনুযায়ী, রেল কর্মাচারীদের মাইলেজ ও আর এনবির সদস্যদের টিএ প্রদান করা হয়। এই ১৩/১৪ জন কর্মচারীকে যাওয়া আসা বাবদ দিতে হয় ১৮/২০ থেকে হাজার টাকা। তেল খরচ ও রেলওয়ে কর্মচারীদের মাইলেজ প্রদান করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেনে আপ ডাউনে খরচ হয় ১ লাখেরও বেশি। কিন্তু এই ট্রেন থেকে প্রতিদিন আয় হয়েছে মাত্র ১০/১২ হাজার টাকা।
রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেনে আপ ডাউনে লোকসান হচ্ছে ৮০/৯০ হাজার টাকা। তাই এটা বন্ধ করা হয়েছে। এই লাগেজ ট্রেনে বগি থাকে ১৯/১২টি আর প্রতি বগিতে ২৩০/২৪০ টন পণ্য পরিবহন করা সম্ভব। কিন্তু সেই পরিমাণ পণ্যের সিকি ভাগও পাওয়া যায়নি এই ক’দিনে। আর উদ্দেশ্য ছিল কৃষিপণ্য পরিবহনের। কিন্তু তিনদিনে চট্টগ্রাম থেকে একদিনেও সামান্য পরিমাণও তা পাওয়া যায়নি। এমতাবস্থায় ট্রেনটি বন্ধ না করে উপায় ছিল না।
তিনটি পার্সেল এক্সপ্রেস ট্রেনের আরেকটি ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ রুটে চলাচলের কথা থাকলেও তিনদিন চলার পর কৃষকদের কোনো সাড়া না পাওয়ায় তার রুট পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেওয়ানগঞ্জ স্টেশন ম্যানেজার শাহ মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা প্রায় ২০০ কি.মি রেলপথ। তেল খরচ ও স্টাফদের মাইলেজ ও অন্যান্য খরচসহ দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা আপ ডাউনে খরচ হয় ৭০/৮০ হাজার টাকা। যার বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৫/৬ হাজার টাকা করে।
কৃষিপণ্য একদিনও পরিবহন করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়িক মালপত্র পরিবহন একেবারেই নেই করোনার কারণে। ফলে লোকসানে পড়তে হচ্ছে নতুন এই ট্রেন সার্ভিসকে। স্থানীয় কৃষি পণ্য সড়ক পথে ট্রাকে করেই পরিবহন করছেন চাষিরা।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ব্যবস্থাপক নাসির উদ্দীন আহমেদ জানান, মালামালের অভাবেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ওই দুটি ট্রেন। এমনিতেই যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ থাকায় রেলওয়ের লোকসান হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পণ্যবাহী লাগেজ ট্রেন চালু করা হলেও তা সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর হয়ে পড়েছে, এমতাবস্থায় তা বন্ধ না করলে করোনাকালে রেলের লোকসানের পাল্লা আরও ভারীই হত।
তিনি বলেন, ধারণা করা হয়েছিল জামালপুর ময়মনসিংহ অঞ্চলের চাষি, খামারি ও ব্যবসায়িরা হয়তো রেলে পণ্য পরিবহনে আগ্রহী হবেন। কিন্তু তিনদিনে তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে রুট পরিবর্তন করে ঢাকা-ভৈরব বাজার- কিশোরগঞ্জ হয়ে ময়মনসিংহ পর্যন্ত চলাচল করবে ৪ তারিখ থেকে।
অবশ্য এটা পরীক্ষামূলক রুট বলে জানিয়ে নাসির উদ্দীন বলেন, পরিবর্তিত রুটেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পেলে এটাও বন্ধ করে দেয়া হবে।








