নিউজটি শেয়ার করুন

গুড়া মিয়া নাজির: আলোকিত এক কর্মবীর

মনোজ কুমার দেব: ১৯২২ সালের ১ জানুয়ারি। আলোকিত এক  কর্মবীর মানুষ জন্ম নিলেন রাউজানের পূর্বগুজরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে।

তাঁর বাবা মরহুম আজগর আলীর তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ।

শিক্ষা জীবন শেষে তিনি চট্টগ্রাম জেলার ডিসি অফিসে ‘নাজির’ পদে অধিষ্ঠিত হন।

তৎকালীন সমাজের প্রেক্ষাপটে এ ধরণের সরকারি পদে চাকরি পাওয়া ছিল খুবই দুর্লভ।

কর্মজীবনে তিনি ছিলেন অসম্ভব ন্যায়নিষ্ঠ এবং সময়পরায়ণ। নিজের জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেছিলেন, ‘৩৬ বছরের কর্মজীবনে আমি ৩৬ দিনও ছুটি কাটাইনি।’

মোছাম্মৎ আনজুমান নিহারা বেগমের সাথে পরিণয় সূত্রে তিনি আবদ্ধ হন। ৪ পুত্র ও ৩ কন্যা তাঁর। প্রত্যেকেই প্রবাসী। সব সন্তানকেই তিনি সুশিক্ষিত করে সমাজে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান মোঃ মনসুর উদ্দিন বর্তমানে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে ট্রাফিক পুলিশ বিভাগে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত। তাঁর ছোট কন্যা দিলুয়ারা মোস্তফা আমেরিকার মেট্রোরেলের উচ্চ পদে আসীন। ছোট দু’সন্তান মোঃ মনির উদ্দিন ও মোঃ মনজুর উদ্দিন মধ্যপ্রাচ্যে স্বনামধন্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার যেখানে কর্মরত আছেন ২৫ জন বাংলাদেশী।

আলহাজ্ব গুড়া মিয়া নাজিরের তৃতীয় প্রজন্মও একইসাথে চিকিৎসা, প্রকৌশল ও আইটি খাতে অবদান রেখে চলেছেন।

মাটি ও মানুষের ঋণ শোধে তিনি আজীবন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অকাতরে দান করে গেছেন।

১৯৪৮ সালে তিনি জন্মস্থানে নিজ জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব গুজরা মোহাম্মদীয়া সিনিয়র মাদ্রাসা ও হেফজখানা যা এলাকার দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখনো সুনামের সাথে কাজ করছে।

গৌরিশংকর হাটে তহশীল অফিস স্থাপন তাঁর অনন্য অবদান।

ঊনসত্তরপাড়া হাই স্কুল, গশ্চি হাই স্কুল, আধারমানিক হাই স্কুল ও মহামুনি এংলোপালি উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি আর্থিক অনুদান প্রদান করেন।

তাঁর সক্রিয় সহায়তায় আধারমানিক প্রাইমারি স্কুল ও পূর্ব গুজরা পোষ্ট অফিসের কার্যক্রম শুরু হয়।

নব্বইয়ের দশকে তাঁর প্রচেষ্টায় গ্রামীণ ব্যাংক তাদের শাখা প্রতিষ্ঠিত করে ঊনসত্তরপাড়া গ্রামে।

ধর্মপরায়ণ ও নিষ্ঠাবান এ মনীষী আমৃত্যু দক্ষিণ রাউজান গাউছিয়া কমিটির সভাপতি হিসেবে কাজ করে গেছেন।

গৌরিশংকর হাটস্থ মসজিদটি জীবদ্দশায় তিনি নির্মাণ করেন।

এ এলাকার ঈদগাহ ময়দানের ভূমিদাতা তিনি।

তাঁরই প্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঊনসত্তরপাড়া জনকল্যাণ সমিতি।

হাফেজ বজলুর রহমান সড়ক সংলগ্ন একটি রাস্তা নির্মাণের জন্য অধিকাংশ জমি দান করেন তিনি।

স্বীকৃতিস্বরূপ রাউজানের গণমানুষের নেতা জাতীয় সংসদের রেলপথ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি মহোদয় এলজিইডির অনুমোদনক্রমে এ সড়কের নামকরণ করেন আলহাজ্ব গুড়া মিয়া নাজির সড়ক।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি অবদান রেখেছিলেন। তাঁর ঘরে থেকেই ভাতষ্পুত্র মোঃ আব্বাস উদ্দীন (বর্তমান ১০নং পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান) সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ফলে পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের রোষানলে পড়েন আলহাজ্ব গুড়া মিয়া ।

১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর ঊনসত্তরপাড়াস্থ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁরই হাতে নির্মিত মসজিদের পাশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

বর্ণিল কর্মজীবনের জন্য কীর্তিমান এ মানুষটির নাম ছড়িয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। ২১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি জানাচ্ছি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, ডা: ফজলুল- হাজেরা ডিগ্রি কলেজ।