নিউজটি শেয়ার করুন

চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় টানা অভিযানের দাবি জানিয়েছে পিপলস ভয়েস

সিপ্লাস ডেস্ক: বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে যখন বিশ্বব্যাপী প্রকৃতি সুরক্ষার দাবি উঠেছে তখন চট্টগ্রামে লকডাউনের সুযোগে পাহাড় কাটা অব্যাহত আছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগের এবং প্রকৃতি বিনাশকারী কর্মকাণ্ড। এমন পরিস্থিতিতে ১১ জুনকে পাহাড় রক্ষা দিবস ঘোষণার পাশাপাশি অবিলম্বে চট্টগ্রামের অবশিষ্ট পাহাড় রক্ষায় টানা অভিযানের দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘পিপলস ভয়েস’।

২০০৭ সালের ১১ জুন পাহাড় ধ্বসে চট্টগ্রামে ১২৭ জন নিহত হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর এই দিনটিকে ‘পাহাড় রক্ষা দিবস’ ঘোষণার দাবিতে কর্মসূচি পালন করে আসছে পিপলস ভয়েস। এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাবের কারণে জনসমাগম হয় এমন কোনো কর্মসূচি আয়োজন করা হয়নি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিবেচনায়।

পিপলস ভয়েস লক্ষ্য করছে, এই দুর্দিনেও চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা থেমে নেই। শুধু য়ে নির্বিচারে পাহাড় কাটা চলছে তাই নয় দিনেদুপুরে নগরীর প্রাণকেন্দ্রেও অবাধে চলছে পাহাড় কাটার কাজ।

উল্লেখ্য, মে মাসে নগরীর এস এস খালেদ রোডে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ২৮ হাজার ঘনফুট পাহাড় কাটা হয়। চলতি মাসেই বায়েজিদ আরেফিন নগর এলাকায় ৩২ হাজার ঘনফুট পাহাড় কাটা হয়: যেখানে পাহাড় কেটে সুড়ঙ্গ পথ, ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া খুলশী এলাকায় ১৮ হাজার ঘনফুট পাহাড়ের মাটি কেটে সেমিপাকা ভবন নির্মাণ করে এক ব্যক্তি। এসব ঘটনায় জরিমানা সংশ্লিষ্টদের আর্থিক জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এরআগে নগরীতে বায়েজিদ লিংক রোড নির্মাণে সরকারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) পাহাড় কাটে বলে প্রমাণ পায় পরিবেশ অধিদপ্তর। তাদেরও বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়। কিন্তু পাহাড় কাটার ঘটনায় কেটে ফেলা পাহাড়গুলো আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। শুধু জরিমানা করে দায়িত্ব শেষ করার প্রবণতা আরো পাহাড় কাটাকে ত্বরান্বিত করে।

এবার এমন এক পরিস্থিতিতে ১১ জুন হাজির হয়েছে যখন বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে সারা পৃথিবীতে পরিবেশ সুরক্ষায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। পাহাড়-নদীসহ প্রকৃতি ও প্রাণ সংরক্ষণের বিষয়ে বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও চট্টগ্রামে নির্বিচারে পাহাড় কাটা চলছেই। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে পাহাড়ে অবৈধ বসতি স্থাপন। অতীতে বিভিন্ন সময় অবৈধ বসতি উচ্ছেদে বারবার আল্টিমেটাম, অভিযানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

প্রতিবছর বর্ষা এলেই শুরু হয় তোড়জোড়। এবার কোভিড-১৯ সংক্রমণের দুযোর্গপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই হাজির হয়েছে বর্ষা। অতীতের অভিজ্ঞতা অনুসারে ধরে নেয়া যায়, এবারও বর্ষায় ভারি বৃষ্টি পাহাড়ে বসবাসকারীদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। তাই এখনই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে করণীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করা না গেলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে প্রাণহানির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকেই যায়। স্থানীয় প্রশাসনের করা ২০১৯ সালের তালিকার ১৭ টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন ও বাকি সাতটি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, রেলওয়ে, চট্টগ্রাম ওয়াসা, গণপূর্ত এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের পাহাড় আছে। অনতিবিলম্বে প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে করোনাভাইরাস উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবারের বর্ষায় এসব পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের জীবন রক্ষায় করণীয় কী।

পিপলস ভয়েসের সভাপতি শরীফ চৌহান বিবৃতিতে বলেন, ২০০৭ সালে পাহাড় ধসে প্রাণহানির পর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি কিছু সুপারিশ করেছিল। সেসব সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা প্রতিবছর ১১ জুন কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন দাবি দাওয়া তুলে ধরি। সেসব দাবিতে প্রশাসন কর্নপাত করে না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া পাহাড় রক্ষা সম্ভব না, প্রাণহানিও ঠেকানো যাবে না। শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পাহাড় কাটা থামবে না, সবার আগে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নগরী ও উপজেলাগুলোতে চলমান পাহাড় কাটা থামানো না গেলে ভবিষ্যতে পাহাড়া ধ্বস, পরিবেশ বিপর্যয় এমনকি বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাষ মতে করোনাভাইরাসের মত এমন প্রাণঘাতি জীবাণু সংক্রমণও ঘটতে পারে। তাই অবিলম্বে পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের টানা অভিযান এবং বাস্তবতা বিবেচনায় চলতি বছরের জন্য পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনাকীদের প্রাণরক্ষায় আসন্ন বর্ষায় করণীয় ঠিক করে দ্রুত তা বাস্তবায়ন করার দাবি জানাচ্ছি।

২০০৭ সালের ১১জুন টানা বর্ষণের ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় ও দেয়াল ধসে এবং মাটি চাপায় মৃত্যু হয়েছিল ১২৭জন। এরপরের বছরগুলোতে চট্টগ্রাম পাহাড় ও দেয়ালধস, মাটি চাপা এবং পানির তোড়ে মারা গেছে কমপক্ষে আরও ২১৮ জন। ২০১৭ সালের ১২-১৩ জুন রাঙামাটিতে পাহাড় ধ্বসে ১১০ জন, চট্টগ্রামে ২৩ জনসহ মোট ১৫৬ জন মারা যায়। এরপরও পাহাড় কাটা থামেনি