নিউজটি শেয়ার করুন

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে ঐক্যের আড়ালে ‘অনৈক্যের আগুন’

চট্টগ্রামে সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা সুষ্ঠু-শোভন রাজনীতি চর্চার পরিবর্তে গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে বেশী তৎপর। যদিও নেতারা মুখে ঐক্যের কথা বলেন বক্তৃতায় কিন্তু ভেতরে ভেতরে জ্বলছে ‘অনৈক্যের আগুন’। কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না, ন্যূনতম ছাড় দিতেও রাজি হয় না। তারই ধারবাহিকতায় মঙ্গলবার বিকালে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।এমনকি সংঘর্ষের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধান অতিথি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বক্তব্য না দিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। অন্যদিকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার কথা থাকলেও অনুষ্ঠানেই উপস্থিত হননি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন।

এর আগে ২৭ অক্টোবর আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় প্রয়াত নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিনকে মঞ্চে থেকে নামিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ গ্রুপিং চাঙ্গা হয়। মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনায় হাসিনা মহিউদ্দিন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি । তবে বিষয়টি নিয়ে অতিরঞ্জিত করার অভিযোগ তুলে সিটি মেয়র বলেছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা বসে সিদ্ধান্ত নেন মঞ্চে কারা বসবেন। সভা শুরুর পর কারা মঞ্চে বসবেন সেটা আমি সঞ্চালক হিসেবে বারবার ঘোষণা দিয়েছি। আমি বারবার সবার কাছে সহযোগিতা চেয়ে বলেছি আমরা সুশৃঙ্খলভাবে সভা শেষ করতে চাই। এর পরও কেউ কেউ মঞ্চে উঠেছেন। আমি কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করিনি, অসৌজন্যমূলক আচরণও করিনি। শুধু অনুরোধ করে মঞ্চে কারা বসবেন, সেটা নিয়ে সিদ্ধান্তটা ওনাদের জানিয়েছি।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকে কোণঠাসা তার অনুসারী নেতাকর্মীরা। অনেকে মনে করেছিলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীর অবর্তমানে তার সন্তান ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এই পক্ষের হাল ধরবেন। কিন্তু তা হয়নি। সবাইকে হতাশ করে প্রকাশ্যে গ্রুপিংয়ের রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন তিনি। মন্ত্রণালয় ও ঢাকা বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বেশি। গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করছেন বেশি।কিন্তু তাকে প্রধান অতিথি করে স্মরণকালের সাংগঠনিক কোন বড় অনুষ্ঠান হয়নি। তাই যুবলীগের মিটিং পন্ড হবার পেছনে দায়ী কি কি বিষয় সেসব বিষয়ের ক্লু উদঘাটন করার পাশাপাশি নওফেল বিষয়টি কিভাবে নিবেন সেদিকে তাকিয়ে আছে নেতা কর্মীরা। অবশ্য উপমন্ত্রী নওফেলের সাথে গতকাল যোগাযোগ করে মন্তব্য নিতে চাইলে উনার ব্যক্তিগত সহকারী অনিক জানান, উনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করবেন না।

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের মূল সমস্যা অন্তর্কলহ বলে মন্তব্য করেন, খোদ দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন নেতারা সবসময় একসঙ্গে থাকেন, কিন্তু মাঝে মধ্যে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যায়, যা আমরা আশা করি না। সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২৭ অক্টোবর আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রতিনিধি সভায় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেন ।

চট্টগ্রামের অতীত রাজনীতির সমীকরণে দেখা যায়, গত শতকের আশির দশকে প্রয়াত চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একভাগের নেতৃত্বে ছিলেন প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এবং অন্য পক্ষে প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

১৯৯৩ সালে হুমায়ুন জহির হত্যা মামলার আসামি হয়ে দেশ ছাড়েন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। তখন বাবু গ্রুপের দায়িত্ব কাঁধে নেন নগর আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীন। কালে কালে তিনিই ওই গ্রুপের হর্তাকর্তায় পরিণত হওয়ায় পরবর্তীতে পুনরায় রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও বাবু আর নিজ গ্রুপের কর্তৃত্ব ফিরে পাননি। বিভিন্ন সময় মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বাবু গ্রুপের সংঘর্ষে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অন্তত ১৫ নেতাকর্মী মারা যান। এমনকি ১৯৯৩ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদীঘি মাঠে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সামনেই সমাবেশে বাবু গ্রুপ ও মহিউদ্দিন গ্রুপ প্রকাশ্যে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। ওইদিন মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারীদের গুলিতে বাবু গ্রুপের আবদুল মোমিন নামে এক ছাত্রলীগ নেতা নিহত হন।

দুইপক্ষের দূরত্ব এতই বেশি যে, ২০১৫ সালে আ জ ম নাছির উদ্দীন চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে মাঠে ছিলেন সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। বিশেষ করে গৃহকর আদায়কে কেন্দ্র করে মহিউদ্দিন চৌধুরী লালদীঘি মাঠে সমাবেশ ডেকে আ জ ম নাছিরকে খুনি বলে আখ্যা দেন। বিপরীতে আ জ ম নাছিরের অনুসারীরাও মহিউদ্দিন চৌধুরীকে খুনি থেকে শুরু করে নানা কুৎসা রটাতে থাকেন।

২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব অব্যাহত ছিল। মহিউদ্দিন চৌধুরীর পুত্র মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় এবং মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের আপাতত অবসান হয়। কিন্তু একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে আবার মাঠে গড়িয়েছে এই দ্বন্দ্ব। আ জ ম নাছির ও নওফেলের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠলেও বাবার অনুসারীদের পক্ষেই শেষ পর্যন্ত অবস্থান নেন নওফেল। একই দল ও আদর্শের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারীরা খুব কম সময়ই একমঞ্চে উঠে একসঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দুই গ্রুপের আলাদা অনুসারী রয়েছে। তা ছাড়া এক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা কলেজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্য গ্রুপের অনুসারীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগর আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগের মুখে ঐক্যের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র এর উল্টো। বিশেষ করে আগামী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে বর্তমান মেয়র নাছির উদ্দীন ছাড়াও হাসিনা মহিউদ্দিন ও আবদুচ ছালামসহ আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা দলের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশী। আর এই নির্বাচন সামনে রেখে একে-অপরকে ঘায়েলে নানামুখী চেষ্টা চলছে বলেও জানান তারা।

বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, সরকার দলীয় দু-গ্রপের এই অন্তর্কলহ রাজনীতির কঠিন অশনি সংকেত।