মোঃ নেজাম উদ্দীন: দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটার পর দেনমোহর আদায়ের মামলা করেন মেয়েরা। তবে চট্টগ্রাম আদালতে দেনমোহর আদায়ের মামলার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়লেও বাড়ছে না মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা। যদিও দেনমোহরের মামলা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার নিয়ম রয়েছে। এক্ষেত্রে তা হচ্ছে না। মামলা নিষ্পত্তিতে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন জটিলতা। তবে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতগুলোতে দেনমোহরের আদায়ের মামলা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে।
সোমবার (২৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম পারিবারিক আদালতগুলোর সেরেস্তাদারের অনুমতিক্রমে মামলার ফাইলিং রেজিষ্ট্রার, মামলার দৈনিক কার্যতালিকা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা যায়।
চট্টগ্রাম জজ আদালতে ১ম পারিবারিক আদালত ও ২য় পারিবারিক আদালত সদর চট্টগ্রাম নামে দুইটি পারিবারিক আদালত রয়েছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম আদালতের ১ম সিনিয়র সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতে বিচারক হিসাবে বেগম ফরজানা তাবাসসুম এবং ২য় অতিরিক্ত সিনিয়র সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতে নিশাত সুলতানা বিচারক হিসাবে দায়িত্বরত রয়েছেন।
চলতি বছরে (২০২১ সালে) প্রথম পারিবারিক আদালত সদর চট্টগ্রাম এর নিকট মামলা হয়েছে মোট ৪৮৮টি এবং ২য় পারিবারিক আদালত সদর চট্টগ্রাম এর কাছে মামলা হয়েছে ৩১৪টি। দু’টি আদালতে সর্বমোট ৮০২টি মামলা হলেও তার তুলনায় মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা খুব কমই। মামলার রায় হতেও লেগে যায় অনেক সময়। তাতে মামলার বাদীনিরা নানারকমের দুর্ভোগে পড়ছেন। দেনমোহর মামলার রায় হলেও দেনমোহরের টাকা একসাথে না পেয়ে কিস্তি আকারে পায় মেয়েরা। চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতগুলোতে চলতি বছরে ফাইলিং হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে দেনমোহর ও খোরপোষ, বিবাহ বিচ্ছেদ, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, অভিভাবকত্ব ও ভরণপোষন আদায়ের মামলা হয়েছে। তবে অধিকাংশ মামলা হয়েছে দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের জন্য।
মামলার ফাইলিং রেজিষ্ট্রার ও মামলার কার্যতালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২ মাস অন্তর অন্তর মামলার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তাতে অনেক সময় মামলার রায় প্রচারে বা মামলা নিষ্পত্তিতে কালক্ষেপন হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে অন্য আদালতের বিচারকরা পারিবারিক আদালতে ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন বিধায় মামলার রায়ে ধীর গতি হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
অনেকক্ষেত্রে, আদালতের দেনমোহর মামলার রায়ের নির্দেশ কোনরকম না মেনে বা ১৭(৫) ধারার বিধান পালন না করে ডিক্রিকৃত টাকার মধ্যে ৫০০০/- বা ১০০০০/ টাকা জমা দিয়ে বিবাদী সময়ের প্রার্থনা করেন। বাংলাদেশের আদালতসমূহ কোনরূপ আইনগত বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে এরূপ দরখাস্ত দিব্যি মঞ্জুর করে জারী মোকদ্দমা চালিয়ে যান। ফলে এমনও দেখা যায়, মূল মোকদ্দমায় যেখানে রায় পেতে সময় লেগেছে ৩-৫ বছর সেখানে জারী মোকদ্দমার মাধ্যমে দেনমোহরের টাকা পেতে ডিক্রিদারের ১০-১৫ বছর লেগে যাচ্ছে। তাতে মামলা রায় বাস্তবায়নে কালক্ষেপন হচ্ছে।
মুলতঃ পরিবারিক আদালতে দেনমোহর ও খোরপোষ, বিবাহ বিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, ভরণপোষন আদায়ের জন্য মামলা করেন মেয়েরা।
দেনমোহর ও খোরপোষ মামলার এক বাদী মোছাম্মৎ সাহিনা ইয়াছমিন বলেন, ২০০১ সালে ৮০০,০০০ (আট লক্ষ) টাকা দেনমোহর ধার্য্যে আমার বিবাহ হয়। আমার স্বামী আমার বনিবনা না হওয়ায় আমাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের জন্য আমি ২০১৪ সালে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করেছি স্বামীর বিরুদ্ধে। ২০২১ সালে এসেই মামলা রায়ের জন্য রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বিবাদী বার বার সময় নিয়ে কালক্ষেপন করছেন। মামলার এখনও রায় হয় রায় হলে নাকি বিবাদী আবার কিস্তি আকারে পরিশোধের জন্য দরখাস্ত দেন তাও বলা যাচ্ছে না।
দেনমোহর মামলার আরেক বাদীনি নারগিস আক্তার বলেন, ২০০৩ সালে ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা দেনমোহরে আমাদের বিবাহ হয়। ২০১১ সালের পরে আমাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ২০১৫ সালে দেনমোহর আদায়ের মামলা করেছি আমার স্বামীর বিরুদ্ধে রায়ও হয়েছে মামলাটির। কিন্তু ৩০০০ টাকা কিস্তিতে দেনমোহরের টাকা আদায়ের রায় হয়েছে! কিন্তু সেই টাকাগুলো কোর্ট থেকে নেওয়ার জন্য আসা-যাওয়ার খরচ ও কোর্টের খরচে চলে যায় এই টাকার বড় একটা অংশ।
দেনমোহর মামলার অন্য একজন বাদী সাদিয়া তাবাচ্ছুম বলেন, ২০১১ সালে এক প্রবাসীর সাথে আমার বিবাহ হয়। ২০১২ সালে সে আরব আমিরাতে চলে যায়। ২০১৫ সালে আমার স্বামী আরব আমিরাত থেকে দেশে চলে আসে। পরে আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়, এক পর্যায়ে ২০১৮ সালে আমার বিচ্ছেদ হয়। তখন আমাদের ৩ বছরের একটি কন্যা সন্তান আছে। পরে দেনমোহর ও খোরপোষের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করি। সে মামলা চলছে এখনো। কখন মামলাটার রায় হবে আর আমি দেনমোহরের টাকা বুঝে পাবো সেটাই ভাবতেছি। আমার বিবাহে দেনমোহর ছিল ১০,০০,০০০ (দশ লক্ষ) টাকা।
আরেক বাদী আখিঁ আক্তার সুমি বলেন, পারিবারিক আদালতে আমি আমার দাম্পত্য জীবন পুনরুদ্ধান করার জন্য মামলা করেছি। মামলা এখনো চলছে। আমার বিবাহ হয় ২০১৬ সালে। আমাদের মধ্যে ছোটখাট বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হলে আমার স্বামী আমাকে ২০২০ সালে তালাক দেন। আমি দাম্পত্য জীবন পুনরুদ্ধানের জন্য মামলা করেছি সে মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
তবে যে যে কারনে মেয়েরা মামলা করেন পারিবারিক আদালতেঃ
বিবাহ বিচ্ছেদ: বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সব সময় আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। যদি কোন বিবাহ বন্ধনের কাবিননামায় ১৮ নম্বর কলামে “স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা না দিলে সেক্ষেত্রে কেবল স্ত্রী আদালতে যেতে পারে। এ ছাড়া স্ত্রী যদি স্বামীকে ‘খোলা বা ‘মোবারাত’ বিচ্ছেদে সম্মত করাতে পারেন, সে ক্ষেত্রেও আদালতে যাওয়ারও প্রয়োজন হয় না।
দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার: কোনো কারণে দাম্পত্য জীবন ব্যাহত হলে এবং সংসারে ফেরত না আসতে পারলে স্বামী বা স্ত্রী যে কেউ পারিবারিক আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন।
মোহরানা: স্বামীর পরিশোধ না করা দেনমোহরের জন্য স্ত্রী মামলা করতে পারেন। তাৎক্ষণিক মোহরানার জন্য যে তারিখে তা দাবি করা হয় এবং অগ্রাহ্য করা হয়, সে তারিখ থেকে তিন বছরের মধ্যে এবং বিলম্বে মোহরানার জন্য বিচ্ছেদ ঘটার তারিখ থেকে তিন বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
ভরণপোষণ: স্বামী যদি স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে না চান, তাহলে স্ত্রী যেদিন থেকে ভরণপোষণের টাকা দাবি করবেন, সেদিন থেকে তিন বছরের মধ্যে পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হবে।
সন্তানের অভিভাবকত্ব: সন্তানের অভিভাবকত্ব এবং হেফাজত নিয়ে কোনো বিরোধ হলে পারিবারিক আদালতে যেতে হয়।
এই বিষয়ে পারিবারিক আদালতের একজন সিনিয়ির আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ মুজিবুল হক সিপ্লাসকে বলেন, পারিবারিক আদালতে মুলত দেনমোহর ও খোরপোষ, বিবাহ বিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, ভরণপোষন আদায়ের জন্য মামলা করা হয়। মামলা নিস্পত্তিতে সময়সাপেক্ষ আছে । এখানে মামলা করার পর অনেক রকম জটিলতা শুরু হয়, মামলার রায়ের পরও অনেক সময় জটিলতায় পরতে হয়, যেমন বিবাদী দেনমোহরের টাকা আদায়ে কিস্তি আকারে পরিশোধের জন্য দরখাস্ত দিয়ে থাকেন যা মামলা রায় হওয়ার পর দেনমোহরের পরিপূর্ন টাকা আদায় করতে অনেক সময় লেগে যায়। অনেক আদালতে বিচারকের অভাবে অন্য আদালতের বিচারক বিচারিক ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করায় অনেক সময় আদালতে বিচারক থাকেন না। তবে আমরা আইনজীবীরাসব সময় চেষ্টা করি যাতে দ্রুত মামলা রায় হয় ও বাদীনিরা যাতে তাদের পাওনা দেনমোহরের টাকা যেন তারা তাড়াতাড়ি পায়।
পারিবারিক আদালতে যেভাবে মামলা নিস্পত্তি হয়ঃ প্রথমত, যদি বাদী একমাত্র হন এবং যদি বিয়ে বলবৎ থাকে তবে দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করা ছাড়াও আইনানুগ কাল পর্যন্ত বিবাদী খোরপোষ দেবেন। আর যদি ডিক্রি চলাকালে বাদী-বিবাদীর মধ্যে তালাক হয়ে যায় তাহলে দেনমোহর ও খোরপোষের যে পরিমাণ টাকা ডিক্রি হয়েছে সেই সাথে তালাকের পর ইদ্দতকালীন ০৩ মাসের টাকা পরিশোধ সাপেক্ষে মোকদ্দমাটি চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হতে পারে যদি না বাদীর কোন নাবালক সন্তান থাকে।
দ্বিতীয়ত, যদি ডিক্রিদার-দায়িক জারির মোকদ্দমা চলাকালে নিজেদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে নেন এবং ডিক্রিদার-দায়িক আদালতে এসে দরখাস্ত দিয়ে জারী মোকদ্দমা আপোষসূত্রে প্রত্যাহারের আবেদন করেন সেক্ষেত্রে আদালত ডিক্রিদারের জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করে জারির মোকদ্দমা চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে পারেন।
তৃতীয়ত, যদি ডিক্রিদার ছাড়াও নাবালক ডিক্রিদার থাকেন তবে স্ত্রী- ডিক্রিদারের দাবী চুড়ান্তভাবে শেষ হয়ে গেলেও নাবালকদের ভবিষ্যৎ খোরপোষ ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে এক রকম এবং মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে অন্যরকম। তবে দায়িকের স্বীকার করার ব্যাপার আছে। যদি তিনি মূল মোকদ্দমায় বিয়ে অস্বীকার সহ সন্তান অস্বীকার করেন তবে আবার ডি.এন.এ. টেস্টের ব্যাপার রয়েছে। তবে বাংলাদেশের আদালত গুলো এখনও টেকনোলজি ও বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে থাকায় পারিবারিক আদালতের সন্তান ও পিতা-মাতার ডি.এন.এ টেস্ট করানোর খরচ কত, কোথায় কিভাবে করানো উচিৎ, কতদিন লাগতে পারে, এই বিষয়গুলো নির্ধারনের ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালতগুলোও বেশ পিছিয়ে রযেছে। যদি ডিএনএ টেস্টের পর প্রমানিত হয় যে ছেলে/মেয়ে দায়িকার সেক্ষেত্রে ডিক্রিদার নাবালক পুত্র হয় তবে নাবালক পুত্র ১৮ বছর পুর্ণ না হওয়া পর্যন্ত খোরপোষ পাবে। আর যদি ডিক্রিদার কন্যা হয় তবে সে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত খোরপোষ পাবে।
তবে এক্ষেত্রে, আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশে বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রন করা হয়নি। সেটা হলো নাবালক সন্তানের খোরপোষ বৃদ্ধির বিষয়। যেমন- কোন নাবালকের খোরপোষ ২০১৪ সালের রায়ে ১০০০/- টাকা নির্ধারন করে রায় দিয়েছেন আদালত এবং বাৎসরিক হারে না বাড়িয়েই রায় হলো। তখন যদি ঐ নাবালক সন্তান ০১-০২ বছর বয়স্ক থাকেন আর ২০২১ সালে তাঁর বয়স ০৭-০৮ বছর হয়, তাহলে আগে থেকে নির্ধারিত তাঁর জন্য ১০০০/- খোরপোষ যুক্তিসঙ্গত হবে? এক্ষেত্রে ৫৪ ডি.এল.আর. এর ১৭৫ পৃষ্ঠায় কাওছার চৌধুরী বনাম লতিফা সুলতানা মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বলেন যে, আদালত চাইলে নাবালকে কে বর্তমানে দেয়া খোরপোষের অতিরিক্ত খোরপোষ প্রদানের প্রার্থনা মঞ্জুর করতে পারেন।জারির মোকদ্দমাতেই ডিক্রিদারের আলাদা দরখাস্ত প্রদানের মাধ্যমে আগের নির্ধারিত ভবিষ্যৎ খোরপোষের সাথে বর্তমান আর্থ-সামাজিক প্রয়োজন বিবেচনায় ন্যয়সঙ্গত পরিমানে খোরপোষ বৃদ্ধির আদেশ দেয়া যায়। কিন্তু বাস্তবে কোন কোন জেলার বারের আইনজীবীদের ভুলে খোরপোষ বৃদ্ধির জন্য আলাদা মোকদ্দমা দায়ের করার নজির দেখা যায় যা অনভিপ্রেত।
ডিক্রি জারির মোকদ্দমা কীভাবে পরিচালিত হবে তা মূল মোকদ্দমার রায়েই বলা থাকে। অনেক বিজ্ঞ বিচারক রায়ে স্পষ্ট করে বলে দেন কীভাবে বিবাদী বাদির ডিক্রির টাকা পরিশোধ করবেন। অনেক সময় বিচারক স্পষ্ট করে কিস্তিতে ডিক্রিকৃত টাকা পরিশোধের সুযোগ দেন। আবার অনেক সময় রায় প্রচারের সময় বিচারক রায় প্রচারের ৩০/৬০/৯০ দিনের মধ্যে মোকদ্দমার সমুদয় অর্থ এককালীন পরিশোধের নির্দেশ দেন। এইক্ষেত্রে ডিক্রিজারীর সময় জারী আদালতকে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশের ১৭(৫) ধারা অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু দায়িকপক্ষ আদালতে এসে আদালতের রায়ের নির্দেশ কোনরকম না মেনেই বা ১৭(৫) ধারার বিধান পালন না করেই ডিক্রিকৃত টাকার মধ্যে ৫০০০/- বা ১০০০০/- টাকা জমা দিয়ে সময়ের প্রার্থনা করেন। বাংলাদেশের আদালতসমূহ কোনরূপ আইনগত বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে দিব্যি এরূপ দরখাস্ত মঞ্জুর করে জারী মোকদ্দমা চালিয়ে যান। ফলে এমনও দেখা যায় মুল মোকদ্দমায় যেখানে রায় পেতে সময় লেগেছে ০৩-০৫ বছর সেখানে জারী মোকদ্দমার মাধ্যমে টাকা পেতে ডিক্রিদারের ১০-১৫ বছর লেগে যাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ৫২ ডি.এল.আর. (২০০০) এর ১৫৭ পৃষ্ঠায় মোঃ আলমগির বনাম হাবিবা বেগম মোকদ্দমার রায়ে বলেছেন,প্রয়োজন হলে ন্যয়বিচারের স্বার্থে জারী আদালত ডিক্রিকৃত টাকা দায়িকের দরখাস্তের ভিত্তিতে ন্যায়সঙ্গত কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে পারেন।
অন্যদিকে জারী মোকদ্দমা দায়ের হলে পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ এর ১৬ ধারার বিধান মোতাবেক আইনগতভাবে প্রথমেই দায়িকপক্ষকে লেভি ওয়ারেন্ট জারী করার কথা কিন্তু পারিবারিক আদালতসমূহে বাস্তবে দেখা যায় অন্য চিত্র। সেখানে সাধারন মোকদ্দমার মত দায়িকপক্ষকে নোটিশ জারী করা হয়। এই নোটিশ ফেরত আসতে সাধারন মোকদ্দমার মতই সময় লাগে। নোটিশ জারী হয়ে ফেরত আসলে তারপর দায়িক আসে মোকদ্দমায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। কিন্তু পারিবারিক জারী মোকদ্দমায় দায়িক পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোন সুযোগ নেই। তিনি শুধু আদালতের রায় কীভাবে পালন করবেন সে বিষয়ে আদালতকে জ্ঞাত করবেন। যদি লেভি ওয়ারেন্ট বিনা জারীতে ফেরত আসে তাহলে আদালত দায়িকের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারী করে আইননির্ধারিত ১৬ (৩বি) ধারা প্রয়োগ করে দণ্ড আরোপ করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, যখন দায়িক পক্ষ আদালতে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকেন বা ডিক্রির টাকা একবার কিছু দিয়ে ঠিকমত আদালতে আসছেন না বা শুধু সময় নিচ্ছেন টাকা পরবর্তি ধার্য তারিখে পরিশোধের জন্য তখন আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করেন। তবে এক্ষেত্রে আইনের ১৬ ধারা বলে সাজাপরোয়ানা দেয়ার কথা।
আর একটা আশ্চর্যের কথা হলো কোন কোন সাজা পরোয়ানা প্রাপ্ত আসামীকে সাজা থেকে মুক্তির ক্ষেত্রে জামিন নেয়ার ঐতিহ্য। এই আইনের ১৬ (৩বি) ধারামতে যদি কোন দায়িকের নিকট হতে লেভি ওয়ারেন্টের মাধ্যমে ডিক্রিকৃত টাকা আদায় সম্ভব না হয় তাহলে তাকে ০৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করার কথা। যদি সাজা খাটার সময়ে সে ডিক্রির আংশিক টাকা পরিশোধ করে তবে আদালত চাইলে তাকে সাময়িক মুক্তি দিয়ে বাকী টাকা পরিশোধের জন্য সময় দিতে পারেন। এক্ষেত্রে, ফৌজদারী আইনে প্রচলিত বেইল বন্ড দিয়ে জামিন চাওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র আদালত সাজা পরোয়ানা ফেরত চেয়ে জেলখানা বরাবর একটা মুক্তির ছাড়পত্র পাঠালে ঐ ব্যক্তি মুক্তি পাবেন। কেন জামিন চেয়ে বেইল বন্ড এর জন্য আবার ২০০০-৩০০০ টাকা দিতে হবে। এই সম্পর্ক বিচারপতি হামিদুল হক তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন যে, ডিক্রির টাকা পরিশোধ করলে বা আংশিক পরিশোধ করলে দায়িকপক্ষকে সাময়িক মুক্তি দেয়া হবে।
১ আবার, কাজী মখলেছুর রহমান তাঁর বই তে উল্লেখ করেছেন যে, কোন বেইল বন্ড লাগবে না শুধু বাকী টাকা পরিশোধের শর্তে তাকে সাময়িক মুক্তি দেয়া হবে।
২ যদি কোন দায়িক বাকী টাকার মধ্যে কিছু টাকা পরিশোধ করে আবার আদালতের নির্দেশ অমান্য করে তবে তাকে আবার আনুপাতিক হারে বা ০৩ মাসের সাঁজা দেয়া যাবে। এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপীল বিভাগ২০ বি.এল.ডি. (২০০০) এর ৮৪ পৃষ্ঠায় মোঃ সিরাজুল ইসলাম বনাম মাকসুদা আখতার মোকদ্দমার রায়ে বলেন যে,১৬(৩) ধারা অনুসারে প্রতি কিস্তির টাকা দিতে না পারায় আলাদা আলাদা ভাবে তাকে সাঁজা খাটতে হবে।
তাই অনেক সময় বিবাদীরা/দায়িকরা দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে কালক্ষেপন করছেন। তাতে দেনমোহর আদায়ের মামলা বাড়লেও কমছে না মামলার রায় নিস্পত্তির সংখ্যা।








