মো. নেজাম উদ্দিন: চট্টগ্রামের ফ্লাইওভারগুলো যেন মরণ ফাঁদ, ফ্লাইওভারগুলোতে বার বার ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। থেকে যাচ্ছে ফ্লাইওভার থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনার অজানা কারণ। এছাড়া ফ্লাইওভারে সুতা বেঁধে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
গত ১৫ দিনের ব্যবধানে আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার থেকে পড়ে দুইজনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। এখনো পর্যন্ত এসব মৃত্যুর আসল রহস্য উৎঘাটন হয়নি।
শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) এই ব্যাপারে পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহেদুল কবির এর কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি সিপ্লাসকে বলেন, বার বার ফ্লাইওভার থেকে পড়ে মানুষের রহস্যজনক মৃত্যুর আসল রহস্য উৎঘাটনে তৎপর আছে পুলিশ। গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে আকবর আলী নামে এক ব্যক্তি এবং এর আগে গত ২৭ আগস্ট রাতে আকবর হোসেন খান নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়ে গত ১ সেপ্টম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রহস্যজনক মৃত্যু বরণ করে। এ ব্যাপারে প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হলেও মেডিকেল রিপোর্ট এর ভিত্তিতে পরে আদালতে পুলিশ হত্যা হিসাবে ধারা সংযোজন আবেদন করলে তৎপ্রেক্ষিতে আদালত হত্যা মামলা হিসাবে ধারা সংযোজন করত: হত্যা মামলা হিসাবে নথিভুক্ত করেন। আদালতের আদেশে আমরা তদন্ত কাজ অব্যহত রেখেছি, আশা করছি এসব ঘটনা মুল রহস্য উৎঘাটন হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ আগস্ট রাতে জিইসি এলাকায় আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার থেকে পড়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আকবর হোসেন খান গুরুতর আহত হয়। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
নিহত আকবর হোসেন খানের গ্রামের বাড়ী মৌলভী বাজারে। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগে ছাত্র ছিলেন। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে পুরান ঢাকার কলতা বাজারের একটি মেস বাসায় থাকতেন।
বন্ধুদের সাথে চট্টগ্রামে বেড়াতে এসে তার এমন রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা কেন ঘটেছে এর কারণ এখনো জানা যায়নি। বার বার থেকেই যাচ্ছে এসব মৃত্যু অজানা কারণ।
এর আগে গত শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পাঁচলাইশ থানাধীন ষোলশহর দুই নম্বর গেইট মোড এলাকায় আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার থেকে পড়ে আলী আকবর নামের এক ব্যক্তির রহস্যজনক মৃত্যু হয়ে।
নিহত আলী আকবর (৪৫) বাকলিয়া থানাধীন বলিরহাট এলাকার বাসিন্দার বলে জানা গেছে। নিহত আলী আকবর এসময় ঐ এলাকায় কেন আসলেন, কিভাবে তিনি ফ্লাইওভার থেকে পড়ে গেছেন অথবা কে বা কারা তাকে ফেলে দিয়ে চলে গেছে কিনা তা নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠছে।
চলতি বছরের ১৮ জুন নগরীর খুলশী থানাধীন আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারের জিইসি অংশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তামিম নামের এক যুবক নিহত হয়েছিলেন। নিহত তামিম হাটহাজারী উপজেলার ধলাই ইউনিয়নের কাজিরহাট এলাকার শাহ আলমের ছেলে। ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের ফাঁদ সুতায় আটকে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ছিল।
তবে চট্টগ্রাম ফ্লাইওভার গুলোতে এসব ঘটনা বার বার কেন ঘটছে এই নিয়ে মানুষের কাছে নানা প্রশ্নের জন্ম নিচ্ছে। অনেকে মনে করছেন উন্নত দেশের ফ্লাইওভার গুলোতে দুইপাশে রেলিং উচু ও নিরাপদ, কিন্তু বাংলাদেশের সব ফ্লাইওভারের মত চট্টগ্রাম নগরীতে নির্মিত ফ্লাইওভারগুলোর দুইপাশে রেলিং তেমন উচু ও নিরাপদ নয়। এই সুযোগে হত্যাকারীরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) সূত্র জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১২ নভেম্বর চট্টগ্রামের দীর্ঘতম আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভাটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় ৬৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটি চার লেনের। পরে ২০১৫ সালের মার্চে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নগরীর শুলকবহর থেকে বহদ্দারহাট এলাকা পর্যন্ত এমএ মান্নান ফ্লাইওভার প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তদারকিতে নির্মাণকাজ শেষে ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর ফ্লাইওভারটি উদ্বোধন করা হয়। নগরীর বটতলী স্টেশন থেকে ডিটি রোডের ধনিয়ালাপাড়া পর্যন্ত ফ্লাইওভারটি ৫৮ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালের জুলাইয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়। উদ্বোধন করা হয় ২০১৫ সালের ৬ ডিসেম্বরে। নগরীর দেওয়ানহাট ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১১ সালে। প্রায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এর কাজ শেষ হয় ২০১২ সালে এবং এটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় ২০১৩ সালে। নগরীর এসব ফ্লাইওভার নির্মাণের মুল উদ্দ্যেশ্য ছিল যানজট কমানো নগরবাসীর উপকারের জন্য । কিন্তু নগরবাসীর উপকারের পরিবর্তে ফ্লাইওভার গুলো পরিনত হয়েছে হত্যা, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মের স্থানে।








