নিউজটি শেয়ার করুন

চসিক নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ৫৮টি

অভিযোগকারীদের বেশির ভাগই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী

সিপ্লাস প্রতিবেদক:  চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এ পর্যন্ত ৫৮টি অভিযোগ করেছেন মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা।

১০ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি চসিক নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ৫৮টি অভিযোগ জমা হয়েছে। অভিযোগকারীদের বেশির ভাগই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী।

অভিযোগকারীদের তালিকায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত ও আওয়ামী লীগের এম. রেজাউল করিমও রয়েছেন।

আরও জানা গেছে, বেশির ভাগ অভিযোগের তদন্ত করতে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও থানার অফিসার ইনচার্জদের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রচারণার শুরু থেকে আজ অবধি ৫৮টি অভিযোগের মধ্যে ৩১ টি অভিযোগ নিস্পত্তি করা হয়েছে।

এরমধ্যে কিছু অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতরে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। আর কিছু প্রার্থীকে শোকজ করা হয়েছে। দু-এক প্রার্থীকে জরিমানা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দায়ে তেমন কোনো কঠোর শাস্তির উদ্যোগ নেয়নি কমিশন।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, আচরণবিধি প্রতিপালন ভালোভাবেই হচ্ছে। তবুও কিছু জায়গায় লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে বৈঠক করেছি।

আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রতিপালন করতে ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পরই তা ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে ইসি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে, আর তা জানার পর ব্যবস্থা নিচ্ছি না এমন অভিযোগ সত্য নয়।

আচরণবিধির ৭-এর ‘খ’ ধারায় রয়েছে, কোনো প্রার্থী পথসভা ও ঘরোয়া সভা করতে চাইলে প্রস্তাবিত সময়ের ২৪ ঘণ্টা আগে তার স্থান এবং সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। যাতে ওই স্থানে চলাচল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে চলছে তার উল্টো। প্রতিদিনই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী গণসংযোগকালে একাধিক পথসভা করছেন। রাস্তা বন্ধ করে এসব পথসভা করায় আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজটের। কিন্তু এসব দেখতে নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্মকর্তাকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

আচরণবিধির ৮-এ উল্লেখ আছে, প্রার্থীদের পোস্টার সাদাকালো হতে হবে এবং এর আয়তন ৬০ বাই ৪০ সেন্টিমিটারের অধিক হতে পারবে না। কিন্তু অনেক প্রার্থীই এ বিধি মানছেন না। নির্ধারিত আয়তনের পাশাপাশি অনেকে বড় আকারের ব্যানার ফেস্টুনও টানিয়েছেন। একই ধারার (৫) এ বলা আছে, নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রার্থী নিজ ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কারও নাম, ছবি বা প্রতীক ছাপাইতে কিংবা ব্যবহার করতে পারিবেন না। তবে প্রার্থী কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত হলে সেক্ষেত্রে তার দলের বর্তমান প্রধানের ছবি পোস্টারে বা লিফলেটে ছাপাইতে পারবেন। এ বিধানও মানা হচ্ছে না। মেয়র প্রার্থীরা দলের মনোনীত। কিন্তু কাউন্সিলরা মনোনীত নন।

নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী তাদের পোস্টারে নিজ নিজ দলের মনোনীত প্রার্থী বলে পোস্টারে তা লিখেছেন। নগরীর ১৪নং লালখানবাজার ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী আবুল হাসনাত মো: বেলাল তার পোস্টারে দল সমর্থিত প্রার্থী বলে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন।

অপরদিকে ৪নং চান্দগাঁও ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আনিসুর রহমান ।তিনি নিজেকে বিএনপি মনোনীত কাউন্সিল প্রার্থী বলে পোস্টারে ছাপিয়েছেন। পোস্টারের এ চিত্র নগরীর প্রায় সব ওয়ার্ডেই। আচরণবিধির ১৬-এর (ঘ)-তে বলা হয়েছে, কোনো সড়ক কিংবা জনগণের চলাচল ও সাধারণ ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থানে নির্বাচনী ক্যাম্প বা অফিস স্থাপন করিতে পারবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরো উল্টো। এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বেশির ভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী ফুটপাত, অনেক জায়গায় রাস্তা দখল করে নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন করেছেন।

আচরণবিধির ২০-এ বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তাহার পক্ষে কোনো রাজনৈতিক দল, অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোনো প্রকার নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন না। এ বিধিও মানছেন না প্রার্থীরা। শুক্রবার জুমার নামাজের শেষে প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীই মসজিদেরর ভেতরে প্রচার চালান। ভোটারদের সঙ্গে কোলাকুলিসহ তাদের কাছে ভোট চান।

আচরণবিধিতে দুপুর ২টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মাইক ব্যবহার করা যাবে বলে উল্লেখ আছে। শুধু তাই নয়, রাত আটটার পর কোনো প্রার্থী গণসংযোগও চালাতে পারবেন না। কিন্তু নগরীর অনেক স্থানে দেখা যাচ্ছে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মাইক বাজানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রচারও চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। এছাড়া প্রচারে মোটরসাইকেল ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও তাও মানছেন না অনেকে।

জানা গেছে, আচরণবিধি লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে। কোনো প্রার্থী তা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচন-পূর্ব সময়ে বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আচরণবিধি মানছে কিনা বা এ সংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখতে রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতর থেকে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

এমনকি নগরীতে আচরণ বিধিমালা প্রতিপালন দেখভালে ৮ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ২০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নিয়োগপ্রাপ্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্বাচন শুরুর দুই দিন আগে থেকে মাঠে থাকবেন।