Site icon CPLUSBD.COM

জেনে নিন আপনার যত অধিকারঃ করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের করণীয় প্রসঙ্গে

জিয়া হাবীব আহসান

করোনাভাইরাসের কোভিড-১৯ ভয়াল সংক্রমণ রুখতে গৃহবন্দি প্রায় হয়েছে গোটা দেশ । সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে । কখন সব আবার স্বাভাবিক হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই । এদিকে ঘরে ঘরে বৃদ্ধি পেয়েছে হিংসার ঘটনা । পাশাপাশি বেড়েছে নির্যাতনের অভিযোগও । আইন আদালতে নির্যাতিতাদের আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ নেই । সীমিত পরিসরে ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে কিছু জরুরী জামিন শুনানি হচ্ছে । অনেকে চাইলেই পুলিশের কাছ অবধি পৌছতে পারছেন না । অনেক ক্ষেত্রেই তারা পুলিশের কাছে যেতে চান না কারণ আসামী যদি কয়েকদিন পর মুক্তি পায় তখন অত্যাচার আরও বাড়তে পারে এই আশঙ্কা রয়েছে তাদের । এইদিকে লকডাউন পরিস্থিতিতে থেমে নেই খুন-খারাপি, জবর-দখল, অপহরণ, যৌতুক, ধর্ষণ, পাচার, লুণ্ঠন, চান্দাবাজি, হত্যা ও গুম আরও কত রকমের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এই মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও । দেশে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ ও নির্যাতন । এখন করোনাজনিত লকডাউন, দুশ্চিন্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বাড়ির ভেতর চব্বিশ ঘণ্টা অনেকের জন্যই দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে । প্রতিক্রিয়ায় বেড়ে যাচ্ছে পারিবারিক সহিংসতা, বৈষম্য, নারী ও শিশু নির্যাতন । তাদের প্রতি বেড়ে যাচ্ছে মানবিক, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যমতে, বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ঘটনার ৭৭ শতাংশই ঘটে পারিবারিক পরিসরে । লকডাউন পরিস্থিতিতে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং সহিংসতার ঘটনায় দ্বিগুণ হারে হট লাইনে কল দিয়ে ভুক্তভোগীরা সহায়তা চাইছেন মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ এর কাছে । জরিপ অনুযায়ী,  শুধু এপ্রিল মাসেই দেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪২৪৯ জন নারী । তাদের মধ্যে ৮৪৮ জন শারীরিক নির্যাতন, প্রায় ২ হাজার নারী মানসিক নির্যাতন ও ১৩০৮ জন অর্থনৈতিক নির্যাতনের (খাদ্য ও অর্থাভাব) শিকার হয়েছেন ।

এছাড়াও যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৮৫ জন । এ সময়ে ৩৩টি বাল্যবিয়ের ঘটনাও ঘটেছে । এপ্রিল মাসে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৪২টি । এর বাইরে, অন্তত ৪২৪ শিশু তাদের পরিবারে নির্যাতনের শিকার হয়েছে । ফেনীতে ফেসবুক লাইভে এসে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যা, চট্টগ্রামে শিশু ধর্ষণ ও বলৎকার, নারী ধর্ষণ, ৭০ বছরের বৃদ্ধ দ্বারা ৯ বছরের শিশুকন্যা ধর্ষণ করার মতো বিকৃত ঘটনাও ঘটেছে সম্প্রতি । এইসব পরিস্থিতির অবনতির জন্য অনেকে দায়ী করছেন নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে হটলাইন ১০৯ ও পুলিশি সহায়তার জন্য ৯৯৯ জোরদারভাবে কার্যকর না করার কারণকে । করোনাভাইরাস কোভিড-১৯ পরিস্থিতির লকডাউনের কারণে নানা ধরণের অপরাধগুলো এজাহারে দায়ের না হলেও ভেতরে ভেতরে প্রভাবশালীরা তা মিট-মাট করার চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং ভুক্তভুগি ও সাক্ষীদের নানাভাবে হুমকি-ধুমকি, ভয় দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি করছে । মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এখন প্রতিদিনই ভিকটিমদের টেলিফোন ও কান্নার আওয়াজ শুনতে হয় । কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষায় সংযম ও কোয়ারেন্টিনে থাকাটা জরুরি, কিন্তু সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুদের সেই ঘরে রাখা তাদের জন্য সম্পূর্ণ জীবনের ঝুঁকি । নারী ও শিশু ধর্ষণ, বলৎকার এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হলে সর্বপ্রথম হটলাইন ১০৯ অথবা পুলিশি সহায়তার জন্য ৯৯৯ বা সরাসরি থানায় কল করতে হবে ।

সম্ভব হলে মিডিয়াকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, সমাজকর্মী এবং প্রতিবেশীদের জানাতে হবে । দ্রুত আলামত সংগ্রহ করতে হবে, মনে রাখতে হবে কোনভাবে ধর্ষিতা বা নির্যাতিতের কাপড়-চোপড় ধৌত করা যাবে না এবং তা কাগজের প্যকেটে সংরক্ষণ করতে হবে । চ.মে.ক হসপিটালে ও.সি.সি ওয়ার্ডে ভর্তি হলে চিকিৎসাসহ সরাসরি মামলা / এজাহার দায়ের করার ব্যবস্থা রয়েছে, ভিকটিম বা সংবাদদাতাকে থানায় যেতে হবে না । একজন পুলিশ অফিসার, মানবাধিকারকর্মী চিকিৎসা সেবার সনদপত্র নিয়ে মামলার উদ্যোগ নিবেন । যেখানে ও.সি.সি নেই সেখানে সরাসরি থানায় মামলা দায়ের করতে হবে । থানায় মামলা না নিলে সরাসরি মিডিয়াকর্মী, বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অথবা সোশ্যালমিডিয়ার সাহায্য নিতে হবে । কেননা কোর্ট এখন বন্ধ তবে কোর্ট খোলার পরবর্তীতে বিলম্বের কারণ উল্লেখ করে মামলা করা যাবে ।

তবে এর মধ্যে আলামত এবং সাক্ষী নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কেননা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধী প্রভাবশালী হয় এবং ভুক্তভুগীরা দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বল হয়, তাই এদের রক্ষার্থে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে । এই ব্যাপারে নাগরিক সহায়তায় কমিউনিটিং পুলিশের ব্যাবস্থা করতে হবে । গ্রামে এই লকডাউন পরিস্থিতিতে কোন অপরাধ সংঘটিত হলে স্থানীয় চেয়ারম্যান, টিএনও, গ্রাম্য পুলিশ ও মোবাইল কোর্টের আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে । যেসব ধারায় মামলা হবে তা হল- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, শিশু আইন ২০১৩, পারিবারিক সহিংসতা আইন ২০১০, যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ প্রভৃতি আইন সহ দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় । কিছু মামলা সরাসরি কোর্টে করতে হয় তার জন্য আপনাকে বন্ধ অবধি অপেক্ষা করতে হবে । অভিযোগ দায়েরের সময় যে বিষয়গুলো মনে রাখতে হবে- কে, কখন, কোথায়, কিভাবে, কাহার সহায়তায়, অপরাধ সংঘটন করেছে এবং ঘটনার সময়, তারিখ, স্থান, আসামী ও সহযোগী আসামীদের পরিচয়, নাম, ঠিকানা যতটুকু সম্ভব ।

আমাদের দেশে রয়েছে অনলাইন জিডির ব্যবস্থা । অনলাইনে জি.ডি করতে হলে ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের ওয়েবসাইট www.dmp.gov.bd বা www.cmp.gov.bd এ প্রবেশ করলে Citizen Help Request নামে একটি লিংক পাওয়া যাবে । লিংকটিতে ক্লিক করে অনলাইনে জিডি সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করার তালিকা আসবে ।  যে ধরনের তথ্য দিয়ে জিডি করতে চান তা নির্বাচন করতে হবে ।  এবার তথ্য পূরণ করার খালি বক্স আসবে । তথ্যাবলী যথাযথভাবে পূরণ করে সাবমিট করলে সংশ্লিষ্ট থানায় আপনার তথ্যটি পৌঁছে যাবে ।  আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি শনাক্তকরণ নাম্বার পাবেন । নাম্বারটি সংগ্রহ করুন । চাইলে আপনার কোনো মতামত নিয়ে সরাসরি পুলিশের www.police.gov.bd ঠিকানায় মেইলও পাঠাতে পারবেন । পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করায় ভুক্তভোগীরা ফোন করছে । এমনতাবস্থায় ছুটির মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে হটলাইন ১০৯ ও পুলিশি সহায়তার জন্য ৯৯৯ আরও বেশি কার্যকর করতে হবে এবং ইমেইল এর মাধ্যমে জি.ডি করার পাশাপাশি মোবাইল এ্যাপসের মাধ্যমে সরাসরি জিডি বা ভার্চুয়াল জি.ডি করার নিয়ম চালু করতে হবে । এতে করে অপরাধীদের মধ্যে যেমন ভয়ভীতি কাজ করবে তেমনি প্রশাসনও সরাসরি এক্যাশন নিতে বাধ্য থাকবেন ।

তাছাড়া মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদের গৃহ নির্যাতন রোধে কার্যক্রম বাড়াতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়ে কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে । পাশাপাশি, সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারীরা যাতে আশ্রয় পেতে পারেন সেই ব্যবস্থা করা, করোনা পরিস্থিতিতে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল ‘ভার্চুয়াল কোর্ট অর্ডিন্যান্স’ এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ চলমান রাখতে হবে । কখনো মনোবল হারানো যাবে না, সচেতনতা ও সাহস নিয়ে মোকাবেলা করলে অপরাধী অবশ্যই শাস্তি পাবে ।

লেখকঃ আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার সুশাসনকর্মী