সাড়ে চার দশক আগে কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার দিনটি নানা কর্মসূচির মধ্যে স্মরণ করছে বাংলাদেশ।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ৩ নভেম্বর তার ঘনিষ্ঠ চার সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে কারাগারে হত্যা করা হয়।
রাষ্ট্রের হেফাজতে হত্যাকাণ্ডের এই ঘটনাটি ‘জেল হত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে বাংলাদেশে।
দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার সকাল ৭টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
তিনি প্রথমে সরকারপ্রধান হিসাবে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে ফুল দেন। এসময় তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসাবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
পরে চৌদ্দ দলীয় জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে জোটের নেতারা এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, “সবচেয়ে কলঙ্কজনক রক্তাক্ত দুটি ঘটনা, পঁচাত্তরের পনেরই অগাস্টের পর তেশরা নভেম্বর। পনেরই অগাস্ট ও তেশরা নভেম্বর একই সূত্রে গাথা, একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা।
“বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশুন্য করে দেওয়ার জন্য কারা অভ্যান্তরে আমাদের জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির চারজন সংগঠককে সৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।”
কাদের বলেন, “আজকে যারা খুনি, তাদের অনেকেরই দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। যাদের দণ্ড কার্যকর হয়নি। যারা বিদেশে পলাতক, তাদেরকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য জোরদার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে এবং এই কূটনৈতিক প্রয়াস সামনের দিনগুলোতে অরও বাড়বে।“
৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের ‘সুবিধাভোগীদের’ বিষয়ে কমিশন গঠনের অগ্রগতি জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, “সেটি এখনো সরকারের আলাপ আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”
তিনি বলেন, “আজকে আমাদের শপথ হবে, শহীদদের স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, জাতীয় চার নেতার যে স্বপ্ন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমরা ও আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলব। এটাই আজকে আমাদের অঙ্গীকার।”
দিনের কর্মসূচির শুরুতে সকাল ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়; উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা।
সকাল ৮টায় বনানী কবরস্থানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও এম মনসুর আলী এবং একই সময়ে রাজশাহীতে কামরুজ্জামানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আওয়ামী লীগে নেতারা।
বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, “বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা হাজার বছরেও কাটিয়ে ওঠার মত নয়। এই রাজনৈতিক শূন্যতা অপূরণীয় ক্ষতি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার হয়েছে।”
তিনি বলেন, “দেশবিরোধী শক্তি এখনও রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই এই সকল চক্রান্ত মোকাবিলা করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।”
বিকালে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জেল হত্যা দিবসের আলোচনা সভা হবে।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতকারী সেনাসমর্থিত চক্রান্তকারীরাই কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করেছিল। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে বিরল।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তার ঘনিষ্ঠ চার নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্যু-পাল্টা ক্যু’র ধূম্রজালের মধ্যে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় জেল হত্যাকাণ্ড।
জেলহত্যার পর ২১ বছর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জেলহত্যা মামলা পুনরুজ্জীবিত করে।
১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর এ মামলায় আসামি সৈয়দ ফারুক রহমানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তারপর বিচারিক আদালতে রায় হয়।
তবে শুধু সেনাসদস্য মোসলেউদ্দিনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাই কোর্ট আপিলের রায় দেয়। ওই রায়ে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য দুই আসামি মারফত আলী এবং আবুল হোসেন মৃধাকে খালাস দেওয়া হয়।
নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, একেএম মহিউদ্দিন আহাম্মদকেও খালাস দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের সুদীর্ঘ ২৯ বছর পর এর বিচারের রায় হলেও জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যরা এ রায়কে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রহসনের রায়’ আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের অভিযোগ, জেলহত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়নি।
আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হাই কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করা হয়।
কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যামামলায় হাই কোর্টের রায়ে বাদ পড়লেও ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল আপিল বিভাগ দফাদার মারফত আলী শাহ ও এল ডি দফাদার আবুল হাসেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেয়।
কাকতালীয়ভাবে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে এই চার নেতা হত্যা মামলার চূড়ান্ত আইনি লড়াইয়ের শুনানি শেষ হয়। ১৯৭১ সালের ওই দিনে এই চার নেতার নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে শপথ নিয়েছিল স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার।








