সিপ্লাস ডেক্স: সাতক্ষীরার কলারোয়া ও ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে মিলেছে দুই পরিবারের সাত সদস্যের লাশ। কলারোয়ার ঘটনায় স্বামী-স্ত্রীসহ পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে রাণীশংকৈলের ঘটনায় মা ও দুই সন্তানের লাশ ডোবা থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য সাতজনের লাশ সাতক্ষীরা ও ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। দুটি ঘটনারই রহস্য এখনো ভেদ করতে পারেনি পুলিশ।
সাতক্ষীরার কলারোয়ার হেলাতলা ইউনিয়নের খলশী গ্রামবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ চারজনের গলা কাটা লাশ গতকাল ভোরে উদ্ধার করে। তারা হলো খলশী গ্রামের শাজাহান আলীর ছেলে মাছ ব্যবসায়ী মো. শাহীনুর রহমান (৩৯), তাঁর স্ত্রী সাবিনা খাতুন (৩৩), ছেলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম হোসেন মাহী (১১) ও মেয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তাসলিম সুলতানা (১০)। দুর্বৃত্তরা ওই পরিবারের পাঁচ মাসের শিশু মারিয়াকে হত্যা না করে ফেলে রেখে যায়।
লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিকারী কলারোয়া থানার এসআই ইস্রাফিল জানান, শাহীনুরের হাত-পা বেঁধে ঘরের খাটের ওপর হত্যা করা হয়। তাঁর পায়ের রগ কাটা ছিল। মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে। শাহীনুরের স্ত্রী ও সন্তানদের লাশ পাশের কক্ষে পাওয়া যায়। তাঁদের সবার ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলার শ্বাসনালি কাটা হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসার পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য সবার লাশ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
মাছ ব্যবসায়ী শাহীনুরের ছোট ভাই রায়হানুল ইসলাম জানান, তাঁরা তিন ভাই, এক বোন। মেজ ভাই মালয়েশিয়া প্রবাসী; তাঁর স্ত্রী বাবার বাড়িতে থাকেন। বড় ভাই শাহীনুর তিন সন্তান নিয়ে একতলা পাকা বাড়িতে বাস করতেন। রায়হান বড় ভাইয়ের বাড়ি থেকে ২০ হাত দূরের একটি বাড়িতে একা থাকেন।
রায়হানুল আরো জানান, গত বুধবার শাহীনুরের মা শাহিদা বেগম বোনের বাড়ি কেশবপুরের বরনডালী গ্রামে বেড়াতে যান। রাতের খাবার শেষে বড় ভাই পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরে বড় ভাইয়ের পাঁচ মাসের মেয়ে মারিয়া চিৎকার করে কান্না শুরু করলে তিনি ঘরের ভেতরে যান। এ সময় সাড়াশব্দ না পেয়ে সিঁড়িঘরের ওপর দিয়ে বাসার ভেতরে ঢুকে মারিয়া ছাড়া সবার লাশ দেখে তিনি চিৎকার শুরু করেন। এ সময় প্রতিবেশীরা এসে পুলিশে খবর দেয়। রায়হানুল জানান, ২২ বছর ধরে কোটি টাকা দামের সাড়ে ১৬ শতক জমি নিয়ে প্রতিবেশী ওয়াজেদ কারিগরের ছেলে আকবরের সঙ্গে মামলা চলছিল। এই জমির বিরোধের জের ধরে এই হত্যাযজ্ঞ হতে পারে বলে তাঁর ধারণা।
শাহীনুরের মা শাহিদা খাতুন বলেন, ‘আমি বাড়িতে থাকলে আমাকেও হয়তো খুন হতে হতো। আমার ছেলে, বৌমা হত্যাকারীদের চিনতে পারায় একে একে সবাইকে জবাই করা হয়েছে।’ তিনি এই নৃশংস হত্যার বিচার দাবি করেন।
শাহীনুরের বোন আছিয়া খাতুন জানান, শাহীনুর নিজস্ব সাত-আট বিঘা জমিতে পাঙ্গাশ মাছ চাষ করে সংসার চালাচ্ছিলেন। তাঁদের বাবা মৃত শাজাহান আলী কলারোয়ার দামোদরকাটী গ্রামের নূর আলীর ছেলে আকবর হোসেনের কাছ থেকে ৩৪ শতক জমি কেনেন। ওই জমি নিয়েই ঝামেলা চলছিল। এ নিয়ে কলারোয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দপ্তরে এই মাসে সালিস হওয়ার কথা ছিল।
স্থানীয় ইউপি সদস্য নাসিমা খাতুন জানান, শাহীনুর ও রায়হানুলের মধ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে মিল ছিল। জমি ছাড়া আর কারোর সঙ্গে বিরোধ ছিল না।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, শাহীনুরের ছোট ভাই রায়হানুল চার বছর আগে ফাইমা খাতুন নামের একজনের সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে করেন। এই বিয়ে নিয়ে বড় ভাই শাহীনুরের সঙ্গে ছোট ভাইয়ের ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে পাঁচ মাস আগে রায়হানুল ফাইমাকে তালাক দেন। ফাইমা এটা মানতে না পেরে রায়হানুলের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখেন। রায়হান তাঁকে ফের বিয়ে করতে চাইলে ভাই ও ভাবিদের সঙ্গে তাঁর অশান্তি দেখা দেয়। এর মধ্যে রায়হানুল মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। তাঁর নামে কলারোয়া থানায় একাধিক মাদক মামলাও রয়েছে। এ হত্যার পেছনে এসব কারণও থাকতে পারে।
কলারোয়া থানার ওসি (চলতি দায়িত্ব) হারান চন্দ্র পাল বলেন, ঘটনাস্থল থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন, গোয়েন্দা পুলিশ, ডিএসবি, র্যাব এবং অন্যান্য গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছেন।
ওসি আরো বলেন, হত্যার প্রাথমিক কারণ জানা যায়নি। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে হত্যা রহস্য উদঘাটনে পুলিশসহ গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক দল কাজ শুরু করেছে।
এদিকে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলের ধর্মগড় ইউনিয়নের ভরনিয়া শিয়ালডাঙ্গী গ্রামে মাসহ দুই সন্তানের লাশ গতকাল ভোরে উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁরা হলেন শিয়ালডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা আকবর আলীর স্ত্রী আরিদা খাতুন (৩২), মেয়ে আকলিমা আক্তার আঁখি (১০) ও ছেলে আরাফাত (৪)। আরিদার স্বামী আকবর আলী জানান, গত বুধবার রাতে স্ত্রী আরিদার সঙ্গে ঋণের টাকা নিয়ে ঝগড়া ও কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় আরিদা অভিমান করে বলেন, তাঁর সংসার করবেন না। এরপর রাতের খাওয়া সেরে সবাই ঘুমিয়ে পড়েন। ভোরে আকবর ঘুম থেকে উঠে দেখেন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান ঘরে নেই। এ সময় তিনি বাড়ির আশপাশে ও গ্রামে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও না পেয়ে স্ত্রী আরিদার বাপের বাড়িতে যোগাযোগ করেন। সেখানেও না পেয়ে পরে সকালে বাড়ির পাশে একটি ডোবায় স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।
ধর্মগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, একই সঙ্গে তিনজনের লাশ ডোবায় পাওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক।
সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার তোফাজ্জল হোসেন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনের লাশ উদ্ধার করে। মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সবার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

