করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় বিশ্বের হিমশিম খাওয়ার মধ্যে বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একথা বলেন শেখ হাসিনা।
নভেল করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেওয়ার পর বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে অতি সংক্রামক এই ব্যাধি বাংলাদেশে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে কী পরিণতি ঘটবে- তা নিয়ে সবার মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ-আতঙ্ক।
জনসমাগমে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে বলে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, সড়ক, নৌ ও আকাশপথে সব ধরনের যোগাযোগও বন্ধের ঘোষণা এসেছে।
কার্যত অবরুদ্ধ দশার মধ্যে বাজারে অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাজারে কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। দেশের অভ্যন্তরে এবং বাইরের সঙ্গে সরবরাহ চেইন অটুট রয়েছে।
“অযৌক্তিকভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করবেন না। জনগণের দুর্ভোগ বাড়াবেন না। সর্বত্র বাজার মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।”
পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্যকর্মীসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীরও কাজ করে যাওয়ার কথা বলেন তিনি।
শেখ হাসিনা গুজব রটনাকারীদের সতর্ক করে বলেন, “কেউ গুজব ছড়াবেন না। গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এই সঙ্কটময় সময় মোকাবেলায় সবাইকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
“আতঙ্ক মানুষের যৌক্তিক চিন্তাভাবনার বিলোপ ঘটায়। সব সময় খেয়াল রাখুন আপনি, আপনার পরিবারের সদস্যগণ এবং আপনার প্রতিবেশীরা যেন সংক্রমিত না হন। আপনার সচেতনতা আপনাকে, আপনার পরিবারকে এবং সর্বোপরি দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রাখবে।”
তিনি আরো বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীর প্রতিঘাত মোকাবেলায় দেশের রপ্তানিমুখী খাতের শ্রমিকদের বেতন দিতে ৫ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরাই এই প্যাকেজের সুবিধা পাবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, “করোনাভাইরাসের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদের তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।”
“আমাদের শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানি বাণিজ্যে আঘাত আসতে পারে। এই আঘাত মোকাবেলায় আমরা কিছু আপৎকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।”
তিনি বলেন, “রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছি। এ তহবিলের অর্থ দ্বারা কেবল শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা যাবে।”
নভেল করোনাভাইরাসে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিই এখন বিপর্যস্ত; যার প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি শূন্যে নেমে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এখাতের উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে।
এই খাতের মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১৮ মার্চ পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে আয় করেছিল, তা এই বছরের মার্চে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে অধিকাংশ বিদেশি ক্রেতা পোশাক নিচ্ছে না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিএমইএ সভাপতি সভাপতি রুবানা হক দুদিন আগেই বলছিলেন, “প্রতি মিনিটে-ঘণ্টায় পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। এমন দুর্দিন আগে কখনও আসেনি। দিশেহারা হয়ে পড়েছেন পোশাক শিল্প মালিকরা।”
শিল্পোদ্যোক্তার জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ব্যবসায়-বান্ধব বেশকিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী জুন মাস পর্যন্ত কোন গ্রাহককে ঋণ খেলাপি না করার ঘোষণা দিয়েছে।
“রপ্তানি আয় আদায়ের সময়সীমা ২ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে। একইভাবে আমদানি ব্যয় মেটানোর সময়সীমা ৪ মাস থেকে বৃদ্ধি করে ৬ মাস করা হয়েছে।”
এছাড়া সাধারণ মানুষের সুবিধায় মোবাইলে ব্যাংকিংয়ে আর্থিক লেনদেনের সীমা বাড়ানো; বিদ্যুৎ, পানি এবং গ্যাস বিল পরিশোধের সময়সীমা সারচার্জ বা জরিমানা ছাড়া জুন মাস পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
এনজিওগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধ সাময়িক স্থগিত করার কথাও তিনি বলেন।