সিপ্লাস প্রতিবেদক: আমদানি নীতি লঙ্ঘন করে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করায় আরো দুই প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। সাত দিনের মধ্যে জবাব না দিলে তাদের বিরুদ্ধে নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছে কাস্টমস। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দুটি হচ্ছে চট্টগ্রামের জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্স এবং হাসান কনস্ট্রাকশন। একে একে তিনটি সরকারি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা হয়েছিল। এর মধ্যে দুটিতে মান উত্তীর্ণ হয়নি। এই কারণে এই বড় দুই আমাদানিকারকের বিরুদ্ধে গত ২৩ সেপ্টেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়।
এর আগে আরেক আমদানিকারক ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডকে ৫০ লাখ টাকা শুল্কসহ জরিমানা করেছিল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, মান সনদ জালিয়াতি করে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করে বৈধভাবে ছাড়ের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে। এ ছাড়া জাল সনদ তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সানশাইন এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে কাস্টমস। এখন আরো দুই আমদানিকারকের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে কাস্টমস।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, ‘নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করে ছাড় করার সুযোগ এখন নেই। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি সরকারি নির্দেশনা মেনে গুণগত মান নিশ্চিত করে বিটুমিন ছাড় দিতে। এখানে ল্যাব পরীক্ষায় যারা গুণগত মান নিশ্চিত করেছে শুধু তারাই ছাড় পেয়েছে।’
হাসান কনস্ট্রাকশন গত জুলাই মাসে প্রায় ১০ লাখ কেজি বিটুমিন আমদানি করে। কাস্টমসে বিল অব এন্ট্রি জমার পর গুণগত মান পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয় ইষ্টার্ন রিফাইনারিতে। পরীক্ষায় নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। পরে আমদানিকারক নমুনা বিএসটিআইয়ে পাঠালে পজিটিভ রিপোর্ট আসে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবার নমুনা বুয়েটে পাঠালে নেগেটিভ রিপোর্ট আসে, অর্থাৎ মান উত্তীর্ণ হয়নি। ফলে চালানটি আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং ২৩ সেপ্টেম্বর ওই প্রতিষ্ঠান ও তাদের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ওয়ারিশা এন্টারপ্রাইজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়।
বিটুমিনের আরেক বড় আমদানিকারক জিপিএইচ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্স গত জুলাই মাসে দুই লাখ ৩৮ হাজার কেজির একটি চালান চট্টগ্রাম বন্দরে আনে। এখানেও প্রথম নমুনা ইষ্টার্ন রিফাইনারিতে ‘নিম্নমান’ বলে সনদ পায়। এরপর বিএসটিআইয়ে নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠালে রিপোর্ট ভালো আসে। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় বুয়েটে নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠায় কাস্টমস। সেই পরীক্ষায় নিম্নমান বলে সনদ দেওয়া হয়। এরপরই চালানটির খালাস আটকে যায়। এই অবস্থায় আমদানিকারক চালানটি খালাসে নতুন কৌশল খুঁজতে থাকে এবং উচ্চ আদালতে রিট করে। কিন্তু রায় তাদের পক্ষে আসেনি। পরে চালানটি আটক করে কাস্টমস। এবার নিয়মানুযায়ী তাদের এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চৌধুরী সিন্ডিকেটকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলো।
জানা গেছে, জুলাইয়ের পর আরো অন্তত পাঁচটি বিটুমিনের চালান এনেছে জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্স। ইষ্টার্ন রিফাইনারির ল্যাবে পরীক্ষায় সবগুলোতেই নেগেটিভ অর্থাৎ মান উত্তীর্ণ নয় রিপোর্ট এসেছে। সর্বশেষ ২২ সেপ্টেম্বরের চালানের নমুনা পরীক্ষায়ও নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার উত্তম চাকমা বলেন, ‘আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী, নিম্নমানের পণ্য আমদানিযোগ্য নয়। এ ক্ষেত্রে তারা আমদানি নীতি আদেশ লঙ্ঘন করেছে। কাস্টমস আইন অনুযায়ী যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই নীতি লঙ্ঘনের কারণে কেন আমদানিকারকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে সেটি জানাতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
জানা গেছে, জুন মাসে নিম্নমানের ৫০ কনটেইনার বিটুমিন এনে ঢাকার আমদানিকারক ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। ইষ্টার্ন রিফাইনারির পরীক্ষায় মান উত্তীর্ণ না হলেও রিপোর্ট জালিয়াতি করে ‘পজিটিভ রিপোর্ট’ কাস্টমসে জমা দেয়। ছাড়িয়ে নেয় ৯ কনটেইনার বিটুমিনের চালানও। পরে জানতে পেরে চালানটির খালাস আটকে দেয় কাস্টমস। একই সঙ্গে ছাড় নেওয়া বিটুমিনের চালানও ফিরিয়ে আনে। এ ঘটনায় আগস্ট মাসে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সানশাইন এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। আমদানিকারক ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড অনিয়মের দায় স্বীকার করায় ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সেই জরিমানাও এরই মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।
দেশে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে করে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছিল সরকারের। সর্বশেষ গত ২৫ মে বিটুমিনের মান নিশ্চিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তিনটি নির্ধারিত ল্যাবে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে। এর পর থেকেই মূলত নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির চক্রটি বিপাকে পড়ে। মান যাচাই বাধ্যতামূলক করার পর জুন মাসেই প্রথম কোনো চালান ধরা পড়ল কাস্টমসের হাতে।
জানা গেছে, ইষ্টার্ন রিফাইনারি ও বুয়েট এই ধরনের ল্যাব পরীক্ষায় অভিজ্ঞ। কিন্তু বিএসটিআইয়ের এই ধরনের মান পরীক্ষার কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। ফলে দেখা গেছে, ইষ্টার্ন রিফাইনারিতে নেগেটিভ রিপোর্ট এলেও বিএসটিআই থেকে পজিটিভ রিপোর্ট বেরোচ্ছে।

