এহসান আল কুতুবী, কক্সবাজার: সাইফুল ইসলাম। ১২ বছর ধরে থাকেন সৌদি আরবে। প্রায় ১৬ বছর আগে বিয়ে করেন আমেনা বেগমকে। আমেনার ঘরে এক ছেলে ও মেয়ে নিয়ে বেশ সুখের সংসার চলে আসছিলো তার। প্রবাস থেকে টাকা পাঠাতেন স্ত্রী সন্তানদের কাছে। ছেলে মেয়েরাও লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলো ঠিকভাবে। এমন সুখের সংসারে আগুন লেগে সব তছনছ হবে কে জানতো।
ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের নাদের পাড়া গ্রামে। আজ থেকে প্রায় দু বছরের বেশি সময় ধরে প্রবাস থেকে স্ত্রী সন্তানদের খোঁজ খবর নেন না সাইফুল ইসলাম। দিতেন না ভরনপোষণও। কোনোভাবেই তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি স্ত্রী সন্তানেরা। যে বাবার মায়া মমতায় সন্তানেরা হাসিমুখে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলো। এমন বাবা সব মায়া মমতা ত্যাগ করবে তা কল্পনায়ও ছিলোনা তাদের। কিন্তু তাদের এমন পরিস্থিতিতেই পড়তে হলো।
দেড় বছর আগে তাদের মা আমেনা বেগম জানতে পারলেন, তার স্বামী সাইফুল ইসলাম সেলিনা বেগম নামে বিবাহিত এক মেয়ের সাথে পরকিয়ায় লিপ্ত। যার ঘরে চারটি কন্যা সন্তানও রয়েছে। এমন খবর যেনো তাতে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।
অসহায় মা আমেনা বেগম স্বামীর এমন পাষণ্ডতার পরেও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে ও পড়ালেখার খরচ যোগাতে ছুটেছেন হন্যে হয়ে। কখনো চেয়ারম্যান বা মেম্বার অথবা সমাজের বিত্তবানদের দুয়ারে। পরে স্থানীয় মেম্বার ও সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তিদের পরামর্শে স্বামীর এক খন্ড জমি বিক্রি করে কোনো রকমে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাচ্ছিলো।
৩ মাস আগে বাংলাদেশে আসেন স্বামী সাইফুল ইসলাম। দেশে এসেও থাকতেন না ঘরে। এরইমধ্যে সবার অজান্তে খোশমেজাজে বিয়ের পিড়িতে বসেন পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়া সেলিনা বেগমের সাথে। বিয়ের পর কিছুদিন চট্টগ্রাম ও পরে সদর উপজেলার হালিরছড়ায় থাকতেন বাসা ভাড়া নিয়ে। মাঝেমধ্যে স্ত্রী আমেনা বেগমের ঘরে গেলেও কথা বলতেন না কারো সাথে।
এরইমধ্যে ২৪ মে সোমবার ঘটে গেলো তুলকালাম কাণ্ড। পরকিয়ায় বিয়ে করা নতুন স্ত্রীকে ঘরে তুলতে রাত নয়টায় স্ত্রী ও সন্তানদের মারধর করে বের করে দেন ঘর থেকে। প্রতিবাদ করতে গেলে স্বামী ও নতুন স্ত্রী সেলিনা জুতা ও কিল-ঘুষি মারেন আমেনা বেগমকে। রেহাই পায়নি দশম শ্রেণী পড়ুয়া নাসরিন সোলতানা ও তার ছোট ভাই নিরফাতুল ইসলামও।
ঘরের বাইরের গেইট বন্ধ থাকায় তারা সারারাত কাটিয়েছেন ওখানেই, জানিয়েছেন আমেনা বেগম।
বিষয়টি জানাজানি হলে মঙ্গলবার (২৫ মে) দুপুরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, অপ্রতিরোধ্য নেত্রী নাজনীন সরওয়ার কাবেরী। এ সময় তার সাথে ছিলেন স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিগন। প্রায় আড়াইঘন্টা তর্কাতর্কীর পর সাইফুলের নতুন স্ত্রীকে অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত দেন সমাজের মুরব্বিরা।
বিষয়টি পুরোপুরি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাকে এই ঘরে না তুলতে সাইফুলকে কড়া নির্দেশনাও দেওয়া হয়। একইসাথে স্ত্রী আমেনা বেগম ও তার সন্তানদের ঘরে ঢুকিয়ে দেন তারা।
স্থানীয়রা মুরব্বিরা জানান, সাইফুল ইসলামের পরকিয়ার বিষয়টি তারা জানার পর অনেক চেষ্টা করেও তাকে ফেরাতে পারেনি। এমনকি কোনো উপায়ন্তর না দেখে সাইফুল ইসলামকে সেলিনার সাথে সামাজিকভাবে বিবাহবন্ধনের পরামর্শ দেন তারা। কিন্তু, সাইফুল ইসলাম তাদের কথায় কোনো কর্ণপাত করেনি। পরকিয়ায় পড়া সেলিনার আগের ঘরে চারটি কন্যা সন্তান থাকলেও সে অবাধ্য হয়ে তাকে বিয়ে করে।
মেয়ে নাসরিন সোলতানা জানান, তার বাবা সাইফুল ইসলাম এমন পাষণ্ড হয়ে উঠবে ভাবতেও দু চোখ ভিজে যায়। বিদেশে থাকতে প্রতি মূহুর্তে খবরাখবর নিতেন। খাওয়া দাওয়াসহ সব বিষয়ে খোঁজ নিতেন। তার বাবার এমন কাণ্ডে তার পড়ালেখা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
কোথায় গেলো মায়া মমতা, স্নেহ আদর, এমন প্রশ্ন অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া নিরফাতুল ইসলামের। তারা ভাইবোন অঝোর ধারায় কান্না করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন।
তবে, উল্টো স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেন স্বামী সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, বিদেশে থাকা অবস্থায় স্ত্রী আমেনা বেগম তাকে না জানিয়ে তার এক খণ্ড জমি বিক্রি করে ফেলেছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে অন্য মেয়ের সাথে পরকিয়া করার অভিযোগ তুলে অনেক গালাগাল করে আমেনা।
সেলিনার সাথে তার পরকিয়ার খবর পেয়ে সেলিনার শ্বশুরবাড়ি ও স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারদের স্ত্রী আমেনা বারবার বিরক্ত করার কারনে সেলিনাকে তার স্বামী বাধ্য হয়ে তালাক দিয়ে দেয়। আর সে কারনেই বাধ্য হয়ে সেলিনাকে বিয়ে করতে হয়েছে, জানান সাইফুল।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জানান, সাইফুলের স্ত্রী আমেনা বেগমের অসহায়ত্ব জানার স্থানীয় চেয়ারম্যান প্রিন্স ও তিনি নিজেই সরকারি বরাদ্দ থেকে আমেনাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে আসছে। এত সুন্দর একটা সংসার ফেলে পরকিয়ায় চার কন্যা সন্তানের জননীকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে কেউ ভাবতে পারেন নি।
নারীনেত্রী নাজনীন সরওয়ার কাবেরী জানান, সাইফুলের পরকিয়ার বিষয়টি তাকে আমেনা বেগম জানিয়েছিলেন। তিনি সাইফুলকে ওই মেয়ের সাথে পরকিয়া না করতে বুঝানোর চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু, সাইফুল তাঁর কথায় কর্ণপাত করেননি।
তিনি আরো জানান, সমাজে নারী নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এসবের বিরুদ্ধে সমাজের সচেতন মানুষকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানিয়েছেন রামু থানার ওসি (তদন্ত) অরুপ কুমার চৌধুরী।








