মোহাম্মদ ইলিয়াছ, লামা (বান্দরবান): কৃষিজীবি বাবা একমাত্র ছেলে অংছিং মারমা। পড়াশুনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় কোন প্রতিকুলতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বান্দরবান জেলার লামা উপজেলাধীন ৩ নং ফাঁসিয়াখালি ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ত্রিশ ডেবা পাড়ার এক আদিবাসী পরিবারে জন্ম তার।
যেখানে না আছে ভালো যাতায়ত ব্যবস্থা, না আছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও মোবাইল নেটওয়ার্ক। মোবাইলে কথা বলতে হলে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ইয়াংছা বাজারে আসতে হয়। ১৫ কি.মি পায়ে হেঁটে, খেয়ে না খেয়ে পড়ালেখা করে ৩৮তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডার হিসেবে উত্তীর্ণ হন তিনি।
বর্তমানে ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত।
দুপাশে দূর্গম পাহাড় মধ্যখানে সরু পথ। দিনের বেলায়ও এই পথ দিয়ে হাঁটলে ভয়ে গা ঝিন ঝিন করে। পথটি আঁকাবাঁকা ইয়াংছা খালের পাড় ঘেষেও কিছুদূর এগিয়েছে। তার ওপর পুরা পথটি কাঁচা, বর্ষাকালে তো কথায় নেই। হাঁটু পরিমান কাঁদা নিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে কোন মতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোয় অংছিং মারমা। প্রাথমিকের পর যাতায়ত ব্যবস্থা সমস্যা এবং আর্থিক সমস্যার কারনে পড়াশুনা বন্ধ হতেও চলছিল তার।
কিন্তু অদম্য আগ্রহ ও চেস্টা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তার পাড়া থেকে যাতায়ত সমস্যা হওয়ায় বিভিন্ন পরিবারে কিংবা হোস্টেলে খোরাকি দিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে এসএসসি ও এইসএসসি পাশ করে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে। অংছিং মারমার ভাষ্যমতে, প্রায় ৭০টি পরিবার বসবাস করে এই গ্রামটিতে।
ছাত্রজীবনে পাড়ার মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া ভালভাবে বাংলাভাষায় কথাও বলতে পারতো না ঐলাকার লোকজন। বলতে গেলে আধুনিকতার ছোঁয়া কি সেটা তারা জানতো না। এই পরিবেশ থেকে উঠে আসা তার পক্ষে এক প্রকার অসম্ভব থাকলেও কঠোর সাধনার কারনে আজ এতোদূর আসা।
অংছিং মারমা বলেন, ‘যে দিন ৩৮তম বিসিএসের ফলাফল প্রকাশিত হয় তখন আমি গ্রামে ছিলাম। যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না। ফলাফল কীভাবে দেখবো তাও বুঝতে পারছিলাম না। পরে রাতে অদূরে এক পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ফলাফল দেখি এবং আমার পেইজবুক টাইমলাইনে স্ট্যাটাস পোস্ট করি।’
অংছিং মারমা যেখানে শিক্ষার অভাবে গ্রামটি কুসংস্কারপূর্ণ ছিলো, সুযোগ ও সক্ষমতার অভাবে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারতো না, সেখানে তার প্রচেষ্টায় বর্তমানে সব কুসংস্কার দূর করে ফ্রি কোচিং হোম চালুর মাধ্যমে গ্রামের ছেলেমেয়েদেরকে শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে এবং সামাজিক সচেতনতা মূলক বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে মদ ও জোয়ার আসর বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে তার প্রচেষ্টায় পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী বাবু বীর বাহাদুরের মাধ্যমে ঐ এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে এবং শতভাগ ছেলেমেয়েরা বিদ্যায়লে পড়াশুনায় আছে। রাস্তার কাজ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।








