নিউজটি শেয়ার করুন

প্রধান শিক্ষিকার স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম: অভিভাবকদের হাজারো অভিযোগে বিব্রত ম্যানেজিং কমিটি

হাটহাজারী উপজেলার ছিপাতলী ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে কোচিং বাণিজ্য পরিচালনা, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকে শিক্ষক হাজিরা খাতায় উপস্থিত স্বাক্ষর করা, কোচিং না করলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতায় নাম্বার কম দেয়া, শিক্ষার্থীদের কাছে ডায়েরি বিক্রি করে ডায়েরিতে দৈনিক নোট ও পরিক্ষার নম্বর না লিখা, শিশুদের দ্বারা স্কুল পরিষ্কার করা, ওয়াস রুম পরিষ্কার করা ও জাতীয় দিবসগুলো পালন না করা সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা যায়, আলী মুহাম্মদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফেরদৌসী বেগম বিগত ১০ বছর যাবৎ অত্র বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও আশানুরূপ শিক্ষার পরিবেশ পাচ্ছে না স্থানীয় দরিদ্র অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে টালবাহানা করে আসছেন বলে জানায় স্থানীয়রা।

এসময় তারা আরো জানায়, প্রধান শিক্ষিকা ফেরদৌসী বেগম প্রতিদিন সকাল ৯টায় বিদ্যালয়ে অবস্থান করার কথা থাকলেও বিদ্যালয়ে আসেন দুপুর ১১টার পর। বেশ কয়েকবার দুপুর ২টার দিকে চলে যেতে দেখলে প্রতিবেদক চলে যাওয়ার বিষয়টি জিজ্ঞাস করলে বলেন উপজেলায় মিটিং থাকে তাই চলে যেতে হয়। প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছে মাত্র ৩ জন। তার মধ্যে অন্য এক সহকারি শিক্ষিকাকে স্বামী বিদেশ ফেরত আসায় তাকে দীর্ঘদিন ছুটিতে রেখেছে অভিযুক্ত সেই প্রধান শিক্ষিকা। কোন মতে ২ জন শিক্ষক দিয়েই চলে পাঠদান। এতে সরকারি এ প্রতিষ্ঠান থেকে অভিভাবকরা মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানা গেছে। বিদ্যালয়ে কোচিং করানো নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও অন্য এক শিক্ষক প্রতিদিন সকাল ৮ থেকে জমজমাট ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে কোচিং ব্যবসা।

স্থানীয় এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলেন, বিদ্যালয় থেকে প্রদত্ত ডায়েরিতে কোন কিছু লিখে দেয়না শিক্ষকরা। এমনকি ডাইরিতে লেখা নাই প্রথম ও দ্বিতিয় সাময়িক পরিক্ষার ফলাফলও । বাচ্চাদের ভালো করে ক্লাসে পড়ায় না যার ফলে আমাদের শিশুদের দিতে হয় বাধ্য হয়ে কোচিং ক্লাসে। আমাদের শিশুদের দিয় স্কুল পরিষ্কার করায়, চা নাস্তা আনায়, বড় বড় পানির কলসি পুড়ায় । প্রধান শিক্ষিকার অনিয়মিত আসা যাওয়া? বিষয়টি স্কীকার কারে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, দূর থেকে আসি প্রতিদিন নিয়মিত গাড়ি পাইনা তাই আসতে দেরি হয়। অন্যদিতে স্কুলের বিভিন্ন কাজ থাকে উপজেলায় তাই তাড়াতাড়ি চলে যেতে হয়। স্কুল ডায়েরিতে কিছু লেখা হয় না কেন?

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, স্কুলে শিক্ষক সংকট। যার কারণে এত কাজ আমাদের দ্বারা করা সম্ভব হয়না। ‘‘তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা নিজের ডায়েরিতে নিজেরা লিখতে পারে’’ জানতে চাইলে শিক্ষকরা কোন সঠিক উত্তর দিতে পারে নি। ডায়েরিতে মার্সসীট লেখা নাই কেন? প্রধান শিক্ষিকা বলেন, আমরা মার্কসীট আলাদা করে দিয়ে থাকি। চাইলে দেখাতে পারবো। বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দূরীকরণে আপনাদের ভূমিকা কি ছিলো? আমরা প্রতিবার উপজেলায় জানায় কিন্তু জাতীয় ভাবে শিক্ষক সংকট থাকায় তারাও আমাদের শিক্ষক কি করে দিবে। ‘‘স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সহায়তা চেয়েছেন কিনা? না কখনো তাদের জানানো হয়নি। পরে তাদের জানাবো কি করে এ সংকট দূর করা যায়। বিদ্যালয়ে শিক্ষকগণ অনিয়মিত উপস্থিত থাকেন? এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষিকা বলেন, আজ আমরা তিন জন আছিতো এভাবে প্রতিদিন থাকি। শিক্ষকদের উপস্থিত খাতা দেখতে চাইলে তিনি বলেন আমি খাতা দেখাবনা। আমরা আমাদের মত উপস্থিত থাকি। বিদ্যালয়ে কোচিং করানো নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও কোচিং হয় কি করে?

এ বিষয়ে সহকারি শিক্ষক মোঃ নোমান বলেন, এগুলো আমরা ছাত্রছাত্রীদের এক্সট্রা কেয়ার করি। ‘‘বিনিময়ে টাকা পয়সা নেন কিন?’’ কিছু টাকা পয়সাতো নিতে হবে। আমরা তাদের পিছনে শ্রম দিচ্ছিনা। ‘‘তাহলে এটা কোচিং পর্যায়ে পড়ে কিনা?’’ তারা আর কোন কথা বলেননি।

ক্লাস চলাকালিন সময়ে শ্রেণি কক্ষে ঘুমানো এক শিক্ষিকার কথা জানতে চাইল: প্রধান শিক্ষিকা বলেন, আমরা মানুষের তুলনায় কাজ বেশি। যার কারণে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়ে। হয়তো ক্লাসে একটু ঝিমিয়েছে আরকি। জাতীয় দিবস গুলো পালন করা হয় কিনা? জাতীয় দিবস গুলো আমরা আমরা শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটি মিলে পালন করি । কিস্তু ছাত্রছাত্রীদের আসতে বললেও তারা আসেনা।

ফলাফলের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষিকা বলেন শতভাগ পাশ এখনো আমরা আছি। বিগত বছরগুলোর ফলাফলের কোন ফলক আছে কিনা? না এ ধরনের কোন ফলক আমাদের নাই। অভিবাবকদের সাথে সমন্বয় কি করে করেন? একটি রেজিস্টার খাতা দেখান এটাতে সকল অভিভাবকদের নাম্বার আছে । কিন্তু খাতার উপর ২০১৮ ইং লেখা কেন? তিনি বলেন ২০১৯ ইং টা এখনো ধরতে পারিনাই ব্যস্ততার করণে। করে ফেলব কয়েকদিন পর। নানা অযুহাতে অনুপস্থিত থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বারোটা বাজাচ্ছেন তিনি। এ সময় বেশ কিছু অভিভাবক সহ স্থানীয় সচেতন মহল তার অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের সুনজর দানের দাবি জানান।

উপরোক্ত অনিয়ম ও অভিযোগের ব্যাপারে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে বলেন, বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষিকার বিভিন্ন অনিয়ম বিষয়ে জেনেছি। ঘটনা তদন্ত করে দোষী সাব্যস্থ হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হবে।