সিপ্লাস প্রতিবেদক: বাংলাদেশে এল পি জি সেক্টরে বিরাজমান অরাজকতা রোধে কয়েকটি প্রস্তাবনা রেখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বরাবর চিঠি দিয়েছে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি।
চিঠিতে খুচরা গ্যাস ও সিলিন্ডিার বিক্রয়ের উপর আরোপিত মূসক প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
গত ৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ডঃ তৌফিক–ই-ইলাহী চৌধুরী, বীর বিক্রম বরাবর এ চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ব্যবসাবান্ধব শিল্পনীতির আলোকে দেশে নিরাপদ জ্বালানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ৫৭ টি প্রতিষ্ঠানকে এল পি জি বাজারজাতকরণের লাইসেন্স প্রদান করে। ইতিমধ্যেই ২৭ টি প্রতিষ্ঠান এ খাতে প্রায় ১৫০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ফলে দেশে এল পি জি’র বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ২০০০০০ মে.টন এ উন্নীত হওয়ার পাশাপাশি লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
চেম্বারের কতিপয় সদস্য প্রতিষ্ঠান আমাদের অবহিত করেছেন, এল পি জি সিলিন্ডার উৎপাদন পর্যায়ে ৩০ জুন ভ্যাট অব্যাহতি প্রাপ্ত থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ পশ্চাৎ সংযোগ শিল্প হিসেবে দেশে প্রায় ২০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে ১৪ টি আন্তর্জাতিকমানের এল পি জি সিলিন্ডার উৎপাদনকারী কারখানা স্থাপন করেছে।
এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে।
কিন্তু ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এ খাতে উৎপাদন পর্যায়ে ৫% মূসক আরোপ করে আমদানি পর্যায়ে তা কমিয়ে আনা হয়। এতে দেশে উৎপাদিত সিলিন্ডারের মূল্য আমদানিকৃত সিলিন্ডারের চেয়ে বেশি হয়ে পড়ায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ অস্তিত্ব সংকটে পরেছে।
উল্লেখ্য, এ খাতে ব্যবহৃত ৯৯% কাঁচামালই সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর এবং প্রতিটি পণ্যেই আমদানি পর্যায়ে বিভিন্ন হারে মূসক ও অন্যান্য শুল্ক পরিশোধ করতে হয়।
এল পি গ্যাসে খুচরা বিক্রয়ে ট্যারিফ ভ্যাট বাতিল করে বিগত অর্থবছরে বিক্রয়মূল্যের উপর ৫% ভ্যাট আরোপ করায় ভ্যাটের পরিমাণ এক লাফে প্রায় ৪/৫ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য হ্রাস – বৃদ্ধি, ভৌগলিক অবস্থান ভেদে পরিবহন ব্যয় ইত্যাদি কারনে এল পি গ্যাসের মূল্যের তারতম্য হয়। এতে এল পি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা সমন্বয়ে হিমশিম খেয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
বিগত ২০১৭ সালে ব্যবসায়ীদের মতামত সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে ‘এল পি গ্যাস অপারেশনাল ও লাইসেন্সিং নীতিমালা ২০১৭’ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় যাতে এল পি জি বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে এল পি গ্যাসের মজুদ ক্ষমতা ৫০০০ মে. টনে উন্নীত করার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়।
উচ্চ আদালত অসামঞ্জস্যতা দেখে এর উপর স্থগিতাদেশ প্রদান করলেও আদালতের স্থগিতাদেশকে পাশ কাটিয়ে চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা জারি করে মজুদ ক্ষমতা বৃদ্ধির অদ্ভুত শর্ত মানতে বাধ্য করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অবহিত করেছেন। জ্বালানির মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এহেন আচরণে অত্র চেম্বার বিস্মিত। নীতিমালায় বাস্তবতা বিবর্জিত এসব শর্ত জুড়ে দিয়ে জনগনের সম্পদের অপচয় ও দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলার বিষয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, অপারেটরগন এলপি গ্যাস ব্যবসা পরিচালনার জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি নিয়োগ করতে পারেন।
এক্ষেত্রে উভয় পক্ষকেই সংশ্লিষ্ট সংস্থা, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর হতে একই লাইসেন্স পৃথক ভাবে গ্রহন করতে হয় বলে যৌক্তিকভাবেই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো নিজস্ব ব্রান্ডের সাথে অপারেটর ব্রান্ড যুক্ত করে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে।
এল পি জি’র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিরাজমান অরাজকতা রোধে –
১. ‘এল পি অপারেশনাল ও লাইসেন্সিং নীতিমালা, ২০১৭’ এর পূর্বে স্থাপিত প্লান্টসমূহকে এর আওতায় না এনে চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান,২. ফ্র্যাঞ্চাইজি সমূহকে স্বীয় ব্রান্ডের পাশাপাশি অপারেটরের ব্রান্ড যুক্ত করে ব্যবসা পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয় হতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান।
৩. এলপিজি’র লাইসেন্স প্রদান/অনুমোদন, নবায়ন, তদারকিসহ এ সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়াদির নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়, BPC, BERC, বিস্ফোরক পরিদপ্তর ইত্যাদির পরিবর্তে সরাসরি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের উপর ন্যাস্ত করন।
৪. এল পি জি সিলিন্ডার বিক্রিয়, বিপনন ও হস্তান্তরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরকে ঢেলে সাজিয়ে আঞ্চলিক দপ্তরগুলোর লোকবল বৃদ্ধি ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা অতীব জরুরী।
৫. খুচরা গ্যাস বিক্রয়ের উপর আরোপিত ৫% মূসক রদ করে পুনরায় ট্যারিফ মূল্য চালু করন।
৬. সিলিন্ডার প্রস্তুতে ব্যবহৃত ৯৯% কাঁচামালই বিভিন্ন হারে শুল্ক ও মূসক প্রদান করে আমদানি করতে হয় বলে সিলিন্ডার বিক্রয়ের উপর নতুন করে আরোপিত ৫% হারে মূসক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা এবং প্রয়োজনীয় ইনসেন্টিভ প্রদান করে রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা।
৭. এই খাতে সংশ্লিষ্ট সকল স্তরের অংশীদারদের ( অপারেটর, স্যাটেলাইট, ফ্র্যাঞ্চাইজি, পরিবেশক, ভোক্তা, BPC, BERC, বিস্ফোরক পরিদপ্তর ইত্যাদি) সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে মূল্য নির্ধারণ ও একটি বাস্তবসম্মত ও ব্যবসাবান্ধব যুগোপযোগী নীতিমালা প্রনয়ণ।
৮. এল পি জি আমদানি ও বাজারজাতকরন পর্যায়ে রেশনিং বা কোটা প্রথা চালুর সম্ভাবনা যাচাইকরণ। মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৯. BERC এর অতি উচ্চ লাইসেন্স ফি যৌক্তিক হারে কমিয়ে আনা।
১০. এল পি জি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে BPC কে অব্যহতি প্রদান সহ ১০টি প্রস্তাবনা রাখে চট্টগ্রাম চেম্বার।








