গোলাম মামুন জাবু: সরকার তো শুধু দাম বাড়লেই দমন পীড়ন করে জোর করে দাম কমায়। কিন্তু যখন ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হয়ে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে পারে না তখন কেউ দেখার থাকে না। ব্যবসায়ীদের নীরব কান্না কেউ দেখার থাকে না। এটি কোন সভ্য সিস্টেম হতে পারে না। বাজার অভিভাবক হতে হলে ভালো মন্দ উভয় সময়েরই অভিভাবক হতে হবে।
শুধু দাম বাড়লেই বাজারে দৌড় ঝাপ আসলে এটি কোন সুস্হ সমাধান নয়।
কাঁচা মালের বেলায় সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষকে উভয় সময়ে মনিটর করতে হবে। যখন বাজার খারাপ যায় ব্যবসায়ীরা পুজি লস করেন বা আমদানীকারকরা লস করে পুঁজি হারিয়ে ব্যাংকের দেনা শোধ করতে পারেন না তখন বাজার দাম এভাবে সিল করে বা লক দেয়া যেন বাজার দাম অন্তত কস্টিং এর নীচে না নামে। আবার বাজার যেন অতিরিক্ত না বাড়ে তার জন্যও নিয়মিত বাজার মনিটর করতে হবে এবং বিশেষ করে উৎসবের মাস গুলোতে (রমজান এবং কোরবানী) তিন মাস আগে থেকে খবরাখবর নিতে হবে, পরিকল্পনা করতে হবে।
জরুরী বিষয় সরকারী আমদানী নিয়ন্ত্রন অফিস থেকে “আমদানী অনুমতি/(Import Permit -IP)” কতটন দেয়া হয়েছে এবং ব্যাংক থেকে এলসি কতটন খোলা হয়েছে, আমদানীকারক থেকে জানতে হবে Open করা LC তে কত তারিখে কতটন জাহাজীকরন বা Shipment হয়েছে ও সম্ভাব্য পৌঁছানোর তারিখ কখন । এর উপর ভিত্তি করে বাজার মনিটর করা উচিত বলে আমি মনে করি।
ভালো খারাপ উভয় সময়ই সরকারের বাজার মনিটর করা উচিত। তাহলে আমদানিকারকগন নিয়মিত আমদানি করতে থাকবেন এবং বাজার দাম সব সময় স্বাভাবিক থাকবে।অতিরিক্ত দাম বাড়ার কারন হচ্ছে অতিরিক্ত লস এর কারনে নিয়মিত আমদানী না হওয়া।
মনে করুন দুই তিন মাস বাজার খারাপ গেলে আমদানীকারগন পুজি হারালে তখন LC কম হয়, এতে আমদানী স্বাভাবিকভাবেই কম হয়, তখন এর পরের ২-৩ মাস আমদানী কম থাকায় বাজারে পন্য সরবরাহর কম থাকে, এতে দাম বাড়ে এটি জানতে হবে, এটি তখন কারো হাতে থাকবে না; Syndicate ফিন্ডিকেট এগুলো ফাও কথা, এগুলো সরকারী অফিস ও কর্মকর্তাদের দায় এড়ানোর ডায়ালগ। তাদের ব্যর্থতা ও দায়িত্ব এড়াতে সিন্ডিকেটের কথা বলে ব্যবসায়ীদের ভিলেন বানানো হয়।
ভাই বাজারে চাহিদা মোতাবেক পন্য না থাকলে ৫০০% দাম দিয়েও সে পন্য কোথায় পাবেন?? চাহিদা যোগানের সমতাস্হলে দাম নির্ধারিত হয়, বাজারে পন্য কম থাকলে তখন বিক্রেতার দাম হয়, যাকে Monopoly বলে, যখন বাজারে পন্য সরবরাহ বেশী থাকে তখন বাজার খারাপ থাকে, তখন ক্রেতার দাম হয়। তখন বিক্রেতা লস করে পন্য বিক্রি করেন।
তাই শুধু দাম বাড়লে বাহাদুরী করে পুলিশ সেনা র্যাব নিয়ে বাজারে এসে মেরে কেটে ধরে জরিমানা করে বাজার মনিটর করার সুফল দীর্ঘ মেয়াদে কখনো আসবে না। এটি কোন সঠিক পথও না। এটি স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে বিবেচিত হবেও না।
এখন যদি বাজার লস এর কারনে আমদানী কম হয় বা বন্ধ থাকে তাহলে আবারও দুই মাস পরে একই অবস্হা হতে পারে। বাজার শর্ট থাকবে। তাই সঠিক নিয়মে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করে আমদানীকারকদের সাথে বসে পন্হা বের করতে হবে। শুধু দাম বাড়লে দৌড়ে এসে ব্যবসায়ীদেরকে চোর ডাকাতের মত দৌড়ানী দিবেন এটি দেশের কোন সুস্হ নীতি হতে পারে না। মনে রাখবেন দাম ব্যবসায়ীরা বাড়ান না, দাম বাড়ে সরকারী প্রতিস্ঠান গুলোর অলসতা অবহেলা ও খাম খেয়ালীপনা ব্যর্থতা এবং চরম সমন্বয়হীনতার অভাবের কারনে।
আমার কথা যদি সিন্ডিকেট থাকেও তাহলে সারা বছর সরকারী দায়িত্ব প্রাপ্ত গোয়েন্দা অফিস বা সরকারী অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কি করেন? কেন সরকারী অফিস এবং কর্মকর্তাদের ব্যর্থতায় ব্যবসায়ী এবং সাধারন মানুষ কস্ট পাবেন? আসল কথা ব্যবসা বা আমদানী রপ্তানী বুঝে এরকম মানুষের দায়িত্বে আসা উচিত। অন্য পেশার লোক দিয়ে ব্যবসা শিল্প নিয়ন্ত্রন করা দূরহ কাজ। অসম্ভব।
দেশের আমদানী অধিদপ্তর, আমদানী কারক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বয় করে বাজার মনিটর করলে সব সময় সচেতন থাকলে দেশে কোন পন্যের ঘাটতি হবার কথা নয়, দামও বাড়তে পারে না। যে কোন কর্তৃপক্ষ আমার সাথে কথা বললে সব আমি হাতে ধরে শিখিয়ে দিব কি কি করতে হবে। কোন কমিটি করলে ঐ কমিটির একজন সদস্য হিসেবে আমি থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখলাম এবং সরকারী কোন মিটিং হলে নিজ খরচে ঐ মিটিং উপস্হিত থাকব, কোন সরকারী সুবিধাও আমার প্রয়োজন নেই। এই জিনিসটি বুঝতে হলে ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া বা পিইচডি করা বা মন্ত্রী অথবা সচিব হতে হয় না।দরকার সততা আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতা। তাই আমদানী নিয়মিত চালু রেখে একটি স্বাভাবিক সমন্বিত পথে থাকলে এভাবে বাজার কখনো উঠা নামা করার কথা না।
কিন্তু সরকারী প্রতিস্টান গুলো অর্থাৎ বানিজ্য মন্ত্রনালয়, আমদানী রপ্তানী অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং কাস্টমস ও আমদানীকারক সংগঠন অথবা চেম্বার গুলো এ ব্যাপারে কোন সঠিক ডাটা বা তথ্য উপাত্ত দিয়ে বাজার মনিটর করে না। এই সব দেখার কেউ নেই, শুধু দাম বাড়লে বাজারে দৌড়ানো একটি বল প্রয়োগে সাময়িক সমাধান।
মনে আছে পিঁয়াজের কথা। পিঁয়াজে তো কেউ তা নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হয়নি কারন সরবরাহই কম ছিল। ভারত পিঁয়াজ বন্ধ রেখেছিল।সরকারী প্রতিস্ঠান গুলো পূর্বানূমান করতে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন রপ্তানীকারক দেশ খুঁজতে দেরী হয়েছে; আমদানীকারকরা ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে পিঁয়াজ আমদানী না করলে ৪০০-৫০০ টাকা দিয়েও পিঁয়াজ কোথায় পেতাম!
তাই একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নীতিমালা করে বাজারে নিত্যপন্য তথা মসলা ও কাঁচা পচনশীল পন্য যেমন পিঁয়াজ রসুন আদা সরবরাহ ও নিয়মিত আমদানি নিশ্চিত করে বাজার স্বাভাবিক রাখা জরুরি। সবাই যার যার চেয়ারে বসে দায়িত্ব সঠিক ও আন্তরিকভাবে পালন করলে বাজারে কোন সমস্যা হবার নয়।
তাই প্রাতিস্টানিক সমন্বিত মনিটর দরকার। আমার হাতে ক্ষমতা আছে ২-৩ দিন বাজারে গিয়ে জরিমানা করে বাজার বন্ধ করলাম বা জোর করে বাজার কমিয়ে দিলাম এটি সাময়িক কিন্তু সারা বছরই কিন্তু এভাবে বাজার বাড়ছে কমছে।কোন সিস্টেম নেই! শুধু লাঠির বাড়ি আছে আর ইচ্ছে মত যত বেশী পারেন জরিমান করেন, ব্যবসায়ীদের অসম্মানজনক ভাবে হাতকড়াসহ ছবি তুলেন। কিন্তু সম্মন্ধ করতে গেলে আগে ব্যবসায়ী খুঁজেন!
পরিশেষে বলছি প্রত্যেক নিত্যপন্যের উত্থান পতনের একটি লিমিট করা উচিত; বিশেষ করে মসলা জাতীয় এবং কাঁচা পচনশীল পন্য; সরবরাহ অতিরিক্ত বেশী হলে কোন পন্য কস্টিং এর চেয়ে নীচে আসতে পারবে বেশী হলে ১০-২০% পর্যন্ত ; অর্থাৎ আমদানীকারকগন ১০-২০% মূলধন লস দিবেন। এর বেশী নীচে আসতে দেয়া উচিত হবে না কারন এতে ব্যাংকের বিনিয়োগ জড়িত এবং লাভের হারও সেভাবে অতিরিক্ত হলে কস্টিং থেকে ২০% এর অধিক হতে পারবে না সেদিকে মনিটর করতে হবে।দিন শেষে সবাই তো এদেশের নাগরিক, সবাই তো দেশের জন্য মানুষের জন্য কিছুটা কাজ করেন। তবে দূর্নীতিবাজ বাটপার লুটেরাদের সাথে সাধারন নিয়মিত ব্যবসায়ীদের মিশিয়ে ফেলা উচিত হবে না।
আবারো বলতে চাই ভালো খারাপ উভয় সময়ই বাজার মনিটর করা দরকার। তা নাহলে আমদানীকারকরা টিকে না থাকলে আমদানী হ্রাস পেয়ে বাজার আবারো উল্ফলন হবেই।তাই শুধু বাড়তি বাজারে মনিটর করে এর সুফল আসবে না। আশা করি বিষয়টি সকল মসলা ও কাঁচামাল ব্যবসায়ীরা শেয়ার করে বিভিন্ন ভাবে সরকারের নজরে আনবেন।
দূ:খের বিষয় কিন্তু কে করবেন কারা করবেন এসব? এত সময় কি তাঁদের আছে?








