২০১৪ সালের পর দেশ জুড়ে আছড়ে পড়েছিল মোদি ঢেউ। ২০১৯ শে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসেন মোদি অমিত শাহরা। কিন্তু সেই জোয়ার এখন উল্টো পথে। একের পর এক রাজ্য হাতছাড়া হচ্ছে মোদি সরকারের। গত দেড় বছরে ‘বিজেপিমুক্ত’ হয়েছে পাঁচটি রাজ্য। আর গত দু’বছরের হিসেব করলে দেখা যায় ৭ রাজ্যে হেরেছে বিজেপি।
হারের সেই তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে খোদ রাজধানী। দিল্লিতেও মুখে হাসি ফোটাতে ব্যর্থ মোদি-শাহ জুটি।
ছয় রাজ্য হারানোর পর দিল্লি বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে তাও স্বপ্ন দেখছিল পদ্ম শিবির, কিন্তু মঙ্গলবার যত এগিয়েছে ভোটগণনা, ততই সেই আশা ফিকে হয়েছে।
গতবার অর্থাৎ ২০১৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দিল্লিতে ৩টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। এবারে দিল্লি বিজেপির সভাপতি মনোজ তিওয়ারি ৪৮ টি আসনে জয়ের প্রত্যাশা করেছিলেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতায় আসবেন বলে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ক্রমশই দেখা যায়, দিল্লিতে বিজেপির মন ভেঙে দিয়ে ফের অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে আম আদমি পার্টির বিজয়রথ।
দিল্লি সহ ১২ টি রাজ্যে এখনও বিজেপি বিরোধী দলগুলির সরকার রয়েছে। এনডিএর সরকার রয়েছে অন্য ১৬ টি রাজ্যে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৪২ শতাংশ মানুষ এই রাজ্যগুলিতে বাস করে।
কংগ্রেস নিজে বা অন্য দলের সঙ্গে জোট বেঁধে মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, পঞ্জাব, পুদুচেরিতে ক্ষমতায় রয়েছে। ডিসেম্বর ঝাড়খণ্ডেও সরকার গঠনের পরে কংগ্রেসের বর্তমানে মোট ৭ টি রাজ্যে সরকার রয়েছে।
এদিকে দিল্লিতে, আম আদমি পার্টি টানা তৃতীয়বারের মতো জেতা প্রায় নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে শাসন ক্ষমতায় রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস, কেরলে সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন জোট, অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াইএসআর কংগ্রেস, ওড়িশায় বিজেডি এবং তেলেঙ্গানায় শাসন ক্ষমতায় রয়েছে টিআরএস।
লোকসভা নির্বাচনে লড়েছিল, কিন্তু সে রাজ্যে তাদের দলের কোনও বিধায়ক নেই। সুতরাং, ওই রাজ্যেও ক্ষমতার অংশীদার নয় গেরুয়া শিবির। অথচ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনেকটাই ভাল অবস্থানে ছিল এনডিএ।
বিজেপি এবং তার জোটশক্তির হাতে ১৯ টি রাজ্য ছিল।
তার এক বছর পরে, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়ের মতো তিনটি রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতা হারিয়েছে। ওই রাজ্যগুলিতে এখন কংগ্রেস সরকার রয়েছে।
ওদিকে চতুর্থ রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশ, যেখানে বিজেপি-টিডিপি জোট সরকার ছিল, কিন্তু ২০১৮ সালের মার্চ মাসে সেখানে টিডিপি-বিজেপি জোট ভেঙে যায়।
২০১৯ সালে সেখানে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছে ওয়াইএসআর কংগ্রেস। ওদিকে পঞ্চম রাজ্য মহারাষ্ট্র, যেখানে শিবসেনা নির্বাচনের পরে এনডিএ-র সঙ্গে ত্যাগ করে এবং কংগ্রেস-এনসিপিকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করেছে। শেষ আশা ছিল দিল্লি, কিন্তু রাজধানীর মানুষও ফের একবার বিজেপিকে হতাশ করল।
স্বভাবতই হারের কারণ নিয়ে ওঠছে প্রশ্ন। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ সুব্রক্ষ্মণ্যম স্বামীর কথায়, ২০১৪ সাল থেকে এখনো পর্যন্ত দলের কাঠামো খতিয়ে দেখা উচিত। তার অভিযোগ, বহু রাজ্যে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেনি বিজেপি, তার ফল হাতেনাতে পেয়েছে নেতৃত্ব।
একই কথা বলছেন দিল্লির বিজেপি প্রার্থী কপিল মিশ্র।
তার কথায়, ‘কিছু একটা গড়বড় হচ্ছে। খতিয়ে দেখা দরকার।’ দিল্লির সাংসদ গৌতম গম্ভীর তো স্বীকার করেই নিলেন।
তিনি বলেন, ‘দিল্লির মানুষকে আমরা বোঝাতে পারিনি’। তবে দলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে অন্য সুর।
দেশটির রাজনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণে ওঠে এসেছে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। দিল্লির নির্বাচনের প্রচারেও বারবার পাকিস্তান বিরোধিতা কিংবা ধর্মীয় ভেদাভেদের কথা তুলে এনেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। অথচ স্থানীয় ইস্যু সম্পর্কে একটি শব্দও খোঁজ করছেন না তারা। ফলে স্বভাবতই জাতীয়স্তরের নির্বাচনের বৈতরণী পার করতে পারলেও, বিধানসভায় বারবার ধাক্কা খাচ্ছে বিজেপি শিবির।
দেশটির বিশিষ্টজনরা বলছেন, আসামের এনআরসি, নাগরিক আইন সংশোধনী নিয়ে ধর্মীয় বিভাজনকে ভালো চোখে দেখছেন না নাগরিকরা। তাই বিজেপি ছেড়ে উন্নয়নে আস্থা রেখেছে দিল্লিবাসী।

