শাহরুখ সায়েল: বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী বাড়ি নির্মান হয়েছে এমন বাড়ির সংখ্যা খুবই নগন্য। চট্টগ্রাম নগরীতে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া কোন ভবন নির্মানে আইন মানতে দেখা যাচ্ছে না।
কেন মানুষ আইন না মেনে বাড়ি নির্মান করছে তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে উঠে এসেছে আইনের অসঙ্গতি ও বাধ্যবাধকতার কারনেই আইনের তোয়াক্কা করছে না মানুষ।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী বাড়ি বানানোর জন্য ‘ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ’ বা এমজিসি’র একটি চার্ট অনুসরণ করতে হয়। এতে জমির আকার অনুযায়ী কী পরিমাণ জায়গা ছেড়ে কয়তলা ও কতবড় ভবন নির্মান করা যাবে, সেটা উল্লেখ করা আছে।
সেক্ষেত্রে ২ কাঠা জমিতে বাড়ি নির্মানের সময় ভূমি মালিককে ৩২.৫ শতাংশ জায়গা চারপাশে খালি রেখে বাড়ি করতে হবে। অর্থাৎ, জমির মালিক শতকরা ৬৭.৫ ভাগ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
জনবহুল এই নগরীতে বসবাস করছে কাগজে কলমে ৭০ লাখ মানুষ।বাস্তবে যা কোটি ছাড়িয়েছে।
বাড়ি নির্মানের ক্ষেত্রে ইমারত নির্মান আইনে যা বলা আছে তা মেনে বাড়ি করা প্রায় অসম্ভব নগরবাসীর জন্য।
নগরীতে জমির মূল্য ও চাহিদা দুইটাই বেশি। বাড়ি নির্মানের ক্ষেত্রে ‘ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ’ বা এমজিসি’র যে চার্ট অনুসরণ করতে বলা হয়েছে সে অনুযায়ী বাড়ি করতে গেলে একদিকে অপচয় হচ্ছে ভূমি অন্যদিকে অর্থ। বাড়িও হচ্ছে না প্রত্যাশা অনুযায়ী।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আইনের অসঙ্গতির কারণেই আইনের ধার ধারছে না মানুষ।
এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যদি জমির পরিমাণ দুই কাঠার মধ্যে হয় তবে জমির মালিক শতকরা ৬৭.৫ ভাগ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। তাকে প্রায় এক তৃতীয়াংশ জমি ছেড়ে বাড়ি বানাতে হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী তিনি ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও’ বা ‘ফার’ পাবেন ৩.১৫। ২ কাঠা জমিতে কি পরিমান জমি ব্যবহার করা যাবে তা পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিচে দেখানো হলো, ম্যাক্সিমাম বিল্ডিং এরিয়া (এম.বি.এ) = ভূমি * ফার = ২ কাঠা * ৩.১৫ = (২*৭২০)* ৩.১৫ (১কাঠা = ৭২০ বর্গফুট) = (১৪৪০ * ৩.১৫)বর্গফুট = ৪৫৩৬ বর্গফুট ‘ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ’ বা এমজিসি’র চার্ট অনুযায়ী, ম্যাক্সিমাম গ্রাউন্ড কভারেজ =২ কাঠা * ৬৭.৫% = (২*৭২০) * ৬৭.৫% = ৯৭২ বর্গফুট নাম্বার অফ ফ্লোর (এন.ও.এফ) = এমবিএ/এমজিসি = ৪৫৩৬/৯৭২ =৪.৬ ফ্লোর মোট ফ্লোর = গ্রাউন্ড ফ্লোর + ৪.৬ ফ্লোর = ১ + ৪.৬ ফ্লোর = ৫.৬ ফ্লোর অর্থাৎ, ২ কাটা জমিতে ৫ তলা বাড়ি এবং চিলেকোঠা হবে।
জমির আয়তন যত বেশি ‘ফার’ও তত বেশি হয়। কিন্তু নগরীতে বহুতল ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে তার বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।
বাড়ি করার ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড নীতিমালার ধার ধারছেন না কেউই, খোদ সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যানও মানেননি এই নিয়ম।
নিয়ম না মেনেই নগরীর ও.আর নিজাম রোডে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুর হোটেল ওয়েল পার্ক।
কেন বিল্ডিং কোড মানছেন না এমন প্রশ্নের উত্তরে বাড়ির সদ্য নির্মানকাজ শুরু করা একজন ব্যক্তি জানান, তিনি ২কাঠা মাপের জায়গাটি কিনেছেন ৩৪ লাখ টাকায় এখন যদি এক তৃতীয়াংশ জায়গা ছেড়ে দিতে হয তাহলে তার বাড়িটা খুব ছোট হয়ে যাচ্ছে। সে বাড়ি ভাড়া দেওয়ার জন্য বাড়িটা করছে যদি বাড়ি ছোট হয রুমও কম হবে ভাড়াও কম পাবে।
আবার অন্যদিকে তার ১১ লাখ টাকার জায়গাও কোন কাজে আসবে না। তাই সে এ নীতিমালা মানছে না।
তিনি আরও যোগ করেন, নগরীতে জমির অনেক দাম্। ক্রমশই জমির দাম বাড়ছে এ অবস্থায় এতো দাম দিয়ে জায়গা কিনে তা ফেলে রাখতে চায় না কেউই।
তাহলে কি আইনের বাধ্যবাধকতায় আইন না মানার মুল কারণ কিনা সেই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মোঃ শাহীনুল ইসলাম খান জানান, বিল্ডিং কোড নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা। এর সুবিধা বাড়ির মালিকই পাবেন। আর বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে যে আইনগুলো আছে তা তো তেমন কঠিন না! বাড়ির চারপাশে কিছুটা জায়গা খালি থাকলে ঘরে সহজেই আলোবাতাস চলাচল করতে পারে। খোলা জায়গায় শিশুরা খেলাধুলা করতে পারে। ছোট জমির ক্ষেত্রে ৬২.৫ ভাগ পর্যন্ত গ্রাউন্ড কভারেজ পাওয়া যায় কিন্তু বড়ো জমির ক্ষেত্রে গ্রাউন্ড কভারেজ তত পাওয়া যায় না তখন ৫২ থেকে ৫৭ ভাগ পর্যন্ত পাওয়া যায়। জায়গা সবাই কিছু না কিছু ছাড়ে।
কিন্তু কথা হলো বিধিমালায় যা আছে সেটুকু ছাড়ে কিনা?
এর উত্তরে মিঃ খান বলেন, ছোট জমিতে তো জায়গা ছাড়েই না। অন্য যেগুলো আছে তারাও বিধিমালা অনুসরণ করে না। তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠিত আবাসন ব্যবসায়ী ডেভেলপার যারা আছে তারা বিল্ডিং নির্মাণ আইন অনুসরণ করছে। তাছাড়া সবাই নিজে থাকার জন্য বাড়ি বানায় না ভাড়া দেওয়ার জন্যও মানুষ বাড়ি বানায় সেক্ষেত্রে তারা একটু প্রশস্ত করতে চায়। তারা সেই বাড়ি ভাড়ার টাকা দিয়েই চলে। সেক্ষেত্রে তারা বিধিমালা মানে না।
তিনি আরো যোগ করেন, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা কম। তার বাহিরে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমি ছোট হয় তারা সেখানে ভাড়া ঘর বানায় সেগুলো খুব ছোট হয় সেক্ষেত্রে ভাড়া পায় না । তাই প্রশস্ত করতে গিয়ে আইন ভেঙ্গে ফেলে। মানুষের আইন মানার প্রবণতা কম।
সিডিএ’র ভুমিকা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের ভূমিকাও স্ট্রং না। আমরাও চেষ্টা করি, কাগজে কলমে যতটুকু সম্ভব করি। তার বাহিরে নানা কারণে আমরা পেরে উঠিনা আমাদের জনবল কম, আমরা সময়মত জানতে পারি না। অনেকসময় মানুষ কলাম করে ফেললে বা বিল্ডিং করে ফেললে তা ভাঙ্গা সম্ভব হয় না । তারা প্রভাবশালীদের আশ্রয় নেয়। শিক্ষিত জমির মালিকদেরই আসলে আইন ভাঙ্গার প্রবণতা বেশি। আর আমরা অনুমোদন দেওয়ার পর তিন বছরের মধ্যে কাজ শুরু করার নিয়ম কিন্তু তিন বছর একটা মানুষকে পর্যবেক্ষনে রাখা সম্ভব হযে ওঠে না সে পরিমাণ লোকবলও আমাদের নাই।
