Site icon CPLUSBD.COM

ভিন্ন, তাই অবহেলায় ছিন্ন জীবন

মিঠুন চৌধুরী: রেললাইন ধরে এগিয়ে যেতে যেতে বেলা বাড়ে কিন্তু সেই পুরনো আবাসের দেখা মেলে না। সেখানে এখন নতুন রেললাইন। ঝুপড়ি ঘরগুলো উধাও। কোথায় গেলেন তারা? লালবাতিকে পাত্তা না দিয়ে রেললাইনের উপর দাঁড়িয়ে হলুদ ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল যে কিশোর তার কাছে জানতে চাই, কোথায় গেলে দেখা মিলবে পুরনো বাসিন্দাদের।

ঠিকানা বদল হয়েছে, জেনে ভালো লাগে। তাহলে এরকম ঝুঁকিপূর্ণ আর নোংরা পরিবেশ থেকে বুঝি ভালো কোথাও চলে গেছে। রেল কলোনির দেয়াল পেরিয়ে ওপারে যাই। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে করে ঠাঁই খুঁজে নিতে একটু সময় লাগে। ততক্ষণে আগের ভুল ভাঙে।

মধ্য ফেব্রুয়ারিতে যে রাস্তায় পানি জমে থাকে বর্ষায় সেখানকার হাল কেমন হয়, সে তো আন্দাজ করাই যায়। পুরনো সব ফাটল ধরা দেয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিল্ডিংগুলো। সেগুলোর নিচে যে খোলা জায়গাটা আগে রেল কলোনির বাসিন্দারা বাগান করতেন সেখানে এখন ঘর উঠেছে।

ঘর- কোথাও ইটের দেয়াল টিনের ছাদ, কোথাও টিনই সব, আবার কোথাও কাঁচা ঘর।

কয়েকজন মিলে লুডু খেলছেন। কথা বলতে চাইলেও পাত্তা দেয় না। কারণ তারা জানেন, এসব বলে কোনো লাভই হবে না। নিজেদের মত ডুবে থাকেন ছোট সাপ থেকে বেঁচে পরক্ষণেই বড় সাপের মুখে পড়ার খেলায়। আর যে সিঁড়ি একবার নিচে নামিয়ে দেয় উপরে ওঠার জন্য তাকে খুঁজতে থাকেন প্রতি দানে দানে। এগিয়ে যাই।

দুটো বিল্ডিং এর মাঝের অংশে কয়েকটা ঘর। সামনের কয়েক ফুট জায়গায় রান্নার জন্য তরকারি কাটছেন বস্তির বাসিন্দারা।

তাদের কাছে জানতে চাইলে দেখিয়ে দেন, কল্পনাকে। একটা পুরনো দুই সিটের সোফায় বসেছিলেন। পুরনো আর উপযোগিতা হারিয়ে ফেলায় ফেলে দেয়া সেই সোফা এখন কল্পনার ঘরের সামনে ঠাঁই গেড়েছে। ঘরে ডেকে নেন। বসতে দেন খাটে। চোখ ঘুরিয়ে দেখি কয়েক ফুটের ছোট্ট একটা ঘর। এর মধ্যে থাকা খাওয়া রান্নার সব ব্যবস্থা। পান খেতে খুব ভালোবাসেন দেখলেই বোঝা যায়। পান খাওয়ায় সঙ্গ দিতে পাশের বাড়ির এক গৃহিনীও জুটেছেন। একটা ঢোল দেখি।

জানতে চাইলে বলেন, গান বাজনা করি। ১৫ বছর আগে নিজের ঘর ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে আসেন কল্পনা। আগে অন্য কোথাও ছিলেন। এখানে ছয়-সাত বছর হলো আছেন। পারিখ (সঙ্গী) চলে গেছেন অন্য জেলায় চাকরি নিয়ে। এখন তিনি একা।

যাদের পারিখ আছে তারাও খুব একা। জীবনের তাগিদে ছুটতে হয় পথে পথে। আয় বলতে দ্বারে দ্বারে হাত পাতা। তাতে যা আয় হতো মহামারী সেখানেও বসিয়েছে থাবা। ভিন্ন বলে যাদের নিজের ঘরই ছাড়তে হয়েছে তাদের কাজ দেবে কে? তাও এখন দুয়েকজনের চাকরি হচ্ছে। সেটাও খুব বলার মত কিছু নয়। কল্পনার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে অন্যদের খোঁজে গেলেও দেখা মেলে না। সবাই ব্যস্ত। রাস্তায় বের না হলে যে পেট চলবে না। কারো সাথে পথে দেখা হয়, কারো সঙ্গে ফোনে কথা।

পৌরানিক বা মোগল যুগ তো পেরিয়ে গেছে বহু আগেই। মানুষও বদলে গেছে। বদলে গেছে সব। বদলায়নি শুধু উপেক্ষা, আর বঞ্চনা। সেজেগুজে পথে বের হলেও ঘৃণার চোখে দেখে লোকজন।

তাঁদের প্রশ্ন- ‘আমরা কি মানুষ না? জীবজন্তু?’ ভাবি জীবজন্তু হলেই কী ভিন্নতাকে এড়িয়ে যায় ‘মানুষ’। না তো। প্রাণিজগতে ভিন্ন কারো জন্ম হলে তা নিয়ে মানুষেরই হইচই সবচেয়ে বেশি। সাদা হাতি, সাদা বাঘ এসব নিয়ে মানুষের মাতামাতি ছিল সবসময়। এখনো আছে। তাহলে শুধু মানবের ভিন্নতায় কেন আপত্তি এত। তৃতীয় লিঙ্গের বলে নিজের সন্তানকেই মেনে নিতে পারে না। ঘর ছাড়তে হয় তাদের। পরিবার থেকেও যার কেউ নেই, যে কখনো উৎসবে ঘরে ফিরতে পারে না- তার কষ্ট উপলব্ধির ক্ষমতা আমার নেই।

অথচ ওদেরও শৈশব ছিল, খেলার সঙ্গী ভাই-বোন ছিল, মা-বাবা ছিল। এখনো হয়ত জীবিত আছে। অন্য কোথাও, অন্য কোনো ঘরে। সেই ঘরে কল্পনাদের ঠাঁই হয় না। তাই তো তারা ঘর ছাড়ে, স্বজন ভোলে, নিজেদের জগত নিজেরা করে নেয়।

প্রাণির বেলায় সমষ্টির আহ্লাদ মানুষের বেলায় খাটে না। তাই হয়ত ‘মানুষের’ ভাষায় তাঁরা আর কথা বলে না। সমাজের ভাষা উল্টে দিয়ে তাঁদের কথোপকথন হয় ‘উল্টি’ ভাষায়।

‘মানুষের সমাজে’ প্রবেশাধিকার নেই বলে নিজেদের সমাজ গড়ে যেখানে ‘মানুষের’ও প্রবেশাধিকার নেই। সবেতেই আমি-তুমি, পুরুষ-নারী, হিন্দু-মুসলমান, ধনী-গরিব ভেদাভেদ বলে; তোমার আমার নামের আগে-পরে, পোশাকের বাহারে সেসব ঝুলিয়ে রাখি। তৃতীয় বলেই তাঁরা অনন্য। ভিন্ন হলেও ভেদাভেদ নেই নিজেদের মাঝে। তাই তো নিজের বেছে নেওয়া নামে নেই কোনো উপাধি-উপমা। ‘মানুষের’ অবহেলা তাই ছুঁতে পারে না এইসব মানবের ছিন্ন জীবন।

মিঠুন চৌধুরী, স্টাফ করসপনডেন্ট, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম