Site icon CPLUSBD.COM

মসজিদের আধিপত্য নিয়ে বাড়ছে সংঘাত, গড়াচ্ছে মামলা মোকদ্দমায়

মসজিদের আধিপত্য নিয়ে সারাদেশে বাড়ছে সংঘাত (2)

মো: মহিন উদ্দীন: মসজিদের আধিপত্য নিয়ে সারাদেশে বাড়ছে সংঘাত। এক সময় রাজনীতির গ্রুপিং থেকে দুই পক্ষের সংঘাত হতে দেখা গেলেও তা ক্রমান্বয়ে এখন স্কুল, মাদরাসা, কলেজ থেকে শুরু করে সামাজিক সংগঠন পর্যন্ত গড়িয়েছে। পাশাপাশি প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দেখা দেয় বিভিন্ন পীর-আউলিয়ার মাজার নিয়েও নানা সংঘাত।

ইদানিং মসজিদে আধিপত্য নিয়ে ব্যাপক সংঘাত দেখা যাচ্ছে কেবল তা নয়। গড়াচ্ছে মামলা মোকদ্দমা পর্যন্ত। যদিও জায়গা জমি নিয়ে মামলা মোকদ্দমা পুর্বে থেকেই ছিল এখন আরও বাড়ছে। কিন্তু মসজিদ পরিচালনা কমিটি নিয়ে বর্তমানে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আদালতে মামলা।

সম্প্রতি, গত ১১ জুন নগরীর পূর্ব বাকলিয়া আবদুল লতিফ হাটখোলা এলাকায় মসজিদের করবস্থানের জায়গা নিয়ে বিরোধের জেরে দু’পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪ জন গুলিবিদ্ধ বলে জানা গেছে।

এর আগে গত ১১ এপ্রিল চন্দনাইশ পৌরসভা সদরে প্রতিষ্ঠিত খানকায়ে কাদেরীয়া তৈয়্যবিয়াতে মৌলানা বাড়ি জামে মসজিদের নামে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় সূচিসহ ঘড়ি ও প্রবেশদ্বারে মৌলানা বাড়ি জামে মসজিদের নাম ফলক লাগানোর ৫ ঘন্টার মধ্যে ভেঙ্গে দেয়া হয়। এ নিয়ে এলাকায় চলছে চরম উত্তেজনা। এতে দুই পক্ষদ্বয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা।

তার কয়েকদিনের পরে গত (১৪ এপ্রিল) রাউজান উপজেলায় মসজিদের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জের ধরে মো. সাইফ উদ্দিন খান সাবু ​(৪৯) নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার পশ্চিম গহিরা আবুদ্দার বাড়ির শেখ ইব্রাহিম জামে মসজিদে এ ঘটনা ঘটে।

একই দিনে চান্দগাঁও থানার একটি মসজিদে তারাবি নামাজ পড়াকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে একদল মুসল্লি। বুধবার (১৪ এপ্রিল) এশার নামাজের সময় চান্দগাঁও সিডিএ আবাসিক এলাকা জামে মসজিদে এই ঘটনা ঘটে।

গত বছর ১১ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের শামীর মোহাম্মদপাড়া জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটিতে স্থান না পেয়ে মসজিদের অজু ও জেয়ারতখানা ভাংচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় মসজিদ কমিটির সভাপতি জসিম উদ্দিন অভিযুক্ত এলাকার জালাল আহম্মদের ছেলে রোকন ও মাহাবুল আলমের ছেলে এমরানের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন বরাবরে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

২০১৫ সালে ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় মসজিদের জায়গা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলায় আহত মো. আবুল হাসেম নামের এক ব্যক্তি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাঁর বাড়ি উপজেলার উত্তর মাহালিয়া গ্রামে।

চট্টগ্রাম জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার প্রধান মহাদ্দিস হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ সোলাইমান আনসারী সিপ্লাসকে বলেন, মসজিদ আল্লাহর ঘর। তা আল্লাহর সব শ্রেণির বান্দার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সেখানে তারা নির্বিঘ্নে ইবাদত করবে। মসজিদে আল্লাহর ইবাদত ও দ্বিনি কাজ করতে বাধা দেওয়া জঘন্যতম অপরাধ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে আল্লাহর মসজিদে তাঁর নাম স্মরণ করতে বাধা দেয় এবং তা বিরান করতে প্রয়াসী হয়, তার চেয়ে বড় জালিম আর কে…?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১৪)।

তিনি আরও বলেন, মসজিদটার ভিত্তি করা হয় আল্লাহ ভীতির উপর! অথাৎ আল্লাহ তায়ালাকে প্রাপ্তি ও সন্তুষ্টির জন্য। এখন যে মসজিদের উদ্দেশ্য যদি আল্লাহ সন্তুস্টি না থাকে এবং মসজিদ কমিটিতে ঐ ধরনের লোক যদি না থাকে, যাদের মধ্যে তাকওয়া নেই, আল্লাহ ভীতি নেই, তাদের কমিটিতে থাকা উচিত নয় উল্লেখ করে বলেন, ইসলামী শরিয়তবিরোধী এবং ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ মসজিদে করা যাবে না।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মসজিদগুলো আল্লাহর জন্য। সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে ডেকো না।’ (সুরা : জিন, আয়াত : ১৮)।

তিনি বলেন, মসজিদ নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা নিন্দনীয়। মহল্লাগত ও বংশীয় বিবাদের জেরে রক্ষণাবেক্ষণের সামর্থ্য না থাকার পরও মসজিদ নির্মাণ করা অনুচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না মানুষ মসজিদ নিয়ে অহংকারে লিপ্ত হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৪৯)।

তিনি (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, তুমি পদপ্রার্থী হবে না। যদি প্রার্থী হয়ে পদ পাও তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তা তোমার ওপর নিক্ষেপ করা হবে। আর যদি প্রার্থী না হয়ে পদ পাও তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনে তোমাকে সাহায্য করা হবে। -সহিহ বোখারি: ৭১৪৭

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, মসজিদ কমিটির পদকে নেতৃত্ব মনে করা চরম বোকামী। মসজিদ কমিটির কোথাও জায়াগা হলে এটাকে নিছক খেদমত মনে করা দরকার। এ খেদমত আল্লাহর ঘরের খেদমত। মুসল্লিদের খেদমত। তাই দুনিয়ার কোনো চাওয়া-পাওয়া ব্যতিরেকে মুক্তমনে শুধু আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের ইচ্ছায় ইবাদত মনে করে খেদমতের মানসিকতা নিয়ে কমিটিতে অংশ নিতে হয়। সামাজিক পদমর্যাদা বৃদ্ধির অভিলাষে কমিটিতে যোগ দেওয়া হারাম।

সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা মনে করেন, অনেকে মসজিদের নেতৃত্বকে সামাজিক মর্যাদা মনে করা হারাম। মসজিদ নিয়ে হানাহানি মানে দুনিয়া ধংসের আলামত। শুধু তা নয়, মতবিরোধের কারণে একই এলাকায় নির্মাণ করা হয় কয়েকটি মসজিদ। কিন্তু এসব মসজিদে মুসল্লি বলতে দুই একজন ছাড়া আর কেউ থাকে না।

এডভোকেট জিয়া আহসান হাবিব সিপ্লাসকে বলেন, বর্তমানে মসজিদ পরিচালনা কমিটির জন্য প্রতিদিনই মামলা হচ্ছে। প্রতিটি মসজিদ আল্লাহর ঘর। আল্লাহর ইবাদত ও দ্বিনি কাজই শুধু সেখানে অনুমোদিত। মসজিদ পরিচালনার জন্য একটি কমিটি থাকে। এ কমিটিটা যদি ওয়াক্কফ স্টেট হয়ে থাকে, ওয়াকফ দ্বারা পরিচালিত মসজিদ হয়, তাহলে ওয়াক্ফ প্রশাসক থাকে। বাংলাদেশ সরকারের সারাদেশে ওয়াক্ফ দ্বারা পরিচালিত মসজিদ কিংবা স্টেটে একজন মোতওয়াল্লি নিয়োগ করে থাকে।

আবার অনেক জায়গায় মুসল্লি কমিটি দ্বারা মসজিদ পরিচালিত হয়। তবে মুসল্লি কমিটির একটা গঠনতন্ত্র থাকতে হবে।

ইদানিং মসজিদে কিছু মুসল্লি কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত হচ্ছে। যার ফলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য গ্রুপিং সৃষ্টি হয়। এতে করেই ঘটছে সংঘাত, হানাহানি, মারামারি।

মোটকথা মসজিদ কমিটি পরিচালনার জন্য আলেম ওলামা ছাড়া কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে না জড়ালে সংঘাত কিংবা মামলা মোকদ্দমা হবে না। এছাড়াও প্রতিটি মসজিদে যদি প্রশাসনের নজর থাকে তাহলে মসজিদ পরিচালনা কমিটি নিয়ে এমন সংঘাত কিংবা মারামারি হবে না বলে তিনি মনে করেন।