Site icon CPLUSBD.COM

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অকুল পাথারে পড়া চট্টগ্রামের মানুষগুলোর চেয়ে আইন কী বড় হয়ে গেল !!!

হাসান আকবর

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। কেউ কেউ শখ করে বাণিজ্যিক রাজধানীও বলেন। আর এর সবকিছুই মুলতঃ বন্দরেরই অবদান। চট্টগ্রাম বন্দরই এই শহরকে বর্তমান অবস্থানে এনেছে। আলাদা একটি মর্যাদা দিয়েছে। দিয়েছে গুরুত্ব। বন্দর না থাকলে চট্টগ্রামের সাথে রাজশাহী কিংবা রংপুরের খুব বেশী পার্থক্য থাকতো না। বন্দরই চট্টগ্রামের শান,মান। চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা উন্নতমানের শহরের যে তকমা দেয়া হয়েছে, অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে- তা এই বন্দরেরই দান।

চট্টগ্রাম বন্দর গড়ে উঠেছে একশ’ বছরেরও বেশী আগে। লুসাই পাহাড় থেকে নেমে আসা ১৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ কর্ণফুলী নদীর ৪৩ কিলোমিটার এলাকায় পরিচালিত হয় বন্দরের কার্যক্রম। কর্ণফুলী নদী ছাড়াও নদী পাড়সহ সন্নিহিত এলাকা জুড়ে বন্দরের ১৬শ’ একর ভূমি রয়েছে। যা চট্টগ্রামের মানুষেরই বাপ দাদার ভিটে মাটি ছিল। ছিল অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন মোড়ানো জমি-জিরাত। কারো ছিল ধানী জমি। কারো বা মাছ ভরা পুকুর, দীঘি। গোয়াল ভরা ছিল দুধেল গাভী কিংবা হালের বলদ। সবই উজাড় করে দিয়েছে মানুষ। এই বন্দরের জন্য, দেশের জন্য। অর্থনৈতিক মুক্তি কিংবা সমৃদ্ধির জন্য। চট্টগ্রামের মানুষের দেয়া কিংবা এই অঞ্চলের মানুষের কাজে লাগতো এমন ভূমিতে দিনে দিনে ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে বন্দর।

চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর। দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে বছরে ৩০ লাখ টিইইউএস-এর চেয়ে বেশী কন্টেনার এবং দশ কোটি টনের মতো খোলা পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়। প্রায় সাড়ে তিন হাজার দেশী বিদেশী মাদার ভ্যাসেল এবং ফিডার ভ্যাসেল বন্দরে আসা যাওয়া করে। বছর জুড়ে চলা বিশাল এই কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বছরে গড়ে আড়াই হাজার কোটিরও বেশী টাকা আয় করে। বেতন বোনাসসহ আনুষাঙ্গিক খরচ বাদ দিয়েও বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে বারো তেরোশ’ কোটি টাকা থাকে। বছরে প্রায় চারশ’ কোটি টাকা বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্স হিসেবে সরকারকে প্রদান করা হয়। এরপরও বন্দরের তহবিলে ৭/৮শ কোটি টাকা জমা হয়। বন্দরের তহবিলে প্রায় চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে শুধু চট্টগ্রামের মানুষ নন, দেশের নানা অঞ্চলের মানুষ কাজ করেন, ব্যবসা করেন। বন্দরের চাকরি কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য কখনো চট্টগ্রামের জন্য কুক্ষিগত করা হয়নি। এই বন্দর সবার, সব মানুষের। তাই চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে যে ছয় হাজারের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন তাদেরকে কখনো কোনদিন কার বাড়ি কোথায় এই বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দর বছরে যে এক হাজার কোটি টাকা আয় করে তা কখনো শুধু চট্টগ্রামের জন্য খরচ করা হয়নি। এই টাকা থেকে পানগাঁও টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে। পায়রা বন্দর হচ্ছে। মাতারবাড়ি পোর্ট হচ্ছে। সরকারি কোষাগারেও জমা দেয়া হয়েছে। দেশের নানা স্থানে দান অনুদান হয়েছে।

এসব নিয়ে কেউ কোনদিন কোন কথা বলেন নি। বলতে চান নি। এই অঞ্চলের মানুষ বরাবরই চট্টগ্রাম বন্দরের কল্যান, সমৃদ্ধি এবং সাফল্য চেয়েছেন। নানাভাবে সহায়তা করেছেন। করছেন। কষ্ট পেলেও বন্দরের স্বার্থে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে কোনদিন কেউ কিছু বলেন নি। ঘন্টার পর ঘন্টা যানজট সহ্য করেছেন, ফ্লাইট মিস করার দুর্ভোগ সয়েছেন, স্কুল কলেজ মিস করেছেন তবুও মানুষ চেয়েছেন বন্দর সচল থাক। ঠিক যেমনটি নানা যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠা বাপ মাও চান যে, সন্তান থাকুক দুধে ভাতে। দেশের প্রধান এই বন্দরকে বুকের সব ভালোবাসা উজাড় করে দেয়া চট্টগ্রামের সেই মানুষগুলোর আজ বড় দুর্দিন। ভয়াবহ রকমের কষ্টে আছেন তারা। কষ্টে আছেন এখানকার ধনী গরীব সব মানুষই। উদ্বেগ, উৎকন্ঠা আর অনিশ্চয়তায় চোখে মুখে অন্ধকার দেখছেন এখানকার হাজারো মানুষ। অগাধ সম্পদের মালিক হয়েও জীবন বাঁচানো যাচ্ছে না। প্রভাবশালী বহু মানুষও চরম অসহায় হয়ে উঠেছেন। মানুষের কষ্টে বিবর্ণ হচ্ছে সময়। করোনা মহামারীতে তছনছ হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের বহু মানুষের জীবন। হাসপাতাল খুঁজতে খুঁজতে পথে ঘাটে মরছেন মানুষ। এম্বুলেন্সে ছটফট করতে করতে, গাড়িতে আকুলি বিকুলি করতে করতে মারা যাচ্ছেন এক একজন। এরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এক লিটার গ্যাস পাচ্ছেন না। শ্বাসকষ্ট নিয়ে ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো ছটফট করতে করতে কিংবা পুকুরে ডুবিয়ে ধরা অভাগার মতো আকুলি বিকুলি করতে করতে জীবন যাচ্ছে অনেকের।

করোনা পরীক্ষায় পজেটিভ রিপোর্ট পাওয়া হতভাগাদের মধ্যে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের হিসেব থাকলেও ‘করোনা উপসর্গ’ নিয়ে ছটফট করতে করতে যারা মারা যাচ্ছেন তাদের কোন হিসেবই কোথাও নেই। এরা পথে ঘাটে গাড়িতে, এম্বুলেন্সে, ঘরে কিংবা বাড়িতে হারাচ্ছেন মূল্যবান জীবন। শুধু চট্টগ্রামই নয়, তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজারসহ পাঁচটি জেলার দুই কোটিরও বেশী মানুষ আজ মাত্র ২০টি আইসিইউ এবং শ’চারেক সাধারণ বেডের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাঁচা তো দূরের কথা, শান্তিতে মরার জন্যও একটি আইসিইউ বেড, ভেন্টিলেশন কিংবা হাইফ্লো অক্সিজেন জুটছে না। হাসপাতালে বেড জুটছে না চট্টগ্রামের হাজারো মানুষের। ফ্লোরে গড়াগড়ি করছেন মানুষ। কয়েক জন শীর্ষ ধনী করোনায় অনেকটা বিনে চিকিৎসায় মারা যাওয়ার পর অবস্থাপন্নদের অনেকেই ঢাকা পাড়ি দিয়েছেন। কেউ কেউ চাটার্ড বিমানে বিদেশে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ ? যাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, যাদের কোথাও পালানোর পথ নেই তারা চরম অনিশ্চয়তায় দিন এবং রাত কাটাচ্ছেন। অপ্রতুল চিকিৎসা ব্যবস্থায় চোখে মুখে অন্ধকার দেখা চট্টগ্রামের লাখো মানুষের মুখে মুখে একটি প্রশ্ন ঘুরছে কয়েক দিন ধরে।

চট্টগ্রাম বন্দর কেন এগিয়ে আসছে না ? করোনা আতংকে এবং আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে ছটফট করতে থাকা দিশেহারা মানুষগুলোর সামনে তো চট্টগ্রাম বন্দর অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে। প্রায় চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে পড়ে আছে। এই টাকার এক বছরের শুধু সুদের কিয়দাংশ খরচ করলেই তো মানুষ স্বস্তিতে নি:শ্বাস নিতে পারেন। বুক ভরে শ্বাসটা অন্তত নিতে পারেন। কিন্তু কি করছে বন্দর! মানুষ থাকলেই তো বন্দর। মানুষই যদি না থাকে তাহলে কি

লেখক : প্রধান প্রতিবেদক, দৈনিক আজাদী।