নিউজটি শেয়ার করুন

মানবতার ফেরিওয়ালা শিল্পপতি সুকুমার চৌধুরী

এস প্রকাশ পাল: রাজনীতিক হিসেবে ১৯৮৪ সাল থেকে সক্রিয় আছেন মাঠে, কিন্তু পদ-পদবীর পরোয়া করেননি কখনও, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে করে গেছেন মানবসেবা। একজন জনপ্রতিনিধি না হয়েও কীভাবে মানুষের সেবা করতে হয় তা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি।

করোনাকালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন ত্রাণ, ভালোবাসার উপহার।

তিনি শিল্পপতি সুকুমার চৌধুরী, গরীব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে হয়েছেন ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’। সক্ষম হয়েছেন সবার হৃদয় স্পর্শ করতে। ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এই দায়িত্ববোধ থেকেই করোনার সংকটময় মুহূর্তে তিনি ক্লান্তিহীনভাবে সকাল-সন্ধ্যা ছুটে বেড়াচ্ছেন ক্ষুধার্ত মানুষের খোঁজে। দাঁড়াচ্ছেন পাশে, দিচ্ছেন নানা সহায়তা, জোগাচ্ছেন সাহস আর প্রেরণা।

সুকুমার চৌধুরীর জন্ম কর্ণফুলীর তীরঘেঁষা চান্দগাঁও থানার মোহরায়। শ্রীমতী রেণু প্রভা ও গৌরাঙ্গ চন্দ্র চৌধুরীর ১ম সন্তান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে অগ্নিঝরা উত্তাল দিনগুলোতে তিনি মোহরা এ.এল খান উচ্চ বিদ্যালয়ে থাকাকালীন ছাত্র-রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সেকান্দার হায়াত খানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগঠিত করেন ও পলোগ্রাউন্ড মাঠে বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগ দেন।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মোহরা এ.এল খান উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে তিনি মেট্রিকুলেশন ও নোয়াপাড়া কলেজ থেকে ১৯৭৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এরপর চট্টগ্রাম সিটি কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ও বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালে রাজনৈতিক গুরু প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনীতিতে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নেন।

পরবর্তীতে রাজনীতিবিদ ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, আ.জ.ম নাছির উদ্দীন, মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রাক্তন সভাপতি অভিজিৎ ধর বাপ্পীসহ বিশিষ্ট রাজনীতিকদের সংস্পর্শে আসেন।

১৯৮০ সালে সুকুমার চৌধুরী রেয়াজউদ্দিন বাজারস্থ পারিবারিক ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ নুরুল ইসলাম বিএসসি’র হাত ধরে এই সময়ে ব্যবসায় উন্নতির পাশাপাশি তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নুরুল ইসলাম বিএসসি’র নির্বাচনী কার্যক্রমে তিনি মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের দুর্দিনে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন।

১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় তাঁর জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। দুর্দশাগ্রস্ত জলোচ্ছাস পীড়িত মানুষের সেবায় তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং নিজ গ্রাম মোহরা, চান্দগাঁও ছাড়াও বোয়ালখালী ও চকরিয়ায় তিনি ব্যাপক ত্রাণ সহায়তা চালান।

বিগত ৩৫ বছরে তিনি অসংখ্য মঠ-মন্দির, মসজিদ, অনাথালয়, এতিমখানা ও দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ব্যবসায়িক জীবনের শুরুতে এসএন কর্পোরেশনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে সানোয়ারার পণ্য সরবরাহক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর বায়োল্যাক ফুডস লিমিটেড, অস্ট্রেলিয়ার রেড কাউ মিল্ক বাজারজাত করার দায়িত্বও নেন।

১৯৯১ সালের শেষের দিকে তিনি ঢাকায় এমেক্স নিটিং ও ডায়িং লিমিটেড, অমিত ফুটওয়্যার লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসায় ধারাবাহিক সফলতার ধারায় তিনি গাজীপুরে অমিতি সুয়েটার্স লিমিটেড ও অমিতি কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেন। রপ্তানীমুখি এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে এখন শত শত শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

দেশে মহামারি করোনা সনাক্ত হওয়ার পরপরই জনসচেতনতায় তৎপর হন শিল্পপতি সুকুমার চৌধুরী। গাড়িভর্তি খাদ্যসামগ্রী (চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, লবণ, মিষ্টি কুমড়া) এবং রমজানে ইফতার ও সেহরি সামগ্রী (চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনি, চিড়া, ছোলা, সেমাই) পৌঁছে দিয়েছেন নিম্নবিত্ত মানুষের ঘরে ঘরে। তাঁর নিজ এলাকা চান্দগাঁও থানাধীন মোহরা এলাকার গরীব, অসহায়, দিনমজুরসহ নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত প্রায় ১০ হাজার পরিবারকে পৌঁছে দিয়েছেন ভালোবাসার উপহার। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এবং ঘামঝরা দুপুরে এখনও অবিরাম ছুটে চলেছেন দুঃস্থ মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটাতে।

ত্রাণ সামগ্রী ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে সহায়তা করছে গৌরাঙ্গ নিকেতনের সদস্য, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।

তাঁর এই কর্মযজ্ঞ শুধুমাত্র মোহরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের মাঝেও বিতরণ করা হয়েছে খাদ্যসামগ্রী। এছাড়াও শিশুদের জন্য এক হাজার হতদরিদ্র পরিবারের কাছে ডিম এবং দুধ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনভিত্তিক নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি, স্থানীয় কাউন্সিলর, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমেও অসহায়দেরকে পৌঁছে দিয়েছেন ভালবাসার উপহার। বিশেষ ত্রাণ দিয়েছেন প্রতিবন্ধীদের মাঝেও।

সুকুমার চৌধুরীর ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সার্বিক তত্তাবধান করছেন পুত্র তরুণ সমাজহিতৈষী অমিত চৌধুরী।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই আমার বাবার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার দরিদ্র মানুষকে ভালোবাসার উপহার সামগ্রী সুষ্ঠুভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। করোনা ভাইরাসের কারণে দিশেহারা হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষ কর্মমুখী না হওয়া পর্যন্ত এই ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত থাকবে।

সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসাবে সুকুমার চৌধুরী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত আছেন। তিনি চট্টগ্রাম আবাহনীর পরিচালক ও দীর্ঘদিন ক্লাবের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগরী পূজা পরিষদসহ অনেক সংগঠনের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে আজ বাংলাদেশে পবিত্র জন্মাষ্টমীর জাতীয় ছুটি পালিত হচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার শুভ সূচনা হয়। তাঁরই উদ্যোগে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্রতিমার বিসর্জন অনুষ্ঠান আয়োজনের সূচনা হয়।

শুরু থেকেই তিনি বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের কার্যকরী কমিটির সদস্য।

জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগে তিনি অসংখ্যবার প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত লাভ করে স্নেহধন্য হয়েছেন।

এক পুত্র ও এক কন্যার জনক সুকুমার চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানী, ইতালী, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, চীন, হংকং, ভারত, মালেশিয়া, সিংগাপুরসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। বর্তমানে তিনি মোহরা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ প্রসঙ্গে শিল্পপতি সুকুমার চৌধুরী বলেন, বিশ্বময় আমরা এক মহাসঙ্কটের মুখোমুখি। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সারা বিশ্বেই অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি হয়েছে। জীবন বাঁচাতে ঘরে থাকার ফলে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের লোকগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছে। অনেকের ঘরেই খাদ্যসামগ্রীর সংকট। দরিদ্ররা সাহায্য চাইতে পারলেও মধ্যবিত্তরা লজ্জায় চাইতে পারে না। সবাই আছে চরম সংকটে।

তিনি বলেন, জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনার সংকট মোকাবেলায় বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা সহ জাতির ক্রান্তিকালে পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি মানবতার নেত্রী হিসেবে সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছেন। তাঁরই অনুপ্রেরণায় আমার সাধ্যমতো ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছি। যে কোনও দুর্যোগ মোকাবেলায় গৌরাঙ্গ নিকেতন পরিবার মানুষের পাশে রয়েছে। যারা এই কর্মযজ্ঞে অংশ নিয়ে ত্রাণ বিতরণে সহযোগিতা করছেন তাদের প্রতিও রয়েছে ভালোবাসার ঋণ। অসহায় মানুষের পাশে থাকতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। মানবসেবার চেয়ে আর বড় কিছু নেই। মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারের পাশাপাশি কর্পোরেট হাউসসহ বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে সংকট মোকাবেলা সহজতর হবে।