নিউজটি শেয়ার করুন

মুক্ত কর ভয়…

পাহাড়ী ভট্টাচার্য: “I don’t think of all the misery, but of the beauty that still remains.” – Anne Frank.

উহানে নভেল করোনাভাইরাসে মৃত ও আক্রান্তের তথ্য লুকিয়ে আসছিল চীন, এমন অভিযোগ ছিল দেশটির বিরুদ্ধে। সপ্তাহ খানেক আগে লকডাউন তুলে নেয়ার পর স্থানীয়রাও এ নিয়ে বিতর্ক তোলে। সর্বশেষ, স্থানীয় প্রশাসন শহরটিতে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা সংশোধন করল।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরের কথিত যে ওয়েট মার্কেট বা বন্য প্রানীর বাজার থেকে কভিড-১৯ নামক সংক্রামক ভাইরাসটির উৎপত্তি ও বিস্তারের ঘটনাবলি বিশ্বজুড়ে প্রচার করেছিল বেজিং, তা এখন খুলে দেয়া হয়েছে। রাজধানী বেজিং, সাংহাই, গুয়াংজো, ইউয়ান, হুবেই সহ চীনের সব শহর এখন কম-বেশী স্বাভাবিক, প্রাণচঞ্চল। করোনায় নতুন কোন সংক্রমন ও মৃত্যু নেই বলে প্রচার। দ্রূতগতিতে ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে ইয়েন, বৈশ্বিক শেয়ার বাজারে চীনের আধিপত্য তুলনামূলকভাবে জোরদাড় হওয়ার পাশাপাশি সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে দেশটি উৎপাদন ও রফতানি বাড়িয়েছে মাস্ক, টেস্টিং-কিট, স্যানিটাইজার, পিপিই, ভেন্টিলেটর সহ এ করোনা-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় পণ্য-সামগ্রীর।

করোনা-বহ এ সময়ে, অবস্হাদৃষ্টে, মনে হচ্ছে,আমরা, বিশ্ববাসী টান টান উত্তেজনার এক সায়েন্স ফিকশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, এখনো, ফিকশনটির-ই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছি, যদ্যপি, শেষ অঙ্ক আমাদের অজানা!

ভোজবাজির মত চীনের একটি প্রদেশে কোভিড-১৯-র আবির্ভাব, সেখানেই সংক্রমন ও মৃত্যু সীমিত থাকা, মাত্র ৩ মাসের মাথায় ভেল্কিবাজির মত এটিকে নিয়ন্ত্রণ করার দাবী, ইত্যবসরে, প্রাণঘাতি ভাইরাসটি বিশ্বের নানা দেশে দেশে ও প্রান্তে দ্রূত ছড়িয়ে পড়া, লক্ষ লক্ষ সংক্রমন ও হাজারো মানব-মৃত্যুর মিছিল অব্যহত থাকা, এই ইস্যুতে খোদ রাষ্ট্র-সংঘের প্রথমাবধি অবিশ্বাস্য রকমের নিরবতা, “হু” বা বিশ্ব স্বাস্হ্য সংস্হার বিতর্কিত এবং দৃশ্যত চীনা-পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ও ভুমিকা, জনগনের ওপর, দেশে দেশে, রাষ্ট্র-আরোপিত গৃহবন্দিত্ব, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক- মন্দার পদধ্বনি, করোনার নিত্য নতুন উপসর্গে, সংক্রমণ হারের মাত্রায় ও মৃত্যুতে, সর্বত্র সৃষ্ট সামষ্টিক ভীতিকর ও প্রবল উৎকন্ঠার বাতাবরণের বিস্তৃতিতে আজ বাংলাদেশ সহ গোটা পৃথিবীর মানুষ তটস্হ, সভ্যতা বিপন্ন-প্রায়!

তথ্য গোপন ও ভাইরাস-সংক্রমণ ছড়ানোর অভিযোগ এনে চীনের বিরূদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে ৮৫টি রাষ্ট্র মামলা দায়ের করেছে ইতিমধ্যে। বিশ্ব, করোনা সংক্রমন রহস্য ও কার্যকারণ নিশ্চয় জানবে একদিন।

স্বভাবতই, সাধারণ মানুষের মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ পূর্ব-ধারণার অনুপস্হিতি, ভাইরাসটি আদতেই কি প্রানীজ, প্রকৃতি-জাত না মানবসৃষ্ট তা স্পষ্টতর না হওয়া, সর্বোপরি, এর ধরণ ও মৌলিক গঠনগত পূর্ণাঙ্গ স্বরূপটি অজানা থাকায় ও অদ্যবধি কোন প্রতিষেধক অাবিষ্কৃত না হওয়ায় এটির সংক্রমনের বিরূদ্ধে মানুষের কার্যকর প্রতিরোধ দৃশ্যত দুরহ হয়ে দাড়িয়েছে। বিষয়গুলো স্পষ্ট করার দায় ও দায়িত্ব কাদের ওপর বর্তায়? নিসন্দেহে তা বহুলাংশে রাষ্ট্রসংঘ, হু এবং সংক্রমন-এর উৎস রাষ্ট্রের।

সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ-এর মত সু-মহান সব মতাদর্শকেই প্রকারান্তরে যেন বিতর্কিত করতেই “কম্যুনিষ্ট” মোড়কে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে আজ প্রবল কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্হার রাষ্ট্র চীন। চীনের অনেক কিছুর মতই কোভিড-১৯ সহ অসংখ্য প্রাণঘাতি ভাইরাস ও জৈব-রাসায়নিক মারণাস্ত্র নিয়ে দীর্ঘকাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা-কর্মের বিষয় বিশ্বের কাছে গোপন। এশিয়া ছাড়িয়ে গণচীন তার প্রভাব-বলয় বিস্তার করতে মরিয়া বিশ্বময়। আর এ প্রভাব ও কতৃর্ত্ব, বেশ উচ্চাভিলাষী, যা একইসাথে বানিজ্যিক,অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক।

শুধু চীন একা নয়। মারণঘাতি নানা ভাইরাস কিংবা জৈব রাসায়নিক অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা-কর্ম চালাচ্ছে আমেরিকা, ইসরায়েল, উত্তর- কোরিয়া, ইরান, ভারতবর্ষ, পাকিস্তান সহ পশ্চিমা বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্র। ইরাকে কিংবা সিরিয়ায় যূদ্ধে এ জৈব-রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে বলে অনেকের ধারনা, যা সাম্প্রতিক ঘটনা। কিছু দেশের এহেন অপতৎপরতার বিরূদ্ধে রাষ্ট্রসংঘের কার্যকর ব্যবস্হা, তদারকির অভাবে, বিশ্বব্যাপী জৈব রাসায়নিক অস্ত্র নির্মূলীকরণ কর্মসূচিতে ভাটা পড়ায় ও প্রচারণার দৌর্বল্যে দিনের পর দিন এসব অবাধগতিতে অব্যহত আছে।

বিশ্বব্যাপী প্রাণ, ভূ-প্রকৃতি,পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষায় মানবজাতির ব্যর্থতা, প্রকৃতি ও ধরিত্রী-বিনাশী নিত্য ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষের সীমাহীন লাভ-লোভ-মোহের ফলে বৈশ্বিক বায়ূমন্ডলে সৃষ্ট নানাবিধ পরিবর্তন-জনিত সমস্যা-সংকটও আজকের এ করোনা-প্রাদুর্ভাবের কালে প্রাসঙ্গিক ও সবিশেষ স্মর্তব্য।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল মিলে দায়ী করছে চীনকে, আর চীন দায়ী করছে যুক্তরাষ্ট্রকে; আবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো দায়ী করছে ইসরাইলকে জৈব মারণাস্ত্র তৈরির উদ্ভাবক হিসেবে।

ইউরোপ ও আমেরিকা সহ পস্চিমা বিশ্ব ব্যাপক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে, জন-সচেতনতায়, গণমুখি সামাজিক বহুবিধ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্হায় করোনা-পরিস্হিতিটি সামাল দিচ্ছে। তারা সফল করছে দীর্ঘমেয়াদি গৃহ-বন্দিত্ব, লক-ডাউন, সে সাথে চলছে দ্রূতগতিতে সংক্রমিত জনগোষ্টী চিন্হিতকরণ, পৃথকীকরণ, কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতকরণ, আইসোলেশন, জনগনের মনোদৈহিক ও রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা, যথাযথ চিকিৎসা-সেবা, প্রয়োজনীয় খাবার, অর্থ, এমনকি বাড়ি ভাড়া প্রদানসহ নাগরিকদের ফ্রি ইন্টারনেট ও বিনোদন এবং বিনামুল্যে নানা পরিসেবা সমেত ঘর-বন্দি রাখার বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ!

বাংলাদেশের মত ৩য় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য প্রকৃতই, করোনা-পরিস্হিতি মোকাবেলা কষ্টসাধ্য। ইতিমধ্যে, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও তৎপরতায় ঘোষিত সরকারী ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি, সংক্রমিত এলাকা বিশেষে লকডাউন,আমাদের স্বাস্হ্য অধিদপ্তর কর্তৃক গোটা দেশকে করোনা-ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষনা, এ দুর্যোগ মোকাবেলায় ত্রান বরাদ্ধ, জেলা-প্রশাসন কর্মকর্তাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্সিং, দরিদ্র শ্রমজীবি, চিকিৎসা-কর্মী, ব্যাবসায়ী ও কৃষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রনোদনা ও বীমা-সুবিধা ঘোষনা, সম্প্রতি করোনা-সংশ্লিষ্ট এসকল কর্মকান্ড, দেরিতে হলেও, শুরু হয়েছে বলা চলে। বাংলাদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল ইতিমধ্যে একে “জাতীয় দুর্যোগ” হিসাবে বিবেচনার দাবী জানিয়ে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারকে দাবী জানিয়েছে। রাজনৈতিক দলসমূহ, ব্যক্তি এবং বহু প্রতিষ্ঠান বিশেষের উদ্যোগে ইতিমধ্যে দেশের নানাপ্রান্তে সাধারন মানুষদেরকে হ্যান্ড সেনিটাইজার, সাবান, মাক্স, খাদ্যসামগ্রী, নগদ অর্থ ইত্যাদি বিতরণ করা হচ্ছে। গণ- জমায়েত পরিহার করে ও শারিরীক দুরত্ব বজায় রেখেই স্বাস্হ্যসম্মতভাবে এসব পরিচালিত হওয়া নিশ্চিত করা বিশেষ জরুরী।

বাংলাদেশের জনগনের বড় অংশ, বিশেষত দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ, নিন্মবিত্ত, কর্মজীবী মানুষ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্ম ও আয়হীনতার আশঙ্কায়, সামাজিক সুরক্ষার অভাবে ও এবংবিধ নানামাত্রিক সঙ্গতকারণে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তায় রয়েছে। সরকারী-বেসরকারী ত্রান,খাদ্য ও বরাদ্ধকৃত অর্থ সরাসরি মানুষকে পৌঁছানো ও তাদেরকে নিরাপদে অ-সংক্রমিত রাখা, জীবন ও পেশার নিশ্চয়তা দেয়াই আজ বড় কাজ। পাশাপাশি, কৃষি উৎপাদন, বন্ঠন ও বাজারজাতকরণ নির্বিঘ্ন করা, চিকিৎসকদের পিপিই সরবরাহ, খাদ্য, বাসস্হান নিশ্চিতকরণ, বৃহৎ বেসরকারী চিকিৎসা খাতকে একাজে সস্পৃক্তকরণ,ত্রান চুরি ও পণ্য মজুতদারি রোধ, দুর্নীতি-দলীয়করণ-স্বজনপ্রীতি, সংকীর্ন রাজনৈতিক ও হীন ব্যক্তি স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে এই দুর্যোগে, বৈশ্বিক বিপর্যয়ে দল-মত নির্বিশেষে সকলকে সৃদৃঢ় ঐক্য ও সংহতি গড়তে হবে, নিতে হবে জাতীয় ও তৃণমূল স্তরে মূল্যবান প্রতিটি জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয়, সাম্বাব্য সব রকমের উদ্যোগ ও পদক্ষেপ ।

আমাদের আজ জয় করতে হবে সব ভয়, ভাঙ্গতে হবে অচলায়তন, পার করতে হবে সংকটময় এ করোনাকাল।পরমতর ধৈর্যে, গভীর মমত্বে, দুরদর্শীতায়, মানবিকতায়। অপরিহার্যভাবেই, পুণর্বিন্যাস ঘটাতে হবে আঙ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতির, করোনা-কাল পরে।