যুবলীগ যখন গঠন করা হয়, তখন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়া শেখ ফজলুল হক মনির বয়স ছিল ৩২ বছর; এর ৪০ বছর পর সংগঠনটির গত কাউন্সিলে ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন ৬৪ বছর বয়সে।
ক্যাসিনোকাণ্ডে ব্যাপক আলোচনায় থাকা আওয়ামী লীগের যুব সংগঠনটির নেতৃত্বে এবার কে আসছেন, তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য চেয়ারম্যান কোন বয়সী হবেন, তা নিয়েও রয়েছে কৌতূহল।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যে বলেছেন, যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রোববারের বৈঠকে যুবলীগে বয়সসীমার প্রসঙ্গটিও উঠবে।
যুবলীগের গঠনতন্ত্রে এখন সংগঠনের সদস্যভুক্তিতে কোনো বয়সসীমার উল্লেখ নেই। তবে বাংলাদেশের জাতীয় যুবনীতিতে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের যুবক হিসেবে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার আলোকে ২০১৪ সালের ২৭ নভেম্বরে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ ওমর ফারুক যখন যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন, ততদিনে প্রবীণের খাতায় তার নাম উঠে গেছে।
স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ গড়ে তুলেছিল যুবলীগ; তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ মনিকে।
১৯৭৪ সালে যুবলীগের প্রথম কংগ্রেসে শেখ মনিই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ওই সময় তার বয়স ছিল ৩২ বছর। তখন যুবলীগের গঠনতন্ত্রে ৪০ বছরের একটি বয়সসীমার বিধান ছিল।
সাংগঠনিক কার্যক্রমে দক্ষ হিসেবে পরিচিত মনি পঁচাত্তর ট্রাজেডিতে প্রাণ হারান। তারপর বিরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ১৯৭৮ সালে যুবলীগের দ্বিতীয় কংগ্রেসে বয়সসীমার বিধানটি বিলুপ্ত করা হয় বলে সংগঠনের নেতারা জানান।
ওই কংগ্রেসে যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান আমির হোসেন আমু। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী পেরিয়ে এখন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমুর বয়স তখন ছিল ৩৮ বছর।
১৯৮৬ সালের তৃতীয় কংগ্রেসে যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোস্তফা মহসীন মন্টু। তখন তার বয়স ছিল ৩৭ বছর। আওয়ামী লীগ ছেড়ে আসা মন্টু এখন কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন গণফোরামের নেতা হিসেবে পুরনো দলের সমালোচনায় মুখর।
১৯৯৩ সালে যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন। এরপর ১৯৯৬ সালের চতুর্থ কংগ্রেসে ৪৭ বছর বয়সে যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
শেখ মনির ভাই শেখ সেলিম ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকারে মন্ত্রী ছিলেন। এখন তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীতে রয়েছেন।
শেখ সেলিম বিদায় নেওয়ার পর ২০০৩ সালের পঞ্চম কংগ্রেসে ৪৯ বছর বয়সে যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর কবির নানক।
নানক মন্ত্রিত্ব ও মূল দল আওয়ামী লীগে পদ পাওয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওমর ফারুক।
২০১২ সালে ষষ্ঠ কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান শেখ মনি ও শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি ওমর ফারুক। তারপর থেকে টানা সাত বছর দায়িত্ব পালনে পর এখন বায়াত্তরে পৌঁছেছে তার বয়স।
যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেখ সেলিম যুবলীগ থেকে বিদায় নিলেও তার প্রভাব সংগঠনটিতে থেকে যায়, আর সেই প্রভাব বলেই যুবলীগের শীর্ষপদে আসীন হন তার বোনজামাই ওমর ফারুক।
গত ছয় বছর ধরে নির্বিঘ্নে কাজ করে গেলেও সম্প্রতি ক্যাসিনোকাণ্ডে বড় ধাক্কা খান ওমর ফারুক, সেই সঙ্গে সমালোচনায় নাকাল এখন যুবলীগও।
যুবলীগ নেতাদের কর্মকাণ্ডে শেখ হাসিনা বিরক্তি প্রকাশের পর গত মাসে ঢাকার ক্রীড়া ক্লাবগুলোতে অভিযান চালিয়ে জুয়ার আখড়াগুলো বন্ধ করে দেয় র্যাব, এগুলো পরিচালনায় যুবলীগের নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসে।
র্যাবের অভিযান শুরুর পর ঢাকা মহানগর যুবলীগের শীর্ষনেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের পক্ষে দাঁড়িয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন ওমর ফারুক। পরে সম্রাট গ্রেপ্তার হলে চুপ মেরে যান ওমর ফারুক, তারপর থেকে যুবলীগের কার্যক্রম থেকে সরে থাকছেন তিনি।
এমনকি রোববার গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে যুবলীগ নেতাদের বৈঠকেও ওমর ফারুক থাকছেন না বলে খবর বেরিয়েছে। চেয়ারম্যানকে বাদ রেখেই কাউন্সিলের কাজ গোছাতে হচ্ছে সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদকে।
আসছে কারা…
ক্যাসিনোকাণ্ড নিয়ে আলোচনার মধ্যেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যুবলীগের কংগ্রেস বা কাউন্সিলের দিনক্ষণ ঘোষণা করে দেওয়া হয়। আগামী ২৩ নভেম্বর হবে এই কাউন্সিল।
বরাবর কংগ্রেসের আগে যুবলীগে ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেলেও পরিস্থিতি তেমন নয়। ‘শুদ্ধি অভিযানের’ মুখে অনেকে গা ঢাকা দিয়ে আছেন, যারা প্রকাশ্যে আছেন, তারাও মুখ খুলছেন না।
সক্রিয় যুবলীগ নেতাদের বাইরে আর যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তাদের কেউও আগ বাড়িয়ে আগ্রহের কথা প্রকাশ করছেন না।
পদ প্রত্যাশীদের অনেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ও ধানমণ্ডির দলীয় কার্যালয়ে যাওয়া-আসা এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ালেও তা কতটা কাজে আসবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন যুবলীগের নেতারা।
তারা বলছেন, এবার নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন, শেখ হাসিনা নিজেই তা ঠিক করবেন। বিভিন্ন জেলা ও সাংগঠনিক শাখা থেকে কংগ্রেসে দুই হাজারের বেশি প্রতিনিধি এলেও তারা দর্শক হয়েই থাকবেন।
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, “প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুবলীগের কংগ্রেসে কখনও ভোট হয়নি। কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নতুন নেতাদের নাম ঘোষণা করেন।”
যাদের নাম আলোচনায় আসছে, তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, “এখানে কেউ প্রার্থী হন না। অনেকে আলোচনায় থাকার চেষ্টা করেন বা নেতাদের কাছে নিজেকে তুলে ধরেন।”
আগের মতো নেতাদের দৌড়ঝাঁপ দেখা না যাওয়ায় এবার কর্মীরাও আভাস পাচ্ছেন না, কে হতে পারেন যুবলীগের চেয়ারম্যান। যুবলীগে যুক্ত নন, এমন কারও হাতে দায়িত্ব শেখ হাসিনা দিতে পারেন বলেও আলোচনা রয়েছে।
যুবলীগের বতর্মান কমিটির ১ নম্বর সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরী লিটন, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ মনির ছেলে সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস, আরেক ছেলে ফজলে শামস পরশ, শেখ সেলিমের ছেলে এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম, আরেক ছেলে শেখ ফজলে নাঈমের নামও আসছে ঘুরে ফিরে।
তারা সবাই বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য। শেখ সেলিমের প্রভাব বলয় এবার থাকবে, না কি তা ভেঙে যাবে, সেদিকেও কৌতূহলী দৃষ্টি যুবলীগকর্মীদের।
নেতৃত্বের দৌড়ে আছেন যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, বর্তমানে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শহীদ সেরনিয়াবাত, ফারুক হোসেন, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, আতাউর রহমান, বেলাল হোসেনও।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে আলোচনায় আছে বাহাদুর বেপারী, লিয়াকত শিকদার, নজরুল ইসলাম বাবুর নাম।
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ বদিউল আলম, সুব্রত পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক হাসান তুহিন, উপ-গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বাবলু, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এনআই আহমেদ সৈকত।
জাতীয় কংগ্রেসের আগে যুবলীগের দুই গুরুত্বপূর্ণ শাখা ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের সম্মেলন হওয়ার কথা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুই কমিটির শীর্ষনেতাদের নামও শেখ হাসিনার কাছ থেকে প্রত্যাশা করছেন যুবলীগ নেতারা।
কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবুল বাসার বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সম্মেলনের দুদিন আগে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের সম্মেলন হয়। এই সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমরা চেয়ারম্যানকে পাচ্ছি না।
“তাই প্রেসিডিয়ামের সভা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, উত্তর দক্ষিণের সম্মেলনসহ কেন্দ্রীয় সম্মেলন সফল করতে আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করব। রোববারের সভায় তিনি কিছু সিদ্ধান্ত দেবেন বলে আমরা আশা করছি।”
ঢাকা মহানগর উত্তরে নেতৃত্বের জন্য আলোচনায় রয়েছে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাসভীরুল হক অনু, উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক সাহাদাৎ হোসেন সেলিম, উপ-দপ্তর সম্পাদক এ এইচ এম কামরুজ্জাম কামরুল, সহ সভাপতি জাকির হোসেন বাবুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন সরকারের নাম।
দক্ষিণে আলোচনায় রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এইচ এম রেজাউল করিম রেজা, সহ-সভাপতি আনোয়ার ইকবাল সান্টু, ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি সৈয়দ আলাউল ইসলাম সৈকত, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম আকন্দ, দক্ষিণের উপ দপ্তর সম্পাদক খন্দকার আরিফুজ্জামান আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক মাকসুদ, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মুরশিদ শুভ ও দপ্তর সম্পাদক এমদাদুল হক এমদাদ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাফর ইকবাল রানা।
তবে যুবলীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনেক নামই এখন শুনবেন আপনারা; তবে কে কী হচ্ছে, তা শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেউ জানে না।”








