নিজস্ব প্রতিবেদক: রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা ইউনিয়নের ক্ষেত্রবাজার সংলগ্ন খেলার মাঠ দখল বেদখল নিয়ে চলছে তুলকালাম কান্ড। অথচ ৩ একরের বিশাল এই খেলার মাঠে একসময় খেলেছেন ইছামতির বাসু বড়ুয়া, পদুয়ার প্রভাত বড়ুয়া, রাইখালীর বিপ্লব মারমা, জনি মারমার মতো নামকরা ফুটবলাররা। শুধু সরফভাটা নয়, পুরো রাঙ্গুনিয়ার ক্রীড়ামোদি মানুষদের খেলাধূলা চর্চার বড় ঠিকানা ছিল এই মাঠটি।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০০৩ রাঙ্গুনিয়ার খেলোয়াড় তৈরির আঁতুরঘর খ্যাত এই মাঠটি দখল করে নেয় তৎকালীন বিএনপি সরকারের সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সাকা চৌধুরীর কিছু সাঙ্গপাঙ্গ।
তারা জানান, ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে আলোচ্য মাঠে আবাহনী-মোহামেডানের মাঝে একটি প্রীতিফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। রেফারির একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে খেলায় গন্ডগোল বেঁধে যায়। এসময় বেশ কয়েকজন আহতও হন। আর সেই সুযোগে নিজেদের জমি দাবি করে রাতারাতি বেশকিছু চারা রোপণ করে মাঠটি দখলে নেন সাকা চৌধুরীর সাঙ্গপাঙ্গরা।
তবে ২০০৮ সালে সরকার পরিবর্তনের পর পুনরায় আশায় বুক বাঁধে সরফভাটাবাসী। এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে আলোচনাও। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মাঠটিকে উদ্ধারে আন্তরিক হলেও আলোর মুখ দেখছিল না কিছুতেই। তবে শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার (১৮ মার্চ) বিক্ষোব্ধ এলাকাবাসী গাছ কেটে খেলার মাঠটি উদ্ধার করতে গেলে বেঁধে যায় বিপত্তি। এমনকি গাছ কাটার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের পরষ্পর বিরোধী বক্তব্যে অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তি।
বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান শেখ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুল ইসলাম সরফী, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি শামসুল ইসলাম, খোরশেদ আলম সুজনসহ একাধিক আওয়ামী লীগ, ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মো সেলিম, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দসহ একটি পক্ষ খেলার মাঠ উদ্ধারের বিষয়টিকে ক্রীড়ামোদী জনতার বিজয় উল্লেখ করে শুক্রবার সন্ধ্যায় মিছিল ও সমাবেশ করেছে।
এই ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান শেখ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সরফভাটার ৬৫ হাজার মানুষের জন্য এটি ছাড়া আর কোনো খেলার মাঠ নেই। অথচ দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে মাঠটি দখল করে রেখেছিল এক শ্রেণীর স্বার্থপর মানুষ। একসময় স্থানীয়রা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি খনন করে এই জায়গাটি খেলার মাঠে রূপান্তর করেন। আর সেই এলাকাবাসী যখন দেখলো তাদের সপ্নের সেই খেলার মাঠটি বছরের পর বছর দখল করে রাখছে একটি মহল এমনকি স্বার্থান্বেষী ঐ মহলের বিভিন্ন ফাঁদে এলাকাবাসীর দাবিটি আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় তারা নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যে কটি গাছ ছিল তা কেটে মাঠটি পুনরুদ্ধার করেছেন। আমি যেহেতু জনগণের প্রতিনিধি। তাই জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট, স্বতঃস্ফূর্ত চাওয়ার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আমার নেই।
অন্যদিকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুর রউফ মাস্টার, সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম উদ্দিন বাদশা, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইউনুচ, সাইমুম রউফসহ অপর একটি পক্ষ দিনভর গাছ কাটার বিষয়টিকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আহসান হাবীব বলেন, খেলার মাঠ প্রয়োজন তবে জায়গার মালিকদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে মাঠ দখলমুক্ত করা যেতো।
এদিকে মাঠ দখলমুক্ত করতে দুই শতাধিক গাছ কাটা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে এলাকাবাসী বলেন, গাছ না কেটে মাঠটি উদ্ধার করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যে প্রক্রিয়ায়, যখনই উদ্ধার হতো তখনই গাছগুলো কাটা লাগত বলে তারা জানান।
এই ঘটনায় বাগান মালিকদের পক্ষে মোজাহেরুল হক চৌধুরী নামে এক বাগান মালিক রাঙ্গুনিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন।
রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি (তদন্ত) মাহবুব মিল্কী কারা গাছ কেটেছে তা এখনো নিশ্চিত নয় জানিয়ে বলেন, রাতে একদল দুর্বৃত্ত কর্তৃক গাছ কাটার খবর পেয়ে পুলিশ পাঠানো হয়, তার আগেই দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যান। এঘটনায় বাগান মালিক মোজাহেরুল হক চৌধুরী অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেছেন বলে তিনি জানান।
এদিকে আওয়ামী লীগের এই দুই গ্রুপের এমন বাকযুদ্ধে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন সাধারণ জনসাধারণ। তারা বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন। সুস্থ মাধ্যমে এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে খেলার মাঠ বাস্তবায়ন করার আহবান জানিয়েছেন সাধারণ জনসাধারণ। এক্ষেত্রে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা৷
উল্লেখ্য, ১০ কানি আয়তনের এই খেলার মাঠটি ২০০৩ সালে একাধিক ভূমি মালিক দাবীকারীরা দখল করে নিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে এটি দখলমুক্তের দাবীর মুখে ১৮ বছর পর এটি নিয়ে আবারও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে সরফভাটা জুড়ে যা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো রাঙ্গুনিয়ায়ও।

