রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নে সিএনজি অটোরিক্সা পার্কিং করাকে কেন্দ্র করে চালক খুনের চার মাস পরও কোন আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
পরিবারের অভিযোগ, অজানা কারণে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করছে না।
তবে পুলিশ বলছে, তাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। উপার্জনক্ষম একমাত্র স্বামীকে হারিয়ে ৪ সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা।
গত ১১ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের রামগতির হাট বাজারে হামলার শিকার হন সিএনজি অটোরিক্সা চালক আহমদুল হক (৪৬)। এরপর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টায় তাঁর মৃত্যু হয়। তার পরিবারে স্ত্রী ও ৪ শিশুপুত্র রয়েছে। যারা বর্তমানে মানবেতর দিন পার করছেন।
মামলার বিবরণ ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, নিহত আহামদুল হক পেশায় একজন সিএনজি অটোরিক্সা চালক ছিলেন। তিনি রাউজানের পাহাড়তলি স্টেশন থেকে রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী রামগতির হাট বাজার পর্যন্ত সড়কে সিএনজি অটোরিক্সা চালাতো। প্রতিদিনের মতো তিনি গত ১১ অক্টোবর রাতে পাহাড়তলি থেকে যাত্রী নিয়ে বেতাগী রামগতির হাট আসেন। বাজারের সিএনজি অটোরিক্সা স্টেশনের নির্ধারিত খালি জায়গায় তিনি গাড়িটি পার্কিং করে রাখেন। কিছুক্ষণ পর মিথুন দাশ (৩০) নামে অপর একজন সিএনজি অটোরিক্সা চালক তার গাড়িটিও নিয়ে সেই স্থানে আসেন। এসেই তিনি আহমদুল হককে তাঁর গাড়িটি সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বলেন। তিনি কেন গাড়ি সরাবেন জিজ্ঞাস করাতে দুজনের মধ্যে বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে মিথুন দাশ তাঁকে মারধর শুরু করেন। তাঁর বাড়ি বাজারেরর কাছে হওয়াতে তিনি ফোন করে তাঁর ভাই পশ্চিম বেতাগী ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুনিল দাশের ছেলে ছোটন দাশ (৩২), পুলক দাশ (২৮), লিটন দাশ (৩৫) এবং প্রতিবেশী ওই এলাকার কিরণ দাশের পুত্র রুবেল দাশকে (৩০) বাজারে ডেকে আনেন।
এদিকে হামলাকারিদের মারমুখি অবস্থান দেখে হামলার স্বীকার আহমদুল হক তাঁর গাড়ি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। হামলাকারীরা লোহার রড, লাঠিসোঠা সহ দেশীয় অস্ত্র হাতে তাঁকে এলোপাথারী মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে থেতলিয়ে ফেলে এবং গুরুতর রক্তাক্ত করে যখম করেন।
পরে স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। তাঁকে সেখান থেকে উদ্ধার করে প্রথমে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ও পরে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরী বিভাগে দীর্ঘ ১৬ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় নিহতের ভাই মাহবুব আলম (৫৬) বাদী হয়ে রাঙ্গুনিয়া থানায় হামলাকারীদের বিবাদী করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু ঘটনার ৪ মাস পেরিয়ে গেলেও হত্যাকারী কোন আসামীকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার বাদী মাহবুব আলম বলেন, “ভাইয়ের হত্যাকান্ডের পর হামলাকারীরা উল্টো ক্রমাগত তাদের হুমকি দিয়ে চলেছে। এদিকে আমার ছোট ভাই নিহত আহমদুল হক পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। আসামীরা প্রায়ই প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করা সহ এলাকার আশেপাশের অবস্থান করছেন। কিন্তু বেশ কিছুদিন থেকে এমন চললেও অজানা কারণে পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি।”
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রাঙ্গুনিয়া থানার উপপরিদর্শক (এস আই) মো. রাকিব বলেন, ‘মামলার মূল তদন্তকারী কর্মকর্তার বদলিজনিত কারণে অন্যত্র চলে যাওয়ায় গত ১ মাস ধরে এই মামলাটি আমার দায়িত্বে আসে। আসামিকে গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আশাকরি আসামিরা দ্রুত আইনের আওতায় আসবে।”
নিহত আহমদুল হক পার্শ্ববর্তী রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের ৭নম্বর ওয়ার্ড কোয়ে পাড়া এলাকার আবুল ফয়েজের ছেলে। চার ছেলে ছোট থাকা অবস্থায় আহমদুল হক মারা যান। পরে তার স্ত্রী ইয়াছমিন আক্তার অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে দিন পার করছেন। আহমদুল হকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকাহত স্ত্রী ইয়াছমিন আক্তার ঘরের দরজায় বসে আছেন।
সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে ইয়াছমিন আক্তার জানান, তার বড় সন্তানের বয়স মাত্র ১০ বছর। তাঁর স্বামীকে হারিয়ে তার দুই সন্তানকে ইতিমধ্যেই এতিমখানায় দিয়ে দিয়েছেন। একজন থাকে নানার বাড়ি। অন্য একজনকে তিনি নিজের কাছে রেখে অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “সামান্য সিএনজি অটোরিক্সা রাখাকে কেন্দ্র করে আমার একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীকে নির্মম ভাবে পিঠিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমার সন্তানগুলো এতিম হয়ে গেছে। আমাদের ভবিষ্যত এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।’
আহমদুল হকের চাচা কামাল উদ্দিন সওদাগর বলেন, ‘পুলিশ তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও একই এসেছে। পুলিশ তদন্তে গেলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরাও ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। কিন্তু এরপরও পুলিশ একজন আসামীকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। মামলার বাদিরা খুবই গরীব এবং নিরীহ।
পুলিশ যদি এভাবে এই হত্যা মামলাকে অবহেলা করেন তবে আল্লাহর উপর ভরশা করা ছাড়া কোন উপায় নেই।’ তিনিও আসামীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবী জানান।








