নিউজটি শেয়ার করুন

রোহিঙ্গাদের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে

রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ সুষমভাবে পরিচালিত উন্নয়ন কর্মসূচির সুফল পাচ্ছেন না। তাই সবার আগে জেলার সৃষ্ট ঝুঁকিগুলো সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে যৌথভাবে চিহ্নিত করে সেই লক্ষ্যে একটি সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষাকে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং সকল পর্যায়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুরে কক্সবাজারের স্থানীয় একটি হোটেলের হলরুমে এনজিও সংস্থা কোস্ট ট্রাস্ট ও ইউএনএইচসিআর এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত (টুগেদার ফর বেটার রোহিঙ্গা রেসপন্স আনটিল রিপ্রাট্রিয়াশেন এন্ড ফ্যাসিলেটিটিং ডেভেলপমেন্ট ইন কক্সবাজার)’ শীর্ষক এই আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী এবং কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরামের আবু মোর্শেদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক কে এম আব্দুস সালাম।

প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসূচি বাস্তবায়নে এনজিও ব্যুরো সমন্বয় নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। তহবিলের একটি অংশ যেন স্থানীয় এলাকার জন্য নির্ধারিত থাকে সেই বিবেচনা করবো এবং এনজিওদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। অতিথিদের বক্তব্যে নারী সংগঠক শিরিন হক বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং স্থানীয় এলাকা দুই জায়গাতেই নারী ও মেয়েরা পাচার হয়ে যাওয়া এবং সহিংসতার ঝুঁকিতে আছে। কর্মপরিকল্পনায় এ বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় আনতে হবে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ এবং লেখক গওহর নইম ওয়ারা বলেন, অনেক ছাত্রছাত্রী চাকরি করছেন, এই বাস্তবতাটা মেনে নিয়ে স্কুল-কলেজের সময়সীমা পরিবর্তন করা যায় কিনা ভেবে দেখতে হবে।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ আব্দুল লতিফ খান বলেন, আলাদা আলাদাভাবে ঝুঁকি বা সমস্যা চিহ্নিত না করে সবাই মিলে কক্সবাজারের ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে সেই মোতাবেক কর্মসুচি প্রনয়ন করতে হবে। ত্রাণ কর্মীর আবাস এবং সকল সংস্থার কার্যালয় হওয়া উচিৎ ক্যাম্প এলাকার আশপাশে। ইউএনএইচসিআর-এর সিনিয়ন অপাররেশন ম্যানেজার হিনাকো টকি বলেন, ইউএনএইচসিআর স্থানীয় এলাকায় প্রায় ৮০টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, এবং অনেক অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছে। ৬ হাজার নারীর জীবিকা নিশ্চিত করতে কাজ করছে ইউএনএইচআরসি।

আইওএম-এর কক্সবাজার প্রধান ম্যানুয়েল মনিজ পেরেইরা বলেন, উখিয়া-টেকনাফের স্থায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়নে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, অনেক ছাত্রছাত্রী, এমনকি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীও চাকরিতে যোগ দিচ্ছে, অনেক শিক্ষক উচ্চন বেতনে বিভিন্ন সংস্থায় যোগ দিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কক্সবাজারে শিক্ষাবিহীন একটি প্রজন্ম গড়ে উঠবে।

সভাপতির বক্তব্যে রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে বিমান বন্দর, অত্যাধুনিক রেললাইন, বড় বিদ্যুত কেন্দ্র ও আশ্রয়ন প্রকল্পসহ ৯টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মেগা প্রকল্পগুলোতে যেন কোন বাধা না আসে সেটা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারকে সন্ত্রাসবাদ থেকে মুক্ত রাখার সকল চেষ্টা করতে হবে। এতে আরও বক্তব্য রাখেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস এন্ড জাস্টিস’র ব্যারিস্টার মনুজর মোরশেদ, ক্যাম্প ইনচার্জ আবু জাফর মো. ওবায়দুল্লাহ এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এনজিও বিষয়ক সেলের সহকারী কমিশনার জিন্নাত শহীদ পিংকি। এছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়ারম্যান, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-সদস্য, শিক্ষক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ প্রতিনিধি বক্তৃতা রাখেন। এতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও এবং জাতিসংঘ সংস্থার প্রতিনিধি, ৬টি ক্যাম্পের ইনচার্জও অংশগ্রহণ করেন।

আলোচনা সভায় জানানো হয় যে, কোস্টের উদ্যোগে উখিয়া এবং টেকনাফের ৪টি ইউনিয়নে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য, শিক্ষক, সুশীল সমাজের অংশগ্রহণে সামাজিক সম্প্রীতি সুরক্ষা কমিটি গঠিত হয়েছে এবং এই কমিটির সদস্যগণ ক্যাম্প ও স্থানীয় এলাকা পরিদর্শন করে রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেন এবং এসব সমস্যা সমাধানে কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উপস্থাপন করেছেন। কমিটিগুলোর সুপারিশগুলো তুলে ধরেন কোস্ট ট্রাস্টের মো. মজিবুল হক মনির। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হলো- স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ত্রাণ তহবিলের ২৫% খরচ করা, রোহিঙ্গা যুব সমাজকে বিভিন্ন কার্যক্রম, বিশেষত শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করা, রোহিঙ্গা মেয়ে-নারীদেরকে পাচারের বিরুদ্ধে বিশেষভাবে সচেতন করা, রোহিঙ্গা শিবির এলাকায় গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে আনা এবং স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।