রোহিঙ্গা সঙ্কটকে দুই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ‘ঝগড়া’ বলার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে পিছু হটতে হল ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিংকে।
নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে চীনের হিমশিম খাওয়ার মধ্যে সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিক্যাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে লি জিমিং এলে তাকে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
মিয়ানমারের উপর চীনের প্রভাবের কারণে রোহিঙ্গা সঙ্কট অবসানে চীনের ভূমিকা শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ডিক্যাবের অনুষ্ঠানে জিমিং বলেন, “আমরা চাচ্ছি সংলাপের মাধ্যমে এটার সমাধান হোক, বিশেষভাবে ঝগড়ায় জড়িয়ে থাকা মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগে।
“কারণ তারা দুই দেশ যুদ্ধে জড়িত নয় এবং তাদের ভালো সম্পর্ক। ঝগড়া সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও হতে পারে।”
তার এমন বক্তব্যে এক সাংবাদিক বলেন, “প্রতিবেশীর ঝগড়ার এই উদাহরণ এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এ কারণে যে, এটা মিয়ানমারের সমস্যা, তাদের সমস্যার কারণে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত। পুলিশ ডাকার অবস্থানে বাংলাদেশ।”
তখন রাষ্ট্রদূত জিমিং তার অবস্থান পাল্টে বলেন, “তা ঠিক, এটা ঝগড়ার ইস্যু সেভাবে না। মূলত রোহিঙ্গা ইস্যু মিয়ানমারেরই সমস্যা, বাংলাদেশের নয়।
“রোহিঙ্গা ঢলের পরে বাংলাদেশ আক্রান্ত হয়েছে, এখন আপনারা মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করছেন- ঝগড়া নয়, কীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। এটাই মূল বিষয়।”
২০১৭ সালের অগাস্টে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমনাভিযানের মুখে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় সাত লাখের বেশি মানুষ। সেখানে সেনা সদস্যরা নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছে বলে পালিয়ে আসাদের বিবরণে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার শরণার্থীদের ফেরত নিতে চুক্তিবদ্ধ হলেও রাখাইনে নিরাপদে বসবাসের পূর্ণ নিশ্চয়তা পাওয়ার আগে রোহিঙ্গারা ফিরতে চাইছে না। এক্ষেত্রে মিয়ানমারও গড়িমসি করছে।
লাখ লাখ রোহিঙ্গার স্রোতে বাংলাদেশে সৃষ্ট শরণার্থী সঙ্কটের সমাধানে মিয়ানমার যাতে জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করে সেজন্য নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল যুক্তরাজ্য। তবে চীন ও রাশিয়া ওই উদ্যোগ বর্জন করে।
এই সঙ্কটের সমাধানে চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশকে দেওয়া হলেও এখনও তা কোনো ফল বয়ে আনেনি।
আন্তর্জাতিক পরিসরে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে চীনা দূত বলেন, “আমরা কাউকে রক্ষা করছি না।
“আমরা এই আইডিয়া নিয়ে কাজ করছি যে, আপনি যদি মিয়ানমারকে জোরে ধাক্কা দেন, তাহলে সেখানকার সাধারণ জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সংঘাত আরও উসকে দিতে পারে।”
নিজেদের দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা শক্তির চাপ মোকাবেলার অভিজ্ঞতা থেকে চীন এমন অবস্থান নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন জিমিং।
রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের নীতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “এটা মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে সহযোগী দরকার, সেটা আমরা করছি।
রাখাইন প্রদেশে সহিংসতা বন্ধ, দ্রুত প্রত্যাবাসন শুরু করা এবং রাখাইনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন- এই তিন ধাপে চীন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে চাইছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত।
“অদূর ভবিষ্যতে আপনারা খুব ইতিবাচক, বাস্তবিক ও সুদৃঢ় সমাধান দেখতে পাবেন। তা কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকেবে না,” আশা দেখান চীনের রাষ্ট্রদূত।

