মোহাম্মদ ইলিয়াছ, লামা(বান্দরবান) প্রতিনিধি: ইয়াবা পাচারের জন্য নিত্য নতুন কৌশলের আবিষ্কার ঘটাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। থেমে নেই পাচারের রাস্তা আবিষ্কারের কৌশলও। ইদানিং ইয়াবা পাচারের জন্য ব্যবহার হচ্ছে গ্রাম-গঞ্জের রাস্তাগুলো। এটা তাদের নতুন কৌশলও বলা যেতে পারে।
ইয়াবা পাচারে জন্য দীর্ঘদিন ব্যবহার হয়ে আসছে টেকনাফ-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। কিন্তু বর্তমানে এই সড়কগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে। অসংখ্য চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে ইয়াবা পাচার করা তাদের জন্য অসম্ভবও হয়ে পড়ছে দিন দিন। তারই সুবাধে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা নিরাপদ রাস্তা হিসেবে বেছে নিচ্ছে গ্রাম-গঞ্জের বাইরোডগুলো। সেই হিসেবে বেড়েই চলছে বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালি ইউনিয়নে ইয়াবা পাচার ও ব্যবসা।
কারন নাইক্ষ্যংছড়ির গুমধুম সীমান্ত দিয়েও মিয়ানমার থেকে প্রবেশ করে অসংখ্য ইয়াবার চালান। এই চালান নাইক্ষ্যংছড়ি-গর্জনিয়া-বাইশারী হয়ে আসছে লামার ফাঁসিয়াখালিতে। আর এই ফাাঁসিয়াখালি থেকে লামার বিভিন্ন দিক দিয়ে চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য বাইরোড থাকায় সহজেই পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই সর্বনাশা ইয়াবা। কারন এইসব এলাকাগুলো পাহাড়ী ও দুর্গম হওয়ায় অনেকটা নিরাপদ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের জন্য এমনকি এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও তৎপরতা কম। সময় সাপেক্ষ ব্যাপার হওয়ায় চাইলেই যেতে পারে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথা সময়ে। এলাকায় যাওয়ার আগে খবর হয়ে যাওয়ার ফলে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা সতর্ক হয়ে যায়।
ফাঁসিয়াখালীর স্থানীয়দের মতে, ইয়াবার বড় বড় চালানগুলো ইদানিং এই পথ দিয়ে আসে। প্রতিদিন নিত্যনতুন মানুষ দেখা যায় এলাকায়। পার্শ্ববর্তী উপজেলা চকরিয়া থেকেও উঠতি বয়সের ছেলেপুলেরা ইয়াবা ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য এসে ভীড় জমায় প্রতিনিয়ত।
ফাঁসিয়াখালির অনেক যুবক দিন দিন জড়িয়ে পড়ছে এই সর্বনাশা ইয়াবা ব্যবসায়। যার ফলে নষ্ট হচ্ছে যুবসমাজ। দিন দিন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে উঠতি বয়সের ছেলেরা। থেমে নেই বয়োজ্যেষ্ঠরাও। উঠতি বয়সের এই ছেলেগুলোকে ইয়াবার ব্যবসার উদ্ভূদ্ধ করে ব্যবহার করছে তাদের লাভের জন্য।
স্থানীয়রা আরো জানায়, ফাঁসিয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে ইয়াবাসহ জোয়ার আসরও বসতে দেখা যায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান হচ্ছে ফুঁটেরঝিরি চকরিয়া পাহাড়ের হুমায়ূন চৌধুরীর বাড়ি, ফাঁসিয়াখালীর ১নং রিপুজী পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলা এবং জলপাইতলী সুলতানের ছেলে আমিন এর বাড়ি।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, ফুঁটেরঝিরি চকরিয়া পাহাড়ের হুমায়ূন চৌধুরীর বাড়িতে ইয়াবা ক্রয়-বিক্রয় এবং খাওয়ার আসর দিন রাত ২৪ ঘণ্টাই চলমান থাকে।
বিষয়টা নিয়ে হুমায়ুন চৌধুরীর সাথে মুটোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তবে ঊনাকে সংবাদ বলাতেই কল কেটে দিয়ে নাম্বারটি ব্লাক লিস্টে ঢুকিয়ে দেয়।
ফাঁসিয়াখালি ইউপির ৫নং ওয়ার্ডের রহিম মেম্বার হুমায়ুন চৌধুরীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘আমিও বিষয়টা এলাকার লোকজনের মুখে মুখে দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসতেছি। তবে হাতে নাতে ধরতে পারলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে সোপর্দ করা হবে।’
এই পাচারের কাজে ব্যবহার হয় এলাকার ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল, টমটম ও সিএনজি অটোরিক্সা। তারা চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে গ্রাম-গঞ্জের ছোট ছোট রাস্তাগুলো ব্যবহার করে ইয়াবার চালান পাচার করে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্থানীয় একজন জানায়, ‘এক সময় যে পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের দুবেলা দুমুটো মুখে খাবার তুলে দিতে পারত না তারা এখন দামী দামী মোটর বাইক নিয়ে চলাফেরা করে এলাকায়। অনেকেই আবার দালান-কোটাও করেছে। এসব কিছু হয়েছে ইয়াবার আশির্বাদে। গত ১২ জুন লামার সরই ইউনিয়নে বেদে সেজে প্রায় কোটি টাকার ইয়াবা পাচারের সময় র্যাবের জালে ধরা পড়ে দুই ব্যক্তি যার সংবাদ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই ইয়াবাগুলোও মূলতঃ ফাাঁসিয়াখালি দিয়ে আসছে বলে ধারণা করছে স্থানীয়রা। তাছাড়াও পুলিশ সুত্রে জানা যায়, লামার থানার অধিকাংশ মাদকের মামলা লামা সদর আর ফাঁসিয়াখালির দখলে রয়েছে। লামা সদরেও অধিকাংশ ইয়াবার আসে ফাঁসিয়াখালির সীমান্ত দিয়ে। এই সামগ্রীক বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয় ফাঁসিয়াখালির চেয়ারম্যান জাকের হোসেন মজুমদারের সাথে।
তিনি প্রত্যেকটা তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা প্রশাসনকে প্রতিনিয়ত তথ্য দিচ্ছি, তারা গ্রেফতার করে আদালতের কাছে সোপর্দও করে। কিন্তু জামিনে বের হয়ে আবারো বুক ফুলিয়ে ইয়াবার ব্যবসা শুরু করে দেয় তারা। এলাকার চেয়ারম্যান হিসেবে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাছে বিষয়টার একটা সুষ্ঠ সমাধানের অনুরোধ করছি যাতে ইয়াবার ব্যবসা ফাঁসিয়াখালি থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।’
লামা সার্কেলের সিনিয়ন এএসপি রেজুওয়ানুল ইসলাম বলেন, ‘ইয়াবা নিয়ে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। লামায় ইয়াবা পাচারের যে রোডগুলো আমরা ইতোমধ্যে সিন করে ফেলেছি। তবে নাইক্ষংছড়ি সীমানা দিয়ে ফাঁসিয়াখালির যে ইয়াবা পাচারের কথা বলছেন আপনারা সঠিক তথ্য দিলে আমরা অভিযান পরিচালনা করব। তাছাড়াও ফাঁসিয়াখালির যে ইয়াবা ক্রয়-বিক্রয়ের আসর তারও তথ্য দিয়ে সহায়তা করুন।’

