শিল্প লবণের আড়ালে ভোজ্য লবণ আমদানি করছে চিহ্নিত রক্তচোষা সিন্ডিকেট। লবণ কক্সবাজারের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হলেও এই শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে বলে দাবী করেছে বিএনপি।
তাদের দাবী, দেশের সিংহভাগ লবণ কক্সবাজার থেকে সরবরাহ করা হয়। এই শিল্প নিয়ে প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র চলছে। ষড়যন্ত্র থেকে উত্তরণ ও ষড়যন্ত্রকারিদের মুখোশ উম্মোচন করতে হবে।
লবণ উৎপাদন ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজার জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ আনা হয়।
রবিবার (১ মার্চ) দুপুরে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী।
বক্তব্যে তিনি লবণ শিল্প বাঁচাতে তিনটি করণীয়ের কথা জানানো হয়। ০১. চাহিদা মোতাবেক শিল্প লবণ আমদানি হোক। কিন্তু চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত শিল্প লবণ আমদানি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। ০২. যে সব কোম্পানি শিল্প লবণ আমদানি করে তারা যেন প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য লবণ বাজারজাত করতে না পারে, সে ব্যাপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। ০৩. সরকারি উদ্যোগে মাঠ পর্যায়ে উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য প্রতিকেজি ১৫ টাকা নির্ধারণ করতে হবে, নয়তো চাষীদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য প্রতিকেজি ১৫ টাকা দামে সরাসরি লবণ কিনতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কক্সবাজার জেলার অন্যতম প্রধান শিল্প লবণের উৎপাদন, চাষীদের দূরাবস্থা, ন্যয্যমূল্যহীনতা এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করতে আমরা আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।
বিএনপি নেতারা আক্ষেপ করে বলেন, একদিকে মাঠে পড়ে আছে লাখ লাখ মেট্রিক টন লবণ, অন্যদিকে শিল্প লবণের নামে বিদেশ থেকে লবণ আমদানি করে সেই লবণকে খাদ্য লবণে প্রক্রিয়াজাত করছে আমদানিকারক নামধারি কতিপয় রক্তচোষা! আর মাথার ঘাম পায়ে যে সকল চাষীরা মাঠে লবণ উৎপাদন করছেন সেই সকল চাষীরা উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মাঠ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন। যেহেতু তারা ঋণ কিংবা দাদন নিয়ে মাঠে নেমেছিল, সেহেতু সেই ঋণ শোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যারাও মাঠে আছে তারাও যে কোন সময় মাঠ ছেড়ে পালানোর চেষ্টায় আছে। দেশের প্রধান লবণ উৎপাদন অঞ্চল হলো কক্সবাজার জেলা। তারপর দক্ষিণ চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় লবণ উৎপাদন হয়। এছাড়া দেশের আর কোথাও লবণ উৎপাদন হয় না কিংবা উৎপাদন উপযোগী পরিবেশ নাই।
কক্সবাজার জেলার দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার সদর ও টেকনাফ উপজেলাতেই মূলতঃ দেশের চাহিদার সব লবণ উৎপাদিত হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী এবং আনোয়ারা উপজেলায় মাত্র ৫০ হেক্টর জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে লবণ চাষ হচ্ছে। এসব এলাকা ছাড়াও কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী, পোকখালী ও ইসলামপুর ইউনিয়নে বর্তমানে জমিতে পলিথিন ছাড়া আধুনিক পদ্ধতিতে লবণের চাষ করা হচ্ছে। দেশে প্রায় ৬২ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়। বিগত ২/৩ বছরে সরকারের মেগাপ্রকল্পের কার্যক্রমের কারণে জমি অধিগ্রহণ করে নেয়ায় প্রায় ১৪ হাজার একর লবণ চাষের জমি কমে গেছে, যেখানে এখন আর চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে সরকারের মেগাপ্রকল্পের কারণে গেছে ১৪ হাজার একর, অন্যদিকে চাষীরা লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষাবাদ থেকে বাদ পড়েছে আরও ১২ হাজার একর জমি। এতো সংকটের পরও দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ লবণ চাষের সাথে জড়িয়ে আছেন। যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে লবণ চাষের সাথেই নিজেদের জীবন-জীবিকার নির্ভরশীল হয়ে আছেন। যাদের অধিকাংশই কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা।
২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে লবণের হালচাল ও বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য মতে, বাংলাদেশে খাদ্য লবণের চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টন আর শিল্প লবণের চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার মেট্রিক টন। অথচ দেশে উৎপাদিত হয় প্রায় ১৮ লাখ মেট্রিক টন লবণ। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, এই অর্থবছরে দেশে ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮ মেট্রিক টন শিল্প লবণ আমদানি করা হয়েছে। যার মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরাইড ৮ লাখ ৯০ হাজার ১৮০ মেট্রিক টন, হোয়াইট সোডিয়াম সালফেট ৫ লাখ ২৪ হাজার ৮৪ মেট্রিক টন ও সোডিয়াম সালফেটস ২৬ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন।
অথচ অবাক হওয়ার মতো তথ্য হলো, বাংলাদেশি চাষীদের উৎপাদিত প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন লবণ মাঠেই পড়ে আছে। এতো বিপুল পরিমাণ লবণ থাকার পরও সরকারের ছত্রছায়ায় কতিপয় রক্তচোষা আমদানিকারক ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮ মেট্রিক টন লবণ আমদানি করেছে! চলতি অর্থবছরে আবহাওয়া লবণ চাষের অনুকূলে রয়েছে। তারপরও চাষীরা রয়েছেন হতাশায়। তাদের চলতি বছর লবণ উৎপাদনে প্রতি কেজিতে খরচ পড়ছে ১০ টাকা, অথচ মাঠে লবণের বিক্রি মূল্য মাত্র ৪ টাকা কেজি। অপরদিকে বর্তমানে বাজারে যে প্যাকেটজাত যে লবণ পাওয়া যায় তা প্রতি কেজির মূল্য ৩০ থেকে ৩৮ টাকা। উৎপাদন মাঠ ও বর্তমান খুচরা বাজারে লবণের দামের এই বিশাল পার্থক্য চাষীদের লবণ চাষে অনুৎসাহিত করে তুলছে।
মাঠে লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চাষীদের মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানান বিএনপি সভাপতি।
তিনি বলেন, চাষীরা যারা বিভিন্ন ব্যবসায়ি থেকে অগ্রিম (দাদন) নিয়ে লবণ চাষে মাঠে নেমেছিলেন তারা যখন নিশ্চিত জানতে পারছেন, দাদনের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না তখন তৈরি করা মাঠ ফেলে পালাতে বাধ্য হচ্ছেন। আমাদের নেয়া তথ্য মতে, ইতোমধ্যে চার ভাগের এক ভাগ চাষী মাঠ ছেড়ে পালিয়েছেন। অন্য চাষীরাও পালিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন।
লবণের কেন এই দূরাবস্থা? প্রশ্ন তুলেন শাহজাহান চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো, যারা শিল্প লবণ হিসেবে হোয়াইট সোডিয়াম সালফেট আমদানি করেন তারা তা প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য লবণ হিসেবে বাজারজাত করছেন। যা দেশের লবণ শিল্পকে শতভাগ ধ্বংস করে দেয়ার আশংকায় ফেলে দিয়েছে।
মেডিকেল তথ্য মতে, শিল্প লবণ প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য লবণ হিসেবে বাজারজাত করার কারণে সাধারণ মানুষের কিডনী ও লিভার ড্যামেজসহ নানা ধরণের জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
লবণ শিল্প বাঁচাতে সরকারের কাছে দাবি তুলেন বিএনপি নেতা শাহজাহান চৌধুরী।








