শেখ মুরশেদুল আলম: শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল।এটি একটি জলজ বিরুৎ। একবার কোথাও জন্মালে তার মূল সম্পূর্ণ না উঠানো পর্যন্ত সেখানে গাছ জন্মাতে থাকে। গাছের কন্দ বা মোথা জলের তলে মাটি বা কাদায় থাকে, পাতা জলের উপরে ভাসতে থাকে, নলের মতো পত্রনাল ও ফুলের লম্বা বোঁটা জলের ভেতরে থাকে, ফুল ফোটে জলের উপরে।
ফুল দেখতে অনেকটা পদ্মফুলের মতো। তবে পাপড়ি পদ্মফুলের চেয়ে চিকন ও শক্ত। ফুল দেখতে অত্যন্ত সুন্দর। বসন্তের শেষ থেকে শরতের প্রথম পর্যন্ত ফুল ফুটলেও বর্ষাকালে বেশি ফোটে। গাছের সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি ঘটে বর্ষাকালে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে ১.৬ কিলোমিটার দূরে হালিশহর ১১ নং ওর্য়াডের সাগরিকা জহুর আহমদ ষ্টেডিয়াম সংলগ্ন রেললাইনের পেছনে জেলে পাড়া রুপালী আবাসিক এ গেলেই চোখে পড়বে নয়নিভিরাম লাল-সবুজের লাল শাপলার খেলা । পুকুর জুড়ে যেন লাল-সবুজের মেলা।
দৈর্ঘ্য ৬০/৫০ ফুট, আর প্রস্থ ৪০/৩০ ফুট পুকুরটি সহ প্রায় পাঁচ শতক জমি বর্গা নিয়ে ওই এলাকায় প্রায় ১৪ বছর ধরে কৃষিকাজের পাশাপাশি শাপলার চাষাবাদ করছেন ভোলার কৃষক মো. সিরাজ।
পুকুরটিতে ফুটেছে শত শত লাল শাপলা। এ লাল শাপলা পথচারীদের মুগ্ধ করছে প্রতিনিয়িত। লাল-সবুজের এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন নানা বয়সের মানুষ।

সাধারণত বর্ষা মৌসুমে খাল, বিল, ঝিল, দিঘী, নালা ও পুকুরে এমনকি জলাশয়ে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায় শাপলা। বিল, ঝিল, নদী, নালা থেকে মানুষ শাপলা তুলে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে, কেউ আবার বাণিজ্যিকভাবে শাপলার চাষ করে থাকেন, ছাদ বাগানের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও অনেকে শাপলা ফুল তালিকায় রাখেন।
কিন্তু চট্টগ্রাম নগরীর ১১ ওর্য়াডের এই এলাকাটির বিষয়টি পুরোপুরি ভিন্ন।
কৃষক মো. সিরাজ বলেন, বর্গা নেওয়া ৫ শতক জমিতে কৃষিকাজের পাশাপাশি শাপলার চাষ করছি প্রায় ১৪ বছর ধরে।

জমির মধ্যে থাকা পুকুরে লাগানো হয় শাপলার মুড়া। সে শাপলা ফুটে গোটা। এছাড়া পুকুরের উপর মাচাং তৈরির মাধ্যমে ঝিঙ্গা, করলা, শশা, শিম, মিষ্টি কুমড়াসহ নানা জাতের সবজির চাষও করা হয়।
তিনি আরও বলেন, শাপলা চাষ লাভজনক। প্রথম বছর শাপলাগুলোর গোড়াসহ গাছ সংগ্রহ করে লাগানোর পর এখন আর আমাকে নতুন করে শাপলা গাছ লাগাতে হয় না। বছরজুড়ে এই পুকুরটিতে লাল শাপলা ফুল ফোটে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানিতে ভর্তি থাকে। আর শুষ্ক মৌসুমে ইরি-বোরো সেচের পানি দিয়ে এই পুকুরটি ভর্তি হয়ে যায়। এতে করে সারাবছরই এইখানে পানি থাকে। তাই সারা বছর এখানে লাল শাপলা দেখা যায়। এছাড়াও শাপলার রক্ষণাবেক্ষণে তেমন বাড়তি খরচ নেই। চার-পাঁচদিন পরপর পুকুর থেকে শাপলা তুলে বিক্রি করা যায়। শাপলা বিক্রি করতে বাজারে যেতে হয় না, ভোরবেলা বেপারিরা এসে শাপলা কিনে নিয়ে যান। প্রতি আঁটিতে ১৫টি শাপলা থাকে। পাইকারি হিসেবে প্রতি আটি ৩০ টাকা করে বিক্রি করি।

সূর্যোদয়ের সময় আলোকরশ্মি পড়া মাত্রই যেন মন পাগল করা এক সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে হালিশহরের এই পুকুরটি।এ ছাড়া সন্ধ্যার সূর্য ডোবার মুহূর্তে মনে হয় যেন মেঘ মালায় ঢেকে যাওয়া এক অপরূপ দৃশ্য। ঐ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বাইসাইকেল, মোটর সাইকেল, প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে লাল শাপলা ফুলের ছবি তোলেন ফুলপ্রেমিরা।
এসএসসি পরীক্ষার্থী ওয়াসিফ উল আলম ও ৫ম শ্রেণীর ওয়াজিহা জানায়, তারা প্রথমে বইয়ে শাপলা ফুল দেখেছিল। এখন বাস্তবে দেখছে। জাতীয় ফুল শাপলা দেখে আমরা খুব খুশি। পড়ালেখার পাশাপাশি সময় পেলে আমরা এখানে এসে শাপলা ফুল দেখি।
জহুর আহমদ ষ্টেডিয়াম থেকে ফইল্লাতলী বাজারে যাওয়ার পথে লাল শাপলা ফুল দেখার জন্য দাঁড়ানো পথচারী ব্যবসায়ী কায়সারুল আমীন তুহিন ও মো: সুলতান জানান, তারা এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসায় সময় প্রায় দাঁড়িয়ে লাল শাপলা দেখেন।
তারা বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী অসাধারণ উদ্যোগ। ফুল পবিত্র। ফুলগুলো দেখে কিছু সময়ের জন্য হলেও শৈশবে ফিরে যাই।
আরো বড় পরিসরে শাপলার চাষাবাদ করার ইচ্ছে রয়েছে কৃষক সিরাজের।কিন্তু এটি করতে গেলে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। বড় একটি ঋণের ব্যবস্থা হলে হয়ত সিরাজের এ স্বপ্নও একদিন বাস্তবায়িত হবে।
সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে আরও অনেকেই লাভজনক শাপলা চাষে এগিয়ে আসবেন বলে মনে করেন তিনি।









আমার বাসস্থানের কাছেই এটা, দেখতে যাব নিশ্চয়ই