নিউজটি শেয়ার করুন

সাইরু ও নীলগিরি: একটি দীর্ঘ ভ্রমন কাহিনী

গোলাম মামুন জাবু
ইদানিং নিজের ব্যবসায়িক কাজ কর্মের পাশাপাশি গ্রামের বাড়ির মসজিদের নির্মাণ কাজের দায়িত্বটা নেয়ার পর থেকে পরিবারকে ছুটির দিনে সময় দেয়াটা একদমই হচ্ছিল না। যেহেতু প্রতি শুক্রবার জুমায় মসজিদে মোতওয়াল্লী হিসেবে উপস্থিত থাকতেই হয় তাই ছুটির দিনটি সারাদিনই বাড়িতে কেটে যায়। শহরে এসে পরিবারের জন্য আর সময় হয়না, আমি এবং আমার পরিবার আল্লাহর ওয়াস্তে তা মেনে নিয়েছি। এই অবস্থায় (৩১ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর) গত সপ্তাহে সাপ্তাহিক ও জন্মাষ্টমীর বন্ধ মিলিয়ে মোট তিনদিন ছুটি কিন্তু শুক্রবার জুমায় আমাকে বাড়িতে যেতেই হবে বলে আমার স্ত্রী সন্তানরা একটু মন খারাপ করেছিল কিন্তু তারা ঠিকই মনে মনে পরিকল্পনা করে রাখে শনি রবিবার এই দুই দিন তারা কোথাও যাবেই।
শনিবার খুব ভোরে হটাৎ আমার ছেলের পেট খারাপ হল, আমি কিছুটা মনে মনে খুশি হলাম যে হয়ত কোথাও যেতে হবে না। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে আমার ছেলে আল্লাহর রহমতে তার মা বোনের দিকে তাকিয়ে মনের জোর বেড়ে সুস্থ বোধ করতে লাগল। আমিও মনে মনে ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম কারন বুঝলাম আর ফাঁকি দেয়া যাবে না। আমার স্ত্রী ইতিমধ্যে বান্দরবান সাইরু রিসর্ট এ ফোন করে কটেজ বুকিং দিয়ে দিয়েছে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। গাড়ি চালাব আমি নিয়ে যাব আমি কিন্তু আমার কোন অনুমতিই তাদের দরকার লাগছে না আজ। ওরা মা সন্তানরা আজ আমার সাথে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, ওরা বলে “তুমি কোন কথা বলবে না। এদিকে আমি জীবনে কোনদিন বান্দরবান পাহাড়ি জায়গায় নিজে গাড়ি চালিয়ে যাইনি তবে রাঙামাটি কাপ্তাই গিয়েছিলাম। কিন্তু নীলগিরির রাস্তার জন্য মনে অজানা আশঙ্কা ভয় কাজ করছিল।
যাই হোক মাএ এক ঘন্টার নোটিশে আমরা রওনা দিলাম দুপুর ২.৩০ মিনিটে, কেরানি হাট পৌছালাম ৪ টা, কেরানি হাট থেকে বামে মোর নিতে মাইলস্টোন দেখলাম বান্দরবান ২৪ কিমি, ১৯৯২ সালের পর এই প্রথম বান্দরবান যাচ্ছি। ভয় এডভেঞ্চার আনন্দ সবই লাগছে। সব চেয়ে ভালো লাগছে আমার স্ত্রী সন্তানদের আনন্দ দেখে, ওরা খুব খুশি। ৪.৩০টা নাগাদ বান্দরবান শহরের বাস স্টান্ডে পৌছালাম। লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম সাইরু কোনদিকে। সাইরু কেউই ভালোভাবে চিনতে পারছে না ! কারন সবাই ঐ রাস্তাটা নীলগিরি রাস্তা হিবেবেই চিনে, সাইরু শুধু একটি রিসোর্টের নাম। বান্দরবান থেকে সাইরু রিসোর্ট ১৮ কি মি। বান্দরবান শহর থেকে নীলগিরি ৪৪ কি মি।
বাস স্টান্ড থেকে সাইরু ১৮ কি মি পাহাড়ি পথ। চিনিনা জানিনা কোথায় কিভাবে যাব ? মানুষকে জিজ্ঞেস করছি আর সাইরু রিসোর্টে ফোন করে জানার চেষ্টা করছি। বাসস্টান্ড শেষে ধানপাখি মোর থেকে ডানে নীলগিরি রোড দিয়ে যেতে হবে। নীলগিরির নাম শুনলেই এমনিতেই ভয়ে গা চম চম করে। নীলগিরি রোড ধরে যাত্রা শুরু করলাম, রাস্তা তেমন ভালো না, ভয়ে ভয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রথমে সমতল রাস্তা, একটু পর শুরু হল রাঙমাটির মত আঁকাবাঁকা উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ। সরু পথ গাড়ি খুব কম, মাঝে মাঝে ভলেরো পিকআপ চলছে আর কিছু জিপ চলছে, প্রাইভেট গাড়িও যাচ্ছে। সাইট দিতে সমস্যা হয়। তারপরও এগিয়ে যাচ্ছি। সবার মধ্যে একটি অজানা আতংক থ্রিল এডভেঞ্চার। কোথায় যাচ্ছি কবে পৌঁছাব। কয়েক মাইল যাবার পর শুরু হল পাহাড়ি আসল সৌন্দর্য। কি অপরূপ প্রাকৃতিক সুন্দর সবুজ পাহাড় আর পাহাড়। মনে হয়েছে বিধাতা এসে নিজ হাতে এটা বানিয়ে দিয়েছেন। ইচ্ছে করছে পাহাড়েই শুয়ে থাকি, মন ভরে বিশুদ্ধ নিঃশাস নিই।
পথে পথে পাহাড়ি মেয়েরা জীবিকা অন্বেষনে বের হয়েছে। সবার পিঠে ঝুড়ি। কেউ তরকারি, কেউ ফল, কেউ লাকড়ি সংগ্রহ করে আনছে। বেলা শেষে বিকেলে ঘরে ফিরছে। তাদের জীবনটা আসলে খুব কষ্টের। আমরা সে তুলনায় সর্গে আছি। তাদেরকে দেখতে খুব সহজ সরল মনে হল। তারা অল্পতেই সন্তুষ্ঠ। আমাদের মত অতটা চাহিদা নেই। তাদের হাসিটা অমলিন। বাঙালি দেখলে তারা কেমন যেন লজ্জা পায়। যেমন আমরা বিদেশী ইংরেজ দেখলে লজ্জা পাই, কথা বলতে ভয় হয়, তাদেরকেও সেরকম মনে হয়েছে। পাহাড়িরা আসলেই অসহায়। তাদের জন্য কোটা বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়ানো উচিত।
আমরা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে বিকেল ৫.৩০ এ সাইরু রিসোর্টে পৌছালাম। আলহামদুলিল্লাহ।
দারুন এক রিসোর্ট। মনোমুগ্ধকর রিসিপশন হল, রেস্টুরেন্ট।  মনে হল উন্নত কোন দেশে বেড়াতে এসেছি। সব পরিপাটি পরিষ্কার। চারিদিকে উপরে নিচে কটেজ আর পর্যটক থাকার সুন্দর সুন্দর বাংলো। ঢাকার পর্যটক বেশি। আমরা কটেজ ০২ পেলাম। একটু দাম বেশি পড়েছে যেহেতু ছুঠির দিনে হটাত গিয়েছি। কাঠের কটেজ। নিচ্ তলা বাথরুম টয়লেট আর উপরের তলা পুরো কাঠের কটেজ। কাঠের কটেজ কিন্তু এসি ফ্যান সবই আছে। ৬ জনের থাকার ৬টি বেড ফ্লোরিং করা। আমরা ৪ জন। প্যাচানো সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ওয়াশরুমে যেতে হয়। পিছনে অঘোর জঙ্গল। ভয়ও লাগছে। রাত বাড়তে লাগল আর বিভিন্ন পোকা মাকড়ের ডাক আর আনাগোণা বাড়তে লাগল। বানর ব্যাঙ এর ডাক। ঝিঝি পোকার ডাক। আমার ছেলে মেয়েকে বললাম ব্যাঙ আর ঝিঝি পোকার ডাক শোন। তারা মোবাইলে রেকর্ড করছে আর মজা করছে।
আমরা যেখানে আছি সাইরু রিসর্টটি সমতল থেকে এর উচ্চতা ১৬১৫ ফুট। তার মানে ১৫০ তলা বিল্ডিং এর চেয়েও বেশি উচ্চতা। শহর থেকে এত উঁচু।
ঝিরি ঝিরি হীম শীতল বাতাস। কোন দূষণ নেই ধুলা বালি নেই। ইচ্ছে করেছে পানির মত বাতাসও গিলে খাই। সাইরু খুব সুন্দর পরিপাটি একটি রিসোর্ট/ সুন্দর থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। একদম পাহাড়ের চুড়ায় সুইমিং পুল, দূর থেকে মনে হয় আকাশের সাথে মিলিয়ে করা হয়েছে।
সন্ধ্যায় একটু ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করলাম। পরে আবার রুমে আসলাম। বিকেলের আলো শেষ হয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে লাগল। পাহাড়ে মসজিদে মাগরিবের আজান শুনে খুব ভালো লাগল। আমি ওযু করে মাগরিবের নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে শোকরানা আদায় করলাম। ক্ষনে ক্ষনে আল্লাহকে স্বরণ করছি, আল্লাহকে স্বরণ করলে পুরো ভ্রমণটাই ইবাদত হয়ে যাবে। যাত্রা গাড়ি চলা খাওয়া পান করা ঘুমানো সবই আল্লাহর নাম নিয়ে চলছি যেন সব কিছুই আল্লাহর ইবাদত হিসেবে কবুল হয়।
রাতে অজানা আশঙ্কা ভয় আর এডভেঞ্চার এর কারনে ভালো ঘুম হলনা। এরই মধ্যে সিদ্বান্ত হল খুব সকালে নীলগিরি চলে যাব। এত কাছে এসে যদি না যাই আর কবে আসি ঠিক ক নাই। আমরা যেখানে আছি এখান থেকে নীলগিরি মাএ ২৬ কিমি, যেখান হাতে মেঘ ধরা যায়। এই পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ২২০০ ফুট। হাতে মেঘ ধরব অবিশ্বাস হলেও সত্য। টেনশনে আর উত্তেজনায় রাতে ঘুম হলনা।
সকালে ভোরে উঠে ৭.৩০ টা নাগাদ কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট দিল, ৮.১৫ তে আল্লাহর নাম নিয়ে রওনা দিলাম। পাহাড়ি পথ একটার পর একটা পাহাড়, উঁচু থেকে উঁচুতর। গাড়ি শুধু উঠতেই আছে, এমন উঁচুতে উঠেছি নিচে তাকালে কলিজা মোচড় দিয়ে উঠে। দুপাশের পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সরু রাস্তা, মোরে আসলে অন্য প্রান্তে কোন গাড়ি আছে কি না বুঝা যায় না দেখা যায় না। আমার জীবনের সেরা ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এই নীলগিরি নির্মাণ করেছেন এবং পরিচালনা করছেন। ঠিক সকাল ৯টায় নীলগিরি পৌছালাম আলহামদুলিল্লাহ।
এক অভুতপূর্ব দৃশ্য। মেঘ আর মেঘ। হাতের নাগালে মেঘ। মাথার উপর দিয়ে মেঘ চলে যাচ্ছে। ২২০০ -২৩০০ ফুট উপর অর্থাৎ ২০০ তলা বিল্ডিং থেকেও উপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। নিচে তাকালে মনে হয় সারি সারি ছোট্ট ছোট অস্যংখ পাহাড়ের বিছানা তার পাশ দিয়ে কিছু নদী, শাখা নদী বেয়ে চলছে অজানার পথে। এতটা উপরে মনে হচ্ছে বিমান চডে উপর থেকে নিচে দেখছি।
এই এক অপরূপ সুন্দর দৃশ্য, পাহাড় আর মেঘের খেলা , পিছনে শুধু সারি সারি পাহাড়। দারুন কিছু কটেজ, দেখতে মনে হবে বিদেশে। মানুষ সব ক্লান্তি ভুলে পাগল হয়ে শুধু ছবি তুলছে। কারোও দিকে খেয়াল নাই।
আল্লাহর অপরূপ মহিমা এই নীলগিরি, সুবহানাল্লাহ। সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ এই অনিন্দ্যসুন্দর জায়গাটি আবিষ্কার করার জন্য।
এই অনিন্দ্য সুন্দর জায়গাগুলি আসলে বর্ননা করে বুঝানো যাবে না, তারপরও নাদান মনে লিখলাম।
সবার সুবিধার জন্য কিছু ছবি আপলোড করলাম. আশা করি ভালো লাগবে এবং আপনাদের ভ্রমনে সহায়ক হবে।
সতর্কিকরন : অপরিপক্ক ড্রাইভার নিয়ে অথবা রাঙমাটি কাপ্তাই বা খাগড়াছড়িতে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা নাই এমন ড্রাইভার নিয়ে কেউ নীলগিরি বা সাইরু যাবেন না। দরকার হলে বান্দরবান শহর পর্যন্ত গিয়ে মোটেল বান্দরবানে নিজস্ব গাড়ি রেখে ওখানকার কিছু নিয়মিত জিপ ভাড়া করে যাওয়া উচিত। নীলগিরি গেলে সকাল ৮-৯টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া উচিত তা না হলে সকাল ১০টার পর মেঘ কমে যাবে এবং রোদ উঠে গেলে আবহাওয়া গরম হলে ভালো লাগবে না।
যারা কস্ট করে গুরুত্বপূর্ন সময় ব্যায় করে পুরো লেখাটি পড়েছেন তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ।