সিপ্লাস প্রতিবেদক: সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি।
বুধবার (৪ আগস্ট) বিকালে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহবায়ক ডা. শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতিনিধি দলটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন।
জেলা প্রশাসক স্মারকলিপি গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌছে দিয়ে এ বিষয়ে অবহিত করার আশ্বাস দেন।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আলহাজ্ব এম.এ আজিজ, আহবায়ক কমিটির সদস্য মো. কামরুল ইসলাম, সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী, মৎস্যজীবি দলের আহবায়ক হাজ্বী নুরুল হক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম শহিদ, মহানগর যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক আসাদুর রহমান টিপু প্রমুখ।
বিএনপির স্মারকলিপিটি পাঠকদের জন্য হুবুহু তুলে ধরা হল:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
বিষয় : চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ঐতিহাসিক সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাতিলের আহ্বান।
মাধ্যম : জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে আপানাকে শুভেচ্ছা। আপনি নিশ্চয় অবগত আছেন, পাহাড়-নদী-সাগরঘেরা বন্দরনগরী চট্টগ্রাম বিশ্বের নান্দনিক কয়েকটি শহরের একটি হিসেবে সারাবিশ্বের পর্যটক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য হাজার-হাজার বছরের। পাহাড়, ছায়া দেওয়া বৃক্ষ, নদীর কলতান, সাগরের ঢেউয়ের গর্জন- সবই চট্টগ্রামের ঐতিহ্য। প্রকৃতি অকাতরে দিয়েছে চট্টগ্রামকে, প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি চট্টগ্রাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে পাহাড়-নদী-সাগরের কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অব্যাহতভাবে কাটা হচ্ছে পাহাড়। নদী দখল হচ্ছে। এই শহর থেকে হারিয়ে গেছে জলাশয়। শিশুদের খেলার মাঠ হারিয়ে গেছে। অবসর সময়ে দু’দন্ড শান্তির শ্বাস নেওয়ার কোনো জায়গা আজ আর এই শহরে অবশিষ্ট নেই। চট্টগ্রাম শহর এখন ইট-পাথরের জঞ্জালে পরিণত হয়েছে। আমরা কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে যেতে চাই না। এর জন্য কে দায়ী আর কে দায়ী নয়, সেই আলোচনা আমরা অমূলক মনে করি, আমরা শুধু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে চাই আমাদের প্রাণের শহরে। এতকিছুর পরও চট্টগ্রামে একটি জায়গা আছে সিআরবি, যা চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে সর্বশেষ একমাত্র উদ্যান, যেখানে নানা বয়সী, নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গিয়ে একটু প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে।
চট্টগ্রাম শহরে আজ কোনো উন্মুক্ত পার্ক নেই। বাণিজ্যিকীকরণের থাবায় হারিয়ে গেছে সকল মাঠ-উদ্যান। বিপ্লব উদ্যানকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানানো হয়েছে। আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠকে ইট-পাথরের কৃত্রিম পার্ক বানানো হয়েছে। লালদিঘীর পাড়ে গড়ে ওঠেছে নানা স্থাপনা। ডিসি হিলের দুয়ার বন্ধ আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে। তাহলে মানুষ যাবে কোথায়, কোথায় গেলে মানুষ একটু প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারবে ?
মানুষের প্রাতঃভ্রমণ, বেড়ানো, শিশু-কিশোরদের ঘুরে বেড়ানোর সর্বশেষ উন্মুক্ত স্থান সিআরবিও আজ আর অক্ষত থাকছে না। পাবালিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপের (পিপিপি) আওতায় সিআরবিতে যে হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউট গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
গত একমাস ধরে চট্টগ্রামের আপামর মানুষ, দলমত নির্বিশেষে সবাই সিআরবিতে গিয়ে হাসপাতাল প্রকল্প বাতিল করে সিআরবিকে রক্ষার আকুতি জানাচ্ছেন। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এখনও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য আসেনি।
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতেগড়া দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি চট্টগ্রামবাসীর আবেগ-অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সমব্যাথী।
এর প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে চট্টগ্রামবাসীর দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে হাসপাতাল-মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটের প্রকল্প বাতিল করে সিআরবি রক্ষার আকুল আহ্বান জানাচ্ছি। এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ ও প্রস্তাবনা দলের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হচ্ছে।
১. সিআরবি সিডিএ’র মাস্টারপ্ল্যানের আওতাভুক্ত একটি সংরক্ষিত এলাকা। এটি হেরিটেজের অংশ। বাংলাদেশের সংবিধানে হেরিটেজ রক্ষার বাধ্যবাধকতা আছে। কোনো সংরক্ষিত এলাকায়, প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন আছে এমন এলাকায় বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। এটি ইতিহাস-ঐতিহ্য ধ্বংসের শামিল।
২. সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) সহ পুরো এলাকা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত। এখানে মুক্তিযুদ্ধে ৯ জন শহীদের কবর আছে। শহীদের সমাধির ওপর কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
৩. প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিআরবির অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ধ্বংস হয়ে যাবে। সময়ের প্রয়োজনে প্রকল্প এলাকা ঘিরে নতুন নতুন দালান, অবকাঠামো, দোকানপাট, পার্কিং, ফার্মেসি, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের জন্য আবাসিক ভবনে ছেয়ে যাবে। পুরো এলাকা জঞ্জালময় ও কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠবে। শতবর্ষীসহ অন্তঃত ৩০০ গাছ কাটতে হবে। কাটতে না হলেও হাসপাতালের পরিবেশগত প্রভাবে এসব গাছ বেশিদিন টিকবে না। সিআরবি পরিণত হবে মরুদ্যানে।
৪. সিআরবি এলাকায় বাংলা বর্ষবরণসহ বছরব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। হাসপাতাল হলে এখানে সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ হয়ে যাবে। সিআরবিকে ঘিরে যে সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি হয়েছে, সেটা আর থাকবে না।
৫. রেলওয়ের জায়গা মানে সরকারি জায়গা। অথচ এখানে করা হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল। এই হাসপাতালে বিত্তবান ছাড়া সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সম্ভব হবে না। সরকারের জায়গা শুধু একটি শ্রেণীর মানুষকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশে ব্যবহার হতে পারে না।
৬. প্রস্তাবিত প্রকল্পের আশপাশ ঘিরে আছে জনবহুল এনায়েতবাজার-গোয়ালপাড়া এলাকা। হাসপাতাল হলে এখানকার লাখো বাসিন্দা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বেন। পরিবেশ দূষণ হবে। সুতরাং এটি কোনোভাবেই জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প নয়।
৭. সিআরবিতে রেলওয়ের একটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল বিদ্যমান আছে। দীর্ঘসময় ধরে অবহেলার কারণে সেটি এখন জরাজীর্ণ। অথচ মাত্র ৫০ কোটি টাকা খরচ করলে সেই হাসপাতাল আধুনিক সুযোগসুবিধায় পূর্ণাঙ্গ করা যায়। চলমান মহামারি পরিস্থিতিতে সেটিকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সেখানে নতুন করে আরেকটি হাসপাতালের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
৮. চট্টগ্রাম শহরেই রেলওয়ের জায়গায় ইউএসটিসি, ইম্পেরিয়াল হাসপাতালসহ আরও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। সিআরবি ছাড়া শহরে রেলওয়ের আরও খালি জায়গা আছে। জনগুরুত্বসম্পন্ন কোনো হাসপাতাল প্রকল্প নিতে হলে সেসব জায়গায় করা যায়, কিন্তু সিআরবিকে ধ্বংস করে নয়।
৯. চট্টগ্রাম শহরের বাইরে উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে বড় কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই। শহরের বাইরে হাসপাতাল করা বেশি জরুরি। সিআরবির প্রকল্পটি শহরের বাইরে কোথাও স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করা যায়।
১০. পিপিপি’র আওতায় এই প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে রেল কর্তৃপক্ষ অনেক তথ্য গোপন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কারা, কী উদ্দেশে চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি ধ্বংস করার পাঁয়তারায় মেতেছে, বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে। রাজনৈতিক ভেদাভেদের ঊর্দ্ধে উঠে চট্টগ্রামের আপামর মানুষ এক হয়ে আজ সিআরবি রক্ষার দাবি জানাচ্ছেন। মানুষের আবেগ-অনুভূতি-দাবিকে সরকার দায়িত্বশীলতার সাথে বিবেচনা করবে বলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি আশা করে। সর্বোপরি আমাদেরও আহ্বান, সিআরবিকে নষ্ট করে কোনো হাসপাতাল যেন করা না হয়। চট্টগ্রাম শহরের ভেতরে অথবা বাইরে যে কোনো জায়গায় হাসপাতাল হোক। রক্ষা পাক সিআরবি।
আপনার সুস্বাস্থ্য ও সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করছি।
ডা. শাহাদাত হোসেন, আহবায়ক। আবুল হাশেম বক্কর সদস্য সচিব
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি








