সিপ্লাস প্রতিবেদক: নগরীর সিআরবি রক্ষায় চট্টগ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ এবং চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি থেকে প্রস্তাবিত হাসপাতাল প্রকল্পটি নগরীর অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন, নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম এর চেয়ারম্যান প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ইব্রাহীম হোসেন চৌধুরী বাবুল।
সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়,চট্টগ্রাম মহানগরীর হৃদপিন্ডে অবস্থিত, হাজার বছরের বৃক্ষরাজী শোভিত, ছোটবড় টিলা পাহাড় নিয়ে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে সি.আর.বি। চট্টগ্রাম শহরে সি.আর.বির মত অপর কোন উন্মুক্ত স্থান নেই, যেখানে গিয়ে নগরবাসী বুকভরে শ্বাস নিতে পারেন।
পাহাড় ও প্রাচীন বৃক্ষবেষ্টিত সি.আর.বিকে চট্টগ্রামবাসী শ্বাস দেয়ার উন্মুক্ত সবুজ স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এখানে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের সার্বজনীন অনুষ্ঠানে সর্বস্থরের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। তাছাড়া এখানে উদযাপিত হয় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শাহাবুদ্দিনের বলীখেলা, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনতাপ্রেমী মানুষ জড়ো হয়ে স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে একাত্বতা ঘোষণা করে এবং ১৬ ডিসেম্বর সি.আর.বিতে এসে বিজয়ের জয়গান গেয়ে ৩০ লক্ষ শহীদ, ২ লক্ষ সম্ভ্রম হারানো মা-বোনকে হৃদয় নিংড়ানো সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে স্মরণ করে। উদযাপিত হয় বসন্ত উৎসব। তাছাড়া রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীও এখানে অনুষ্ঠিত হয়। প্রমা বোধন আবৃত্তি পরিষদসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো প্রায় প্রতিদিন সি.আর.বিকে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। এসব অনুষ্ঠানে অগণিত মানুষ স্বপরিবারে উপস্থিত হয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করে। তাই কালের পরিক্রমায় সি.আর.বি হয়ে উঠে আবহমান বাঙালী সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইফেটিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান অফিনিয়নের (ইকো) উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় সিআরবিতে ১৯৭টি উদ্ভিদ প্রজাতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বড়গাছ ৭৪ প্রজাতির ও মাঝারিগাছ ৩৭ প্রজাতির, গুল্ম প্রজাতি ৬৭টি এবং লতা জাতীয় উদ্ভিদ ১৪ প্রজাতির বিপন্নপ্রায় ৯টি প্রজাতির গাছও আছে। এখানে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা (ইকো), ভেনম রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, চিটাগাং বার্ডস ক্লাব, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি গবেষণাগারসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গবেষণার স্থান হিসাবে চিহ্নিত প্রাকৃতিক গবেষণাগার। সিআরবিতে ঔষধি গাছ মস, টোনা, অর্জুন, লজ্জাবতী, আপাং, নিশিন্দা, টগর, সঞ্জিনা, দেবকাঞ্চন ও মাটিসুন্দার, বিলুপ্তপ্রায় দুধকুরুস, বাঁকা গুল, সোনাতলা, গুলঞ্চ, সর্পগন্ধা, বকুল, পিতরাজ, দুরুষ-এর দেখা মিলেছে। সিআরবির বৃক্ষরাজি সংরক্ষণ করা না হলে ভবিষ্যতে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শতবর্ষী রেইনট্রিগুলোতে অনেক ধরনের পরগাছা, যেমন- ছত্রাক, শৈবাল, অর্কিড ও পরজীবীর বসবাস। এসব প্রজাতির সংখ্যা দেড়শতাধিক হবে। এছাড়া সিআরবি ব্যাঙ, বহুবিধ সাপ ও বিভিন্ন পাখ-পাখালির অভয়রণ্য।
এখানে হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, তা হবে দেশের পবিত্র সংবিধান ও পরিবেশ আইন বিরোধী আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ফলে উল্লেখিত জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে। মানুষের চেতনা, নতুন প্রজনের দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে কোনো উন্নয়ন হতে পারে না।
সিআরবি আমাদের শৈশবের স্মৃতিধন্য বিচরণক্ষেত্র। সিআরবি রক্ষা করতে হবে চট্টগ্রামের স্বার্থে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিধন্য সিআৱৰি। ১৯৭১ এ স্বাধীনতা যুদ্ধে বহু মানুষ শহীদ হয়েছেন এখানে। শহীদের সমাধির উপর রক্তাক্ত স্বাধীনতার ইতিহাস গ্লান করতে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আমরা মনে করি, সুকৌশলে চট্টগ্রামের হৃৎপিন্ড হাসপাতাল নির্মাণের নির্ধারিত স্থানেই তিনশ শতবর্ষী গাছ আছে।
প্রস্তাবিত স্থানটিতে রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের প্রথম নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুর রব, শহীদ শেখ নজির আহাম্মদ, শহীদ এম. এ. মনোয়ার হোসেন, বিমল সিং, ফখরুল আলম, মোঃ সিরাজউদ্দিন, আলী নূর চৌধুরী, মহিউদ্দিন, নুরন্নবী চৌধুরী ও গঙ্গারামের স্মৃতিস্তম্ভ। শহীদ আবদুর রবের পৈত্রিক বাসস্থান এখানে সে বাসা থেকে তিনি যুদ্ধে যান। যুদ্ধের ইতিহাস মুছে দিতে এখানে বাণিজ্যিক হাসপাতাল হতে পারে না।
উল্লেখিত পরিবেশ ও প্রতিবেশগত কারণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রজ্ঞাপন জারী করে, যাতে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি সম্মতি প্রদান করলে ২৫ জানুয়ারী, ২০০৯ সালে তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। উক্ত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের জোন-৩ এর ৮৩ সংস্কৃতিচর্চার প্রাণকেন্দ্র ও চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সি.আর.বিকে কালচার এণ্ড হেরিটেজ ঘোষণা করা হয় এবং সেটা রক্ষার জন্য ৮টি নির্দেশিকা প্রদান করা হয়। কালচার এণ্ড হেরিটেজ এর ৮টি নির্দেশিকা বাস্তবায়নকারী হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার উপর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সিআরবিকে প্রোটেকটেড এরিয়া হিসেবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়া হয়। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে এটি সংরক্ষণের জন্য রেলওয়ে, চউক, সিটি কর্পোরেশনসহ সেবাদানকারী সংস্থাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সিআরবিতে বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মান সংবিধান পরিপন্থি।
আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত বিষয়টি অবহিত হলে জনস্বার্থ বিরোধী এই প্রকল্প চট্টগ্রামে রেলওয়ের অন্য কোন জায়গায় স্থানান্তরের নির্দেশ দিবেন।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল প্রকল্পটি নগরীর অন্য কোথাও স্থানান্তরের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আহবান জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. অনুপম সেন এবং লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল।
নাগরিক সমাজের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের কো চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও রাজনীতিবিদ মফিজুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউনুচ, নাট্যজন আহমেদ ইকবাল হায়দার, অধ্যাপক মো. হোসাইন কবির, পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. ইদ্রিস আলী, অ্যাডভোকেট ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী, যুগ্ম সদস্য সচিব কামরুল হাসান বাদল, সাইফুল ইসলাম বাবু, আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, বিএফইউজে যুগ্ম মহাসচিব মহসীন কাজী, পরিবেশবিদ শরীফ চৌহান, চবি অধ্যাপক ওমর ফারুক প্রমুখ।








