নিউজটি শেয়ার করুন

হাটহাজারীর আজমের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা নয়, খুন!

হাটহাজারীর আজমের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা নয়

আনোয়ার হোসেন ফরিদ, ফটিকছড়ি: ঘটনার ১০ দিন অতিবাহিত হলেও হাটহাজারী উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের মন্দাকীনি এলাকার মুদি দোকানদার আজম হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট খুলেনি। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের কারণ জানতে অপেক্ষার প্রহর গুনছে পরিবার ও এলাকাবাসী। তবে এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ধরে রহস্য উদঘাটনে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের একাধিক টিম।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মেঝেতে এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে। হত্যাকাণ্ডের দিন পুলিশ লাশের পাশ থেকে একটি কিরিচ উদ্ধার করলেও তদন্তকারী টিম দোকানে ফের তল্লাশি চালিয়ে একটি ধারালো ছুরি উদ্ধার করেছে। পুলিশ এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড মনে করলেও কেউ কেউ আত্মহত্যা হিসেবে ধরে নিচ্ছে।

এ নিয়ে স্থানীয় একাধিকজনের সাথে কথা হলে তারা বলেন, ধরা যাক এটি একটি হত্যাকাণ্ড। তাহলে ঘাতকদের প্রবেশ কিংবা বের হওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যাচ্ছে না কেন? উল্টো দিকে এলাকাবাসীর বড় একটি অংশ এটিকে আত্মহত্যা বলতে নারাজ। তাদের দাবী আপন কেউ সুকৌশলে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে স্বল্প সংখ্যক মানুষ বিয়ে সংক্রান্ত বিষয় টেনে আনতে চায়লেও, সত্যতা মিলছে না। অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, আজমের ব্যবসার উন্নতি দেখে কারো কারো হিংসা থাকতে পারে।

এছাড়া, স্থানীয় একটি অর্থ সঞ্চয় সমিতির ক্যাশিয়ার ছিলেন নিহত আজম। এ হত্যাকাণ্ডের সাথে সমিতির কোন যোগসূত্র আছে কী না তাও তদন্তে আসা দরকার বলে মনে করেছেন অনেকে। মুদি দোকানের পাশাপাশি মুরগী বিক্রয় কেন্দ্রটিও আজমের নিয়ন্ত্রণে থাকায় দখলদারিত্ব নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ ছিল কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পিতার মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, ছোট ভাইয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ, দুই দোকানের আয় আজমের কাছেই সংরক্ষণ থাকতো বলে জানা গেছে। বিয়ের দুই সপ্তাহ পূর্বে টাকার হিসাব-নিকাশ নিয়ে বড় ভাই সরোয়ার এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে, এমনও ধারণা অনেকের। এক্ষেত্রে ভাইয়ের মাধ্যমে যদি এ হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তাহলে সেদিন রাতে ঘর থেকে আজমের জন্য পাঠানো খাবারে চেতনানাশক কিছু মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল। যার কারণে গলা কেটে মারা যাওয়ার পরও আজমের শুয়ে থাকার ধরণ ছিল স্বাভাবিক অবস্থায়। তবে বিগত দুই বছর আগে আজম দোকানে ঘুমানোর সময় কে বা কারা ছালের টিন খুলতে চেয়েছিল এমনটা কথিত থাকলেও সে সূত্র থেকে কারো নাম এখন সামনে আনতে পারছে না পরিবার। নিছক চুরির জন্য যদি এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকে, তাহলে কেন দোকানের ক্যাশে রক্ষিত মোটা অংকের টাকা ও দামী মালামাল খোয়া যায়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

আজমের বিয়ে নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিল কিনা তা জানতে পার্শ্ববর্তী ধলই ইউনিয়নের সফিনগর গ্রামের ফতেহ আলী চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে হবুবধূর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আজমের সাথে তার সর্বশেষ কথা হয়েছিল সোমবার রাতে। তখন তিনি স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছিলেন। অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কের কথা নাকচ করে দিয়ে ঠিক করা কনে আরো বলেন, পিতামাতার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করবো, ঐ দিনের প্রহর গুনছিলাম। আমাদের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতি, সাজসজ্জা এসব নিয়েই কথাবার্তা হতো। ঐদিন সকালে দোকানে প্রবেশ করা আজমের জেঠাতো ভাই রিমনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, অনেক ডাকাডাকির পর আজম ঘুম থেকে উঠছে না; এমন সংবাদ শুনে দৌঁড়ে ঘটনাস্থলে যাই। পরে উপস্থিত লোকজনের পরামর্শে পার্শ্ববর্তী দোকারে ছাদে উঠে ছাউনীর টিন খুলে ভিতরে প্রবেশ করি। পরবর্তীতে ক্যাশ টেবিলের উপর থাকা চাবি নিয়ে দরজা খুলে দিই। এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না।

অপর যুবক প্রতিবেশী আলাউদ্দিন বলেন, দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেও দোকানে দরজা-জানালা খুলতে না পারায় আমরা দুইজন পাশের দোকানের ছাদে উঠে আজমের দোকানের একটি টিন খুলি। আমি টিনটি ধরে রাখলে রিমন ভিতরে প্রবেশ করে। পরে নিচে লোকজন গলাকাটা লাশ বলে চিৎকার দিলে নেমে আসি। পুলিশের জন্য অপেক্ষা না করে কেন নিজেরাই টিন খুলে দোকানের ভিতরে প্রবেশ করলেন এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি পেশায় পাইপ ফিটার ও টাইলস মিস্ত্রী এই দুই যুবক।

নিহত আজমের বড় ভাই সরোয়ারের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আজম পরিবারের মেঝ ছেলে হলেও সবকিছু সে দেখাশোনা করতো। টাকাপয়সা তার কাছে জমা থাকতো। আমাদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ ছিল না। সে দোকান করেেলও আমি কৃষি ও গরু পালন নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। তবে দোকান থেকে টিফিন বক্স ও ক্যাশে রক্ষিত নগদ টাকা সরানোর বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি সরোয়ার। নিহতের মা ও মামলার বাদী নুরজাহান বেগমের সাথে কথা হলে তিনি ছেলের আত্মহত্যার বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বলেন, সুকৌশলে কেউ না কেউ তাকে হত্যা করেছে। ছেলে হত্যার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবী করেছেন মা নুরজাহান।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) হাটহাজারী সার্কেল শাহাদাৎ হোসেন বলেন, এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধরে আমরা তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। রহস্য উদঘাটনে বিভিন্ন পর্যায়ের তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।

উল্লেখ্য, ২ জুন বুধবার সকালে হাটহাজারী উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের বড় চৌধুরী বাড়ি এলাকায় নিজ দোকান থেকে আজমের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত আজম ওই এলাকার নজর মুহাম্মদ চৌধুরী বাড়ির বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত শামসুল আলমের পুত্র।