নিউজটি শেয়ার করুন

বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

গোলাম মামুন জাবু

আমার পিতা এইচ এম শামসুল ইসলাম চৌধুরী, মানব জাতির পিতা হযরত আদম (আ:), মুসলমান জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ:), বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ইন্দোনেশিয়ার জাতির পিতা সুকর্ন, আমেরিকার জাতির পিতা জর্জ ওয়াশিংটন।

আমরা বাংলাদেশী বাঙালিরা জাতির জনক প্রশ্নে খুবই কৃপন। যখনই জাতির জনকের কথা আসে তখন আমরা ধর্ম টেনে আনি। এটি উচিত নয়। যদিও বিষয়টি মানা না মানার মধ্যে কোন বাধ্যবাদকতা নেই, এটি সম্মান ও কৃতজ্ঞতার বিষয়।

পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি -ইংরেজী Diligence is the Mother of good fortune. এখানে Mother/ প্রসূতি বা ‘মা’ শব্দটি কি অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এখানে ‘মা’ কি আমাদের মা কে বুঝানো হয়েছে? না, তবে সব সময় শুধু ‘জাতির পিতা’ বা ‘পিতা মুজিব’ না বলে ‘বাঙালির জাতির জনক’ লিখলে ভালো। বা ‘বাংলাদেশের জাতির জনক’ বললে এতে ইসলাম ধর্মীয় কোন সমস্যা থাকে না। আর মুসলমান হিসেবে তো আমার জানাই আছে আমার নিজ পিতা কে, মানব জাতি ও মুসলমান জাতির পিতা কে। তাই বাঙালি জাতির পিতা হিসেবে কাউকে সম্মান করলে আমার শিরক্ বা গোনাহ হওয়ার কোন কারণ থাকেনা। এরপরও কোন সমস্যা থাকলে তা মানসিক ও রাজনৈতিক। যদিও বাঙালি জাতির সবাই আবার মানব জাতির অন্তর্ভূক্ত এবং অধিকাংশই মুসলমান। কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশ নামক রাস্ট্র ও স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যে সম্মান সূচক ‘বাঙালির জাতির পিতা’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়া হয়েছে তা অস্বীকার করা আমাদের জন্য অকৃতজ্ঞতার সামিল।

কারন আল্লাহ শেখ মুজিবকে এদেশে সৃস্টি করেছেন বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডকে স্বাধীন করে পাকিস্তানী শাসন থেকে এদেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য। মুসলমান হিসেবে প্রতিটি সৃস্টি ও প্রতিফলন আল্লাহর ইচ্ছায় তা মানতে হবে। নিজের জন্য বা মতাদর্শের বা দলের জন্য ভালো বা খারাপ সিদ্ধান্ত বা আল্লাহর ফয়সালা না মানলে নিজেদের মুসলমান দাবি করা যাবে না। পক্ষে গেলে ভাল বিপক্ষে গেলে মন্দ এটি মানসিক ও রাজনৈতিক দৈন্যতা। জাতির পিতা হিসেবে কেউ মানুন না মানুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোন লাভ বা ক্ষতি নেই। ধর্মীয় ভাবেও বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা বলা না বলার কোন ফল নেই। তবে মনে রাখবেন সম্মান দেয়ার মালিক ও কেড়ে নেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ! উপাধী একটি জাগতিক, রাস্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সম্মান মাত্র। উনি দেশের জন্য মানুষের জন্য যা করে গেছেন তার ভালো বা মন্দ ফল উনি অবশ্যই আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছেন এবং পাবেন।

কারন আল্লাহর হুকুম ব্যতিত দুনিয়ায় কোন রাস্ট্র বা জাতি সৃস্টি হতে পারে না। বাংলাদেশ সৃস্টিও আল্লাহর হুকুমে হয়েছে। যুদ্ধের সময় এদেশের বেশ বড় কিছু অংশ মুসলমান, অধিকাংশ আলেম ওলামা ধর্মীয় দল বা ধর্মীয় অনুভূতি সম্পন্ন বেশীরভাগ মানুষগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এবং পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও কোন লাভ হয়নি কারন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ঐ এক আল্লাহর হুকুম আর ইচ্ছাই যথেস্ট ছিল। তাই প্রতিদান আল্লাহই দিবেন। বঙ্গবন্ধু এমনিতেই সপরিবারে অন্যের হাতে প্রাণ দিয়ে শহিদী মৃত্যু পেয়েছেন। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি জাতির পিতা মানা না মানার কোন ফল ওনার কবরে যাবে না। তবে কৃতজ্ঞতা স্বরুপ ও একজন উত্তম মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিত তাঁর জন্য পরিবারের সকলের জন্য ও ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল শহীদদের জন্য দোয়া করা।

যারা ধর্মীয় যুক্তির দোহাই দেন তাদের জন্য বলি প্রতিটি জাতি ও রাস্ট্রসত্ত্বার উৎপত্তির সময়ে যার অবদান বেশী ও অবিস্মরনীয় তাঁকে সে দেশ বা জাতির জনক বলা হয়। এতে দোষ বা গোনাহর কিছু নেই কারন আমরা তো আর জন্মদাতা পিতা বলছি না বা বাবা ডাকছি না। আমাদের মানসিক ও রাজনৈতিক সংকীর্নতা ত্যাগ করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ দেশের জন্য যাদের অবদান রয়েছে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত।

একদল আছেন তারা মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে পাকিস্তানের জাতির জনক মানেন কিন্তু বাংলাদেশের জাতির জনকের কথা আসলে সেখানে তুলে আনেন আদম (আ:) ও ইব্রাহীম (আ:) এর কথা। এটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভন্ডামী। আবার বিসিএস পরীক্ষা বা অন্য চাকুরীর পরীক্ষায় বাঙালি জাতির জনককে এই প্রশ্নের উত্তরে ঠিকই লিখেন শেখ মুজিবের নাম কিন্তু পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে ফিরে যান আগের জায়গায়। ঠিক সরকারি যে কোন ফর্ম ফিলাপ-এ ধর্মইসলাম, বর্ণ সূন্নী লিখেন কিন্তু অন্তরে নিজেকে ওহাবীই ধরে রাখেন। এই সব ভন্ডামী ও নিজের নফস্ এর কাছে নিজেকে অপরাধী বানানোর সামিল।

কেউ কেউ বোকামীর মত বলেন শেখ মুজিব রনাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ করেননি, তিনি যুদ্ধের আগেরদিন পাকিস্তানের হাতে ধরা দিয়েছেন এবং দেশে এসেছেন দেশ স্বাধীন হবার পর ইত্যাদি। কিন্তু অমুক অমুক রনাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা, অথচ তাঁদের ইতিহাস জানা নেই যে বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পর হতে ১৯৪৮ থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ বপনের শুরুর সাথে জড়িত ছিলেন। তখন অনেকেই শিশু ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও অন্য জাতীয় নেতৃবৃন্দ তাঁর নেতৃত্বে ১৯৪৮ থেকেই ১৯৭১ পর্যন্ত স্বাধীনতার মূলমন্ত্র পর্যন্ত জাতিকে নিয়ে এসেছেন।

যারা এই মানসিকতার তাঁদের জন্য বড় উদাহরন দেই; দক্ষিন আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর জেল খানায় বন্দী থেকেই যুদ্ধ না করে কিভাবে দক্ষিন আফ্রিকার জাতির জনক হয়েছেন? সুপ্রিম কমান্ডার অথবা জাতি বা দেশের স্হপতি কখনো সরাসরি যুদ্ধ করেন না। তাঁরা পরিকল্পনা করেন সংগঠিত করেন এবং টেবিলে হাতে কলমে তা বাস্তবায়ন করান এবং করেন। তদ্রুপ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যারা বলেন তিনি যুদ্ধ করেন নি তাঁরা অজ্ঞ বোকা এবং জ্ঞান পাপী।

মহান আল্লাহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ তাঁর পরিবারের সকল সদস্য ও স্বাধীনতা এবং ভাষা আন্দোলনের সকল শহীদদেরকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন

লেখক: সমাজকর্মী, সংগঠক ও সাবেক ছাত্রনেতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here